এ কথা শুনে কমবেফারে উত্তর করল, তুমি ভুল করছ বাহোরেল। বুর্জোয়ারা ট্র্যাজেডি ভালোবাসে এবং তাদের তা ভালোবাসতে দেওয়া উচিত। আমি এসকাইলাসের লেখা পছন্দ করি। সহাবস্থানের অধিকার বিশ্বাস করি। পোলট্রিতে বানানো কৃত্রিম মুরগির পাশাপাশি যদি সত্যিকারের পাখি থাকতে পারে তা হলে অন্য সব নাটকের পাশাপাশি ক্লাসিক ট্র্যাজেডি থাকবে না কেন?
একদিন মেরিয়াস এঁজোলরাস আর কমবেফারের সঙ্গে র্যু জাঁ জ্যাক রুশোর অঞ্চলের এক রাস্তা দিয়ে বেড়াচ্ছিল। কমবেফারে একসময় মেরিয়াসের একটা হাত ধরে বলল, তুমি জান কোথায় আমরা এসেছি? আগে এ অঞ্চলের নাম ছিল র্যু প্ল্যাত্রিয়ের। এখন এটার নাম র্যু জাঁ জ্যাক রুশো। ষাট বছর আগে এখানকার পরিবারের নামে এ অঞ্চলের এই নাম হয়। সে পরিবারে জ্যাক আর থেরেসে বাস করত। তাদের কতকগুলি সন্তান হয়। থেরেসে যে সব সন্তান প্রসব করে আঁ জ্যাক তাদের তাড়িয়ে দেয়।
এঁজোলরাস কড়াভাবে তার প্রতিবাদ করে বলল, জাঁ জ্যাকের বিরুদ্ধে কোনও কথা আমি সহ্য করব না। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। যদিও তিনি তাঁর সন্তানদের পিতৃত্ব অস্বীকার করেন, তিনি জনগণের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
এইসব যুবক কেউ ম্রাট এই শব্দটা ব্যবহার করত না। জাঁ প্রুভেয়ার মাঝে মাঝে সম্রাটের পরিবর্তে নেপোলিয়ন বলত। অন্যরা বলত বোনাপার্ট। এঁজোলরাস কথাটা ‘বুনাপার্ত’ বলে উচ্চারণ করত।
.
৪.
তার নতুন বন্ধুদের যে সব আলোচনা মন দিয়ে শুনত মেরিয়াস এবং তাতে মাঝে মাঝে যোগদান করত তা তার মনে এক গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
এইসব আলোচনা হত কাফে মুসের পেছন দিকে ঘরটায় যখন কোনও সন্ধ্যায়। এলিসি সংস্থার প্রায় সব সদস্য উপস্থিত হত। ঘরের মধ্যে বড় বাতিটা জ্বালানো হত। তারা কোনও উত্তেজনা বা চেঁচামেচি না করে এটা-সেটা আলোচনা করত। তাতে এঁজোলরাস আর মেরিয়াস খুবই কম যোগদান করত। কখনও কখনও একই সঙ্গে সদস্যরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করত।
সে ঘরে নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কেবল কাফের রান্নাঘরে লুসো নামে যে মেয়েটি কাজ করত সে মাঝে মাঝে ঘুরে ঢুকতে পেত। রান্নাঘরটাকে ওরা বলত ল্যাবরেটরি।
গ্রান্তেয়ার খুব বেশি মদ খেত। মদ খেয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে সে তর্কবিতর্ক করত। একদিন সে চিৎকার করে বলে উঠল, আমার পিপাসা এখনও যায়নি। আমি আরও মদপান করতে চাই। আমি জীবনটাকে ভুলে যেতে চাই। জানি না কে এই জীবনটাকে সৃষ্টি করেছে। জীবনে কোনও কিছুই সত্য নেই, তবু আমরা বেঁচে থাকার জন্য ঝগড়া মারামারি করি। সুখ হল জীবনের উপর আঁকা একটা পুরনো প্রাণহীন পট। যাজকদের মতো আমিও বলি, সব কিছুই অভিমান আর অহঙ্কার। একটা নগ্ন শূন্যতাকে অহঙ্কারের পোশাক পরিয়ে তাকে বড় বড় কথা বলে চালানো হয়। ফলে রান্নাঘরকে ল্যাবরেটরি বলে চালানো হয়। একটা নাচিয়েকে বলা হয় নৃত্যশিল্পের অধ্যাপক, ওষুধের দোকানদারকে বলা হয় কেমিস্ট, পরচুলা তৈরিকারীকে বলা হয় শিল্পী। অহঙ্কারের দুটি দিক আছে, বাইরের দিকটা কালো নিগ্রো আর ভেতরের দিকটা ছদ্মবেশী দার্শনিক। একটার জন্য আমার চোখে জল পড়ে আর অন্যটার জন্য হাসি পায়। আমাদের তথাকথিত সম্মান আর মর্যাদা হচ্ছে অহঙ্কারেরই ছদ্মরূপ। মানুষের প্রকৃত যোগ্যতার মধ্যে প্রশংসনীয় কিছুই নেই। কোনও লোক কিভাবে তার প্রতিবেশীর প্রশংসা করে তা লক্ষ করবে। সাদা হচ্ছে সাদারই শত্রু। শ্বেত কপোত যদি কথা বলতে পারত এবং প্রাণীর মতো কাজ করতে পারত তা হলে শ্বেত কপোতের ডানাগুলো ছিঁড়ে দিত। কোনও গোড়া ধার্মিক যখন অন্য এক গোড়া ধার্মিকের সঙ্গে কথা বলে তখন সে বিষাক্ত সাপের মতোই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। দুঃখের বিষয় আমি অনেক বিষয়েই অজ্ঞ। আমি জানলে আরও অসংখ্য বিষয়ের কথা বলতে পারতাম, অনেক দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে পারতাম। আমার বুদ্ধি ছিল, মাথা ছিল, কিন্তু যখন আমি স্কুলে পড়তাম তখন পড়ায় মন না দিয়ে আমি ফুলবাগানে গিয়ে ফুল চুরি করতাম। আমি তোমাদের মূল্য দিতে রাজি, কিন্তু তোমাদের পূর্ণতা বা সদগুণ সম্বন্ধে। আমার কোনও আগ্রহ নেই। প্রতিটি গুণের অন্তরালে আছে একটা করে দোষ। মিতব্যয়িতা হচ্ছে কৃপণতার প্রতিবেশী, আবার উদারতা হল অমিতব্যয়িতার প্রতিবেশী; বীরত্ব হচ্ছে অত্যধিক সাহসিকতা বা বাহবা পাবার প্রবণতার প্রতিবেশী; অতিরিক্ত ধর্মাচরণ হল ধর্ম সম্বন্ধে বাতিকের প্রতিবেশী। ডাওজেনিসের পোশাকের অসংখ্য ছিদ্রের মতো প্রতিটি গুণের মধ্যে আছে অসংখ্য দোষের ছিদ্র। নিহত বা ঘাতক কার প্রশংসা আমরা বেশি করি, সিজার অথবা ব্রুটাসের। আমরা ঘাতকের প্রশংসাই করে থাকি। তার মানে ব্রুটাসের। বলি, ব্রুটাস দীর্ঘজীবী হোন। এটাই তোমাদের গুণ। গুণ হয়তো বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে মত্ততাও। সব মহাপুরুষের মধ্যেই ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। যে ব্রুটাস সিজারের বুকে ছুরি মেরেছিলেন তিনিই গ্রিক ভাস্কর ঐঙ্গিলিয়নের গড়া এক প্রতিমূর্তির প্রেমিক ছিলেন। এই ঐঙ্গিলিয়ন আবার আমাজন নারী ইউকমেননের এক মূর্তি গড়েন যে মূর্তিটির প্রেমিক ছিলেন নিরো। এইভাবে ব্রুটাস ছিলেন নিরোরই সমগোত্রীয়। ইতিহাস হচ্ছে পুনরাবৃত্তির এক বিরাট পটভূমি। প্রতিটি যুগ তার আগের যুগের অনেক কিছুই অপহরণ করে। ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধ পিদনার যুদ্ধেরই নকল। তলরিয়াক যুদ্ধে ক্লোডিয়ার জয় অস্টারলিৎসে নেপোলিয়নের কথাই মনে পড়িয়ে দেয়। দু ফোঁটা রক্তের মতোই এ দুটি যুদ্ধ জয়ের মধ্যে আছে এক অবিকল সাদৃশ্য। জয়ের মধ্যে আমার কোনও আগ্রহ নেই। জয়ের কোনও অর্থ নেই। আমরা সাফল্যলাভে সন্তুষ্ট হই। কিন্তু জয় মানেই দুঃখ। জয় মানেই অহঙ্কার আর বিশ্বাসঘাতকতা। সমগ্র মানবজাতিকেই আমি ঘৃণা করি। কোন জাতির প্রশংসা করব। আমি জিজ্ঞাসা করতে পারি কি? গ্রিকদের? যে এথেন্সবাসীরা প্রাচীন জগতের মধ্যমণি ছিল তারাই ফোসিয়ানকে হত্যা করে এবং তার অত্যাচারীদের সঙ্গে আঁতা করে। গ্রিসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন বৈয়াকরণিক ফিলেতাস। কিন্তু তিনি এত রোগা ছিলেন যে তিনি যাতে বাতাসে উড়ে না যান তার জন্য জুতোর তলায় সিসে ভরে রাখতেন। কোরিনথের মেন স্কোয়ারে সাইলানিয়নের দ্বারা নির্মিত এপিসথেটসের এক প্রতিমূর্তি আছে। কিন্তু এই এপিসথেটস কে ছিলেন? তিনি ছিলেন কুস্তিগির যিনি ক্রস বাটক নামে একটা অস্ত্র আবিষ্কার করেন। এই হল গ্রিস। আরও এগিয়ে যাও। এরপর ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড কার প্রশংসা করব? ফ্রান্সের কেন প্রশংসা করব? প্যারিসের জন্য? এথেন্সের কথা আমি আগেই চলেছি। ইংল্যান্ডের প্রশংসা করব কেন? লন্ডনের জন্য? আমি কার্থেজকে ঘৃণা করি। তেমনি লন্ডনকেও ঘৃণা করি। লন্ডন হল। বিলাসিতার রাজধানী। চেয়ারিং ক্রস অঞ্চলে প্রতিবছর একশো করে তোক ক্ষুধায় মারা যায়। আমি এক ইংরেজ মহিলাকে একরাশ গোলাপ নিয়ে নীল চশমা পরে নাচতে দেখেছিলাম। ইংল্যান্ড জাহান্নামে যাক। জন্য বুলকে আমি যদি শ্রদ্ধা করতে না পারি তা হলে কি ব্রাদার জোনাথানকে শ্রদ্ধা করব? ক্রীতদাসের সেই মালিকের প্রতি আমার কোনও ভালোবাসা নেই। সময়ানুবর্তিতা ছাড়া ইংল্যান্ডের আর কোনও সম্পদ নেই যেমন তুলো ছাড়া আমেরিকার সম্পদ নেই। জার্মানি হচ্ছে অলস, অকর্মণ্য, ইতালি হচ্ছে বিকৃতমনা। তা হলে কি আমরা রাশিয়ার প্রশংসা করব? ভলতেয়ার অবশ্য রাশিয়ার প্রশংসা করতেন এবং তিনি চীনেরও প্রশংসা করতেন। রাশিয়াতে অনেক সুন্দরী আছে ঠিক, কিন্তু স্বেচ্ছাচারীও আছে। তবে সেইসব অত্যাচারীর জন্য দুঃখ হয় আমার। একজন অ্যালেক্সির মাথা কাটা যায়, একজন পিটার ছুরি খায়, একজন পলের ফাঁসি হয়, আর পায়ের তলায় নিষ্পেষিত হয়ে ভয়ে মারা যায়। অনেক ইভানস-এর মাথা কাটা যায় এবং অনেক নিকোলাসকে বিষ খাইয়ে মারা হয়। এর থেকে বোঝা যায় রাশিয়ার জারের প্রাসাদ বড় অস্বাস্থ্যকর জায়গা। তোমরা হয়তো বলতে পার এশিয়ার থেকে ইউরোপ ভালো। আমি স্বীকার করি এশিয়ার সব কিছু হাস্যাস্পদ। তবে একথাও ঠিক যে তিব্বতের রাজা প্রধান লামাকে নিয়ে হাসাহাসি করার যুক্তি নেই। আমরা পশ্চিমের লোকরা রাজতন্ত্রের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলো গ্রহণ করেছি। রানি ইসাবেলার ময়লা শেমিজ আর রাজা ডফিনের ফুটো চেয়ার হল আমাদের রাজতন্ত্রের প্রতীক। আমাদের ভদ্রলোকরা ব্রাসেলস্, স্টকহলম আর আমস্টারডমের ভালো মদ খায়, কনস্তান্তিনোপলের ভালো কফি খায় তারা। প্যারিস সেদিক থেকে সবচেয়ে ভালো। সভ্য জগৎ একটা জিনিসই ভালো শিখেছে সেটা হল যুদ্ধ, আর যুদ্ধ মানেই ডাকাতি, দস্যুগিরি। আমি প্যারিসের ভালো ভালো মদের দোকানগুলোকে সেলাম করি। আমি শেষ রিচার্ডে খাই। তবে আমার একটা পারস্যের কার্পেটের দরকার যার উপর নগ্ন ক্লিওপেট্রা পাবে। এই ক্লিওপেট্রা এসে গেছে। লুসো তুমি কেমন আছ প্রিয়তমা?
