মেরিয়াস আমতা আমতা করে বলল, মঁসিয়ে আমি—
ল্যাগলে বলল, কিন্তু আমি—
মেরিয়াস বলল, কিন্তু কেন?
ল্যাগলে বলল, তার পরের ব্যাপারটা হল এই। আমি তোমার নামটা বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। এমন সময় আমার নাম ডাকল এবং তখন এক শয়তানি চাতুর্যের সঙ্গে আমার দিকে তাকাল ব্লদো। আমার নাম হল ল্যাগলে।
মেরিয়াস বলল, তার মানে লা ঈগল। কী চমৎকার নাম! যাই হোক, ব্লদো আমার এই চমৎকার নামটা ডাকল এবং আমি উপস্থিত এই বলে উত্তর দিলাম। সে তখন ব্যাগ্রসুলভ তৃপ্তির সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু তুমি যদি মেরিয়াস পঁতমার্সি হও তা হলে তুমি ল্যাগলে হতে পার না। এই মন্তব্য তোমার কাছে অপমানকর ঠেকতে পারে, কিন্তু আমার কাছে ভয়ঙ্করভাবে বিপজ্জনক। সে সঙ্গে সঙ্গে আমার নামটা কেটে দিল।
মেরিয়াস বলল, আমি মর্মাহত।
ল্যাগলে বলে যেতে লাগল, ভাবলাম বেরিয়ে যাবার আগে ব্লদোর ওপর কতকগুলি শক্ত কথার ঢিল ছুঁড়ে যাই। আমি মনে করব ব্লদো মারা গেছে। অবশ্য তার বাঁচা-মরার মধ্যে বিশেষ কোনও পার্থক্য নেই। তার চর্মসার দেহ, ম্লান মুখ, তার গায়ের গন্ধ –সব মিলিয়ে তাকে মৃতই মনে হয়। ব্লদো হচ্ছে নিয়মশৃঙ্খলার দাস, নাকসর্বস্ব বলদ, নামডাকার ধ্বংসাত্মক দেবদূত। একই সঙ্গে সৎ, অনমনীয় এবং ভয়ঙ্কর। সে যেমন আমার নাম কেটে দিয়েছে, ঈশ্বর তেমনি তার নাম সরিয়ে দেবে পৃথিবী থেকে।
মেরিয়াস বলল, আমি খুব বিব্রত বোধ করছি।
ল্যাগলে বলল, হে যুবক, সাবধান হও, ভবিষ্যতে সময়মতো আসবে।
তোমার কাছে হাজারবার ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
নিজের নাম কেটে পরের উপকার করতে যেও না।
আমি সত্যিই খুব দুঃখিত।
আমি কিন্তু খুশি। আমার উকিল হবার ভয় ছিল। এই ঘটনা আমাকে সে ভয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমাকে আর কোনও বিধবাকে বাঁচাতে হবে না বা কোনও অনাথ শিশুকে বিপদে ফেলতে হবে না। কোনও গাউন পরতে হবে না। এইসব কিছুর জন্য মঁসিয়ে পঁতমার্সি, আমি তোমার কাছে ঋণী। তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমি তোমার বাড়ি যাব। কোথায় থাক তুমি?
এই বাড়িতে।
তা হলে বলতে হবে তুমি ধনী। আমি তোমায় অভিনন্দন জানাচ্ছি। তুমি এমন একটা বাসায় থাক যার দাম বছরে নয় হাজার ফ্রাঁ।
এমন সময় কুরফেরাক কাফে থেকে বেরিয়ে এল। মেরিয়াসের মুখে করুণ একফালি হাসি ফুটে উঠল।
মেরিয়াস বলল, গাড়িটা আমি দু’ঘণ্টার জন্য ভাড়া করছি। এখন বেরিয়ে এসেছি। আসল কথা আমার থাকার কোনও জায়গা নেই।
কুরফেরাক বলল, মঁসিয়ে, আমাদের বাসায় চলে এস।
ল্যাগলে ওরফে বোসেত বলল, আমারও থাকার জায়গা নেই, তা না হলে আমার কাছেই থাকতে।
কুরফেরাক বলল, চলে এস বোসেত।
মেরিয়াস বলল, তোমার নাম তো ল্যাগলে।
ল্যাগলে বলল, আমাকে বোসেত বলেই সবাই ডাকে।
কুরফেরাক ঘোড়ার গাড়িটাতে উঠে ড্রাইভারকে হোটেল দ্য লা সেন্ট জাকে নিয়ে যেতে বলল। সেইদিনই সন্ধ্যার সময় মেরিয়াস সেই হোটেলে কুরফেরাকের পাশের একটা ঘরে উঠল।
.
৩.
কয়েক দিনের মধ্যেই মেরিয়াস আর কুরফেরাক দু জনে বন্ধু হয়ে উঠল। যৌবনে মানুষের মনের আঘাত বা ক্ষত শীঘ্রই সেরে যায়। কুরফেরাকের সাহচর্যে স্বস্তি অনুভব করল মেরিয়াস। কুরফেরাক কোনও প্রশ্ন করত না মেরিয়াসকে। কোনও কিছু জানতে চাইত না। এই বয়সে মানুষের মুখ দেখেই অনেক কিছু জানা যায়। কথার কোনও দরকার হয় না।
একদিন সকালবেলায় কুরফেরাক মেরিয়াসকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার রাজনৈতিক মতামত আছে?
অবশ্যই আছে।
তা হলে তুমি কোন দলের?
আমি হচ্ছি বোনাপার্টপন্থীর গণতন্ত্রবাদী।
কুরফেরাক বলল, ঠিক আছে।
পরদিন সে মেরিয়াসকে কাফে খুঁসেতে নিয়ে গেল। হাসিমুখে বলল, আমি তোমাকে বিপ্লবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব।
এই বলে সে কাফের পেছন দিকে এলিসি সংস্থার কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে তার বন্ধুদের সামনে উপস্থিত করল। বলল, একজন নতুন লোক।
মেরিয়াস যেন এক ভীমরুলের চাকে গিয়ে পড়ল। সে চাক ছিল কতকগুলি জীবন্ত মনের গুঞ্জনে মুখরিত। সে ধীর স্থির মেজাজের এবং গম্ভীর প্রকৃতির হলেও তার হুলও কম ছিল না। অবস্থার বিপাকে সে একা পড়ে যাওয়ায় এক সঙ্গে অনেকগুলো যুবকের হৈ-চৈ ও আক্রমণে ভীত হয়ে উঠল। তারা ভয়ঙ্কর স্পষ্টতার সঙ্গে অসংযত উচ্ছ্বাসে যে সব চিন্তা-ভাবনার কথা প্রকাশ করছিল সে সব চিন্তা-ভাবনা তার নিজের চিন্তা-ভাবনার থেকে এত পৃথক ছিল যে সে তার কিছুই বুঝতে পারছিল না। তারা যে সব দর্শন, সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস ও ধর্মের কথা আলোচনা করছিল, তা তার কাছে নতুন। তার সামনে যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল। কিন্তু কথাগুলো সে সব বুঝতে না পারায় সেগুলো অসংলগ্ন আর গোলমেলে মনে হচ্ছিল। সে যখন তার মাতামহের মতবাদ ত্যাগ করে তার পিতার নীতি গ্রহণ করে, তখন সে ভেবেছিল আর কোনও সমস্যা নেই তার মনে। সে তার আকাঙ্ক্ষিত আদর্শকে পেয়ে গেছে। কিন্তু এখন দেখল এক তুমুল আলোড়ন চলছে তার মনে; তার। দৃষ্টিভঙ্গির আবার পরিবর্তন ঘটছে। তার পুরনো ধারণা ও ভাবধারা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগছে তার মনে। তবে তার মনে হল তার নতুন বন্ধুদের আলোচনার বিষয়বস্তু যা-ই হোক, তাদের কথাবার্তার মধ্যে গ্রহণযোগ্য কোনও যুক্তি নেই।
এরপর থিয়েটারের এক পোস্টার নিয়ে আলোচনা হতে লাগল। এক নতুন নাটকের প্রচার সম্বন্ধে বাহোরেল বলল, এইসব বুর্জোয়া ট্র্যাজেডি জাহান্নামে যাক।
