সংশয়বাদী হলেও একজনের প্রতি অদ্ভুত একটা আসক্তি ছিল গ্রান্তেয়ারের। কোনও আদর্শ, ধর্ম, কলা বা বিজ্ঞানের প্রতি তার কোনও আসক্তি ছিল না। একমাত্র আসক্তি তার এঁজোলরাসের প্রতি। গ্রান্তেয়ার এঁজোলরাসকে সত্যিই খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। যে সব বিশ্বাসকেই সংশয়াত্মক প্রশ্নের ছুরি দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিত সে সবচেয়ে একজন গোড়া বিশ্বাসীরই ভক্ত হয়ে ওঠে। এঁজোলরাস কিন্তু কোনও যুক্তিতর্কের দ্বারা তার মন জয় করেনি, তার চরিত্রই তার প্রতি আকৃষ্ট ও আসক্ত করে তোলে গ্রান্তেয়ারকে। এটা অবশ্য এমন কিছু দুর্লভ ঘটনা নয়। আমাদের মধ্যে যা নেই আমরা তার দিকেই ছুটে চলি, সেটার প্রতি আসক্ত হই। কোলাব্যাঙ যেমন উড্ডীয়মান পাখির দিকে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে, তেমনি ধর্মবিশ্বাসের আকাশে উড্ডীয়মান এঁজোলরাসের পানে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসত সংশয়ের মাটিতে আবদ্ধ গ্রান্তেয়ার। এঁজোলরাসকে দরকার ছিল তার। সে তার অজানিতে এবং তার কোনও কারণ না জেনেই সৎ, সরল প্রকৃতির, ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শনিষ্ঠ ও এঁজোলরাসের দ্বারা মুগ্ধ হয়; আসক্ত হয়ে ওঠে তার প্রতি। আসলে সে বিপরীত প্রকৃতির প্রতিই যেন আকৃষ্ট হয়। তার অসংলগ্ন আকারহীন চিন্তা এঁজোলরাসকে যেন মেরুদণ্ড হিসেবে অবলম্বন করতে চায়। আসলে কতকগুলি অসংবদ্ধ, অসংগত ও পরস্পরবিরুদ্ধ উপাদানে গড়া ছিল যেন তার প্রকৃতি। সে ছিল একই সঙ্গে বন্ধুদের প্রতি বিদ্রুপাত্মক এবং অন্তরঙ্গ, উদাসীন এবং স্নেহমমতাশীল। সে জানত না মেহমমতা মাত্রই একটা বিশ্বাস। আসলে সে জানত না, মানুষের মন বিশ্বাস ছাড়া চলতে পারে না, কিন্তু হৃদয় বিশ্বাস বা বন্ধুত্ব ছাড়া চলতে পারে না। এই দ্বিধাবিভক্ত মনোভাব নিয়েই যেন অনেকে জন্মগ্রহণ করে। তারা জোড়া ছাড়া বাঁচতে পারে না। বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়া থাকতে পারত না গ্রান্তেয়ার। আর এই যুবকরাও তার পরিহাসরসিকতার জন্য সহ্য করে যেত তাকে।
এঁজোলরাস কিন্তু গ্রান্তেয়ারকে মোটেই ভালোবাসতে পারত না। সে তার সংশয়মন্যতা আর পাপাসক্তি দুটোকেই অপছন্দ করত। ঘৃণা করত। এক করুণামিশ্রিত ঘৃণার সঙ্গে গ্রান্তেয়ারকে দেখত এঁজোলরাস। কিন্তু এঁজোলরাসের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েও এবং তার কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পেয়েও বারবার সে ফিরে আসত তার কাছে। এসে বলত, কী চমৎকার এক প্রতিমূর্তি।
.
২.
কোনও এক বিকেলে কাফে সঁসের দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল বোসেত। তার দৃষ্টি ছিল প্লেস সেন্ট মাইকেলের ওপর নিবদ্ধ। তার আর এক নাম ছিল ল্যাগলে দ্য মিউ। সে তখন দু দিন আগে স্কুল অফ ল বা আইন বিদ্যালয়ের ক্লাসে ঘটে যাওয়া একটা তুচ্ছ ঘটনার কথা ভাবছিল। কিন্তু ঘটনাটা তুচ্ছ হলেও তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনাটা ওলটপালট হয়ে যায়।
তার সেই দিবাস্বপ্নের মধ্যেও বোসেত দেখতে পেল দু চাকাওয়ালা একটা ঘোড়ার গাড়ি প্লেস সেন্ট মাইকেলের চারপাশে কী একটা জায়গা খোঁজ করে বেড়াচ্ছে। গাড়ির ভেতর যুবক একটা মোটা ব্যাগ হাতে বসে আছে। তার ব্যাগের উপর ঝোলানো একটা ছাপা কার্ডে লেখা আছে মেরিয়াস পঁতমার্সি।
এই নামটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল বোসেত, মঁসিয়ে মেরিয়াস তমার্সিং
গাড়িটা থেমে গেল। গাড়ির ভেতর বসা যুবকটিও তখন ছিল চিন্তায় মগ্ন। সে হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। বলল, হ্যাঁ আমি।
তুমিই তো মেরিয়াস পঁতমার্সি?
অবশ্যই।
আমি তোমারই খোঁজ করছি।
মেরিয়াস বলল, তার মানে কী বলতে চাইছ তুমি?
মেরিয়াস কিছু আগে তার মাতামহের বাড়ি ছেড়ে আসে। কিন্তু এখানে যে তার নাম ধরে ডাকছে এবং যে তার খোঁজ করছে তাকে সে চেনে না। সে তাই আশ্চর্য হয়ে বলল, আমি তো তোমাকে চিনি না।
আমিও তোমাকে চিনি না।
মেরিয়াসের মনে হল যুবকটি ঠাট্টা করছে, কৌতুক করছে। কিন্তু ঠাট্টা-কৌতুক করার মতো মন তখন তার ছিল না।
কিন্তু এতে বোসেতের মন দমে গেল না। সে বলল, গত পরশু তুমি আইন স্কুলে ছিলে না?
সম্ভবত।
হ্যাঁ, তুমি অবশ্যই ছিলে।
মেরিয়াস জিজ্ঞাসা করল, তুমি একজন ছাত্র?
হ্যাঁ মঁসিয়ে, আমিও তোমার মতোই এক ছাত্র। গত পরশু আমি স্কুলে হঠাৎ গিয়ে পড়ি। এটা আমার খেয়াল। অধ্যাপক তখন নাম ডাকছিলেন। তুমি জান এই সময় তারা বড় বিরক্তিকর হয়ে ওঠেন। তিনবার নাম ডাকার পরও তুমি যদি উত্তর না দাও তা হলে ওঁরা তোমার নামের পাশে অনুপস্থিত লিখবেন। আর তার মানে ষাট ফ্রাঁ জলে যাবে।
মেরিয়াস আগ্রহসহকারে শুনতে লাগল। বোসেত ওরফে ল্যাগলে বলে যেতে লাগল।
অধ্যাপকের নাম ব্লদো। টিকোলো নাক আর স্বভাবটা বড় বাজে। সে ছাত্রদের অনুপস্থিত করে আনন্দ পায়। সে শুরু করে নামের আদি অক্ষর পি দিয়ে। ওটা আমার নামের আদি অক্ষর নয় বলে আমি তখন অন্যমনস্ক ছিলাম। যাদের নাম ডাকছিল তারা সবাই উপস্থিত ছিল। বেশই চলছিল। এমন সময় সে মেরিয়াস পঁতমার্সির নাম ডাকল। কিন্তু কেউ উত্তর দিল না। এবার আরও জোরে নামটা ডাকল। কিন্তু তবু কোনও উত্তর না পেয়ে কলমটা হাতে তুলে নিল। তখন আমার করুণা হল। আমি ভাবলাম, সময়মতো পৌঁছতে না পারার জন্য একটা ভালো ছেলে অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত হবে। ভাবলাম, তুমি একজন ভালো ছেলে, জ্ঞানবিদ্যা ও নানারকম শাস্ত্র পাঠে তোমার ঝোঁক আছে। তোমার নাম বাদ যাবে এটা হতে পারে না। অন্যদিকে আমি হচ্ছি একটা বখাটে ছেলে, একটা মস্ত কুঁড়ে। মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করে বেড়াই, তাদের পেছনে ঘুরে বেড়াই। এমনকি এই মুহূর্তে আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে পারি। সুতরাং তোমাকে যেমন করে হোক বাঁচাতে হবে। ব্লদো চুলোয় যাক। ব্লদো তাই তিনবারের বার তোমার নামটা ডাকতেই আমি বলে উঠলাম, মেরিয়াস পঁতমার্সি উপস্থিত। তার ফলে তুমি উপস্থিত চিহ্নিত হলে।
