বোসেত স্বভাবের দিক থেকে আনন্দোহূল্প হয়ে থাকলেও তার ভাগ্যটা ছিল খারাপ। সে জীবনে কোনও কিছুই লাভ করতে পারেনি। কোনও কিছুতে সফল হতে পারেনি। সে সব কিছুই হেসে উড়িয়ে দিত। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তার মাথায় টাক পড়ে। তার বাবার মৃত্যুকালে একটা বাড়ি আর কিছু জমি দিয়ে যায়। কিন্তু ভুল পরিকল্পনায় ব্যবসা করতে গিয়ে সে সব খুইয়ে ফেলে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির কিছুই অবশিষ্ট রইল না তার। তার বিদ্যা শিক্ষা ও জ্ঞানবুদ্ধি ছিল; কিন্তু তা সব ভুল পথে চালিত হয়। তাই সব দিকেই ব্যর্থ হয় সে। কাঠ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলত সে। সব বিষয়ে সে ছিল ব্যর্থতার শিকার, তবু সব ব্যর্থতাকে, ভাগ্যের সব পরিহাসকে হেসে উড়িয়ে দিত সে। নিজের দুর্ভাগ্যকে নিজেই উপহাস করত। সব দুর্ভাগ্যকে, জীবনের যত সব অবাঞ্ছিত ঘটনাকে সহজ বলে মেনে নিত। সে ছিল নিঃস্ব, দরিদ্র, কিন্তু তার মধ্যে ছিল হাসির অফুরন্ত ভাণ্ডার। তার পকেটে পয়সা ফুরিয়ে গেলেও মুখ থেকে হাসি ফুরাত না কখনও। যে কোনও দুঃখ-বিপদে ঘটনাকে এক পুরনো বন্ধুর মতো বরণ করে নিত, তার পিঠের উপর হাত বুলিয়ে দিত। হাতে কোনওভাবে কোনও টাকা পেলেই উদারভাবে খরচ করে ফেলত সে। কোনও এক রাতে রাস্তার একটা অচেনা লোকের সঙ্গে কোনও এক হোটেলে নৈশভোজন করতে গিয়ে একশো ফ্রাঁ খরচ করে ফেলে।
বাহোরেলের মতো আইন পড়ে ওকালতি করার পথে এগিয়ে যায় বোসেত। তার কোনও নির্দিষ্ট থাকার জায়গা ছিল না। একজন বন্ধুর কাছে থাকত। তবে জলি নামে এক ডাক্তারি ছাত্রের কাছেই সে বেশি থাকত। জলি ছিল তার থেকে দু বছরের ছোট।
জলির বয়স ছিল তেইশ। চিকিৎসাশাস্ত্রের যেটুকু সে শিখেছিল তাতে নিজেকে সে ডাক্তারের থেকে রোগী করে তোলে বেশি। এই যুবক বয়সেই নিজেকে এক দুরারোগ্য ব্যাধির শিকার হিসেবে ভাবত। নিজেকে রুগ্ণ ভাবত সব সময় এবং আয়নার সামনে ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে নিজে জিবটাকে পরীক্ষা করত। কোনও দুর্যোগের দিন সে নিজের হাতের নাড়ি টিপে দেখত। তার মধ্যে যৌবনসুলভ কিছু অসংগতি এবং অপ্রকৃতিস্থতা থাকলেও সে-ও আনন্দে প্রায়ই উফুল্ল হয়ে থাকত। তাই তার বন্ধু তাকে ‘জলি’ বলে ডাকত যার অর্থ হচ্ছে উফুল্ল। তার ছড়ির গোল বাঁট দিয়ে নিজের নাকটাকে ঘষার একটা বাতিক ছিল। এটা নাকি বিচক্ষণ মনের লক্ষণ।
বিভিন্ন প্রকৃতির এই যুবকদের মধ্যে একটা কিন্তু সাধারণ ধর্ম ছিল এবং সে ধর্মের নাম ছিল প্রগতি। এরা সবাই ছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রত্যক্ষ বংশধর। ১৭৮৯ সালের নাম উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গেই সবচেয়ে চপলমতি যুবকও গম্ভীর হয়ে উঠত। অথচ তাদের পিতারা সবাই ছিল রাজতন্ত্রী। কিন্তু তাতে তাদের কিছু যেত-আসত না। এক শুচিশুদ্ধ নীতি ও আদর্শের স্রোত বয়ে যেত যেন তাদের দেহের প্রতিটি শিরায়। অতীত যুগের কোনও বৈপরীত্য বা বৈষম্য কোনও বাধা সৃষ্টি করতে পারত না তাদের সামনে।
কিন্তু এইসব গোঁড়া বিশ্বাসী আদর্শে আস্থাবান বন্ধুদের মধ্যে একজন সংশয়বাদী এসে জোটে। এই সংশয়বাদীর ওপর তাদের আকস্মিক আকর্ষণ, বৈপরীত্যের প্রতি আমাদের সহজাত আকর্ষণেরই শামিল। এই সংশয়বাদী যুবকের নাম ছিল গ্রান্তেয়ার। গ্রান্তেয়ারও ছিল প্যারিসের এক ছাত্র। তার ধারণা ছিল প্যারিস শহরে না থাকলে পড়াশুনো হয় না। পড়াশুনো শেখার সঙ্গে সঙ্গে প্যারিসের বিখ্যাত জায়গাগুলোর নামও শিখে ফেলে সে। সে জানত সবচেয়ে ভালো কফি পাওয়া যায় নেম্বলিন কাফেতে, সবচেয়ে ভালো বিলিয়ার্ড খেলার ঘর আছে কাফে ভলতেয়ারে। সবচেয়ে ভালো নাচিয়ে এবং সুন্দর মেয়ে পাওয়া যায় বুলভার্দ দু মেইনে, সবচেয়ে ভালো চিকেন পাওয়া যায় মেরে সাগেতে, আর সবচেয়ে ভালো সাদা মদ পাওয়া যায় ব্যারিয়ের দু কমবাতে। একাধারে সে ছিল বক্সিং খেলায় পারদর্শী, ভালো ব্যায়ামবিদ এবং নাচিয়ে। সে খুব মদ খেতে পারত এবং অনেক বাজি রেখে মদ খেত। সে দেখতে দারুণ কুৎসিত ছিল। তার চোখ-মুখ দেখে বুটপালিশকরা একটা লোক একবার মন্তব্য করেছিল, মানষ এমন কুৎসিত হতে পারে তা আমার ধারণাই ছিল না। তবু তাতে কিছুমাত্র দমে যেত না গ্রান্তেয়ার। সে মেয়েদের দিকে স্থির ও লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাত এবং মনে মনে ভাবত, আমি ইচ্ছা করলেই ওদের পেতে পারি। সে বন্ধুদের কাছে বলে বেড়াত অনেক সুন্দরী মেয়ে তার পিছু নিয়েছে। তাকে ভীষণভাবে চাইছে।
জনগণের অধিকার, মানুষের অধিকার, সামাজিক চুক্তি, ফরাসি বিপ্লব, প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র, মানবতা, সভ্যতা, ধর্ম, প্রগতি প্রভৃতি শব্দ বা শব্দের কোনও অর্থ ছিল না সংশয়বাদী গ্রান্তেয়ারের কাছে। সংশয়বাদ তার মাথার মধ্যে কোনও বিশ্বাসকেই দাঁড়াতে দিত না। তার বুদ্ধিকে করে তুলেছিল একেবারে শুষ্ক নীরস। সে সবকিছুকে উপহাস করে উড়িয়ে দিত। একগ্লাস মদই ছিল তার একমাত্র বিশ্বাসের বস্তু। কোনও আদর্শে বিশ্বাস তার কাছে ছিল চরম উপহাস ও বিদ্রুপের বস্তু। সে খ্রিস্টীয় ক্রসকে এক ধরনের ফাঁসিকাঠ বলে অভিহিত করত। সে ছিল নারীলোলুপ, মাতাল এবং অমিতব্যয়ী এবং সে তার আশাবাদী বন্ধুদের কাছে শুধু রাজা চতুর্থ হেনরির গুণগান করে বিরক্ত করে তুলঁত তাদের যে হেনরি ছিল তারই মতো নারীলোলুপ এবং পাপাসক্ত।
