পিতৃমাতৃহীন কুলি ছিল একজন পাখা প্রস্তুতকারক মিস্ত্রি। তার দৈনিক রোজগার ছিল মাত্র তিন ফ্রাঁ। তার একমাত্র চিন্তা ছিল জগতের মানুষকে মুক্ত করা। তার আর একটা চিন্তা ছিল লেখাপড়া শেখার। সে বলত একমাত্র শিক্ষাই মানুষের আত্মাকে মুক্ত করতে পারে। সে নির্জনে নিজের চেষ্টায় পড়তে-লিখতে শেখে। তার অন্তর ছিল স্নেহমমতায় উত্তপ্ত। সে পিতামাতাকে হারিয়ে তার দেশকে মা আর সমগ্র মানবজাতিকে তার পিতা ভাবত। জাতীয়তার ভাবধারা গভীরভাবে অন্তরে পোষণ করত সে। তার প্রতিবাদ যাতে সুসংবদ্ধ ও সুদৃঢ় হয় তার জন্য ইতিহাস থেকে তথ্য সংগ্রহ করত। সেকালে যে যুবশক্তি শুধু ফ্রান্সের কথা, দেশের কথা ভাবত, সে ছিল তাদের থেকে স্বতন্ত্র, কারণ সে তখন ভাবত বিরাট বিশ্বের কথা যে বিশ্বে ফ্রান্সের সঙ্গে সঙ্গে ছিল গ্রিস, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া আর ইতালি। স্বাধিকারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্বন্ধে তার চেতনা ছিল প্রবল। তুর্কির দ্বারা ক্রিট ও থেসালি দখল, রাশিয়ার দ্বারা পোল্যান্ড দখল, অস্ট্রিয়ার দ্বারা ভেনিস দখল প্রভৃতি ঘটনাগুলো প্রচণ্ড ক্রোধ জাগায় তার মনে। ঘৃণা আর আত্মপ্রত্যয় ও সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা যে বাগিতা সঞ্জাত সেই বাগিতাই ছিল একমাত্র শক্তি। সে শুধু অক্লান্তভাবে বলত সেইসব বীর মহান জাতিদের কথা যারা বিশ্বাসঘাতক, অন্য কোনও অত্যাচারী আগ্রাসী জাতির দ্বারা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়, যারা এক বিরাট ফাঁদের শিকার, জন্মমুহূর্তে যে সব জাতির গলা টিপে তাদের হত্যা করা হয়। কপর্দকহীন নিঃস্ব এক শ্রমিক নিজেকে ন্যায়পরায়ণতার অভিভাবক ভাবতে থাকে এইভাবে। শুধু মানবজাতির সহজাত অবিনশ্বর অধিকারের দাবি জানিয়ে মহত্ত্ব অর্জন করে সে। আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী রাজারা অহেতুক রাজ্য জয় করে তাদের উদ্যম, শক্তি আর সম্মানের অপচয় করে থাকে। কোনও বিজিত জাতিকে বেশিদিন বশীভূত রাখা যায় না। আজ হোক কাল হোক পদানত জাতি একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবেই। গ্রিস আজও গ্রিসই আছে, ইতালি ইতালিই আছে। পরাজয় দখল পরপহরণের মতোই ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়। কোনও একটা জাতিকে কখনও রুমালের মতো পকেটে ঢুকিয়ে রাখা যায় না।
কুরফেরাক ছিল এক সম্মানিত ব্যক্তির ছেলে লোকে যাকে মঁসিয়ে দ্য কুরফেরাক বলে ডাকত। রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগে ফ্রান্সে বুর্জোয়ারা আপন আপন উপাধির প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন ছিল। কিন্তু কুরফেরাক নিজের নামের সঙ্গে কোনও সম্মানসূচক উপাধি জুড়ে না দিয়ে নিজেকে শুধু কুরফেরাক বলত।
যে থোলোমায়েস একদিন ফাতিনর প্রেমিক ছিল সেই থোলোমায়েসের লেখা পড়ত কুরফেরাক। সে ছিল এমনই এক যৌবনসুলভ উদ্যমের অধিকারী যে উদ্যমের মাঝে ছিল আত্মার এক নারকীয় সৌন্দর্য। কিন্তু সে সৌন্দর্যের উজ্জ্বলতা বেশি দিন থাকে না, তা সহজেই ম্লান হয়ে যায়। ১৮১৭ সালে থোলোমায়েসের মুখে যে কথা শোনা গেছে, ১৮২৮ সালে যে কেউ কুরফেরাকের মুখেও সেই কথা শুনতে পেত। কিন্তু দু জনের মধ্যে পার্থক্যও ছিল প্রচুর। থোলোমায়েস অন্তরের দিক থেকে ছিল এক অবৈধ প্রেমের নায়ক আর কুরফেরাক অন্তরের দিক থেকে ছিল এক বীরপুরুষ।
এঁজোলরাস ছিল নেতা, কমবেফারে ছিল পথপ্রদর্শক আর কুরফেরাক ছিল কেন্দ্র। কেন্দ্রোচিত গুণ তার ছিল। কেন্দ্রে অবস্থান করে যে তাপ সে বিকীরণ করত সেই তাপ থেকেই আলো জ্বালাত এবং আলোক বিকিরণ করত অন্যরা।
উদারনীতিবাদীদের এক বিক্ষোভ মিছিলে লালিমাদ নামে যে ছাত্র মারা যায় এবং যার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ১৮২২ সালে এক রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামা হয়, বাহোরেল তাতে এক সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে। বাহোরেলের উদ্দেশ্য ভালোই ছিল। কিন্তু সে ছিল এক উদ্ধত এবং আপোসহীন বিপ্লবী সাহসী, অমিতব্যয়ী, উদার এবং বাগ্মী। সে ছিল যেন জন্মবিক্ষুব্ধ এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। ঝগড়ার থেকে বিদ্রোহে এবং বিদ্রোহের থেকে বিপ্লবে মজা পেত সে বেশি। একাদশ বর্ষের এক সামান্য ছাত্র হয়েও জানালার কাঁচের সার্সি ভাঙার মতো সহজে এক সরকারের উচ্ছেদ ঘটাতে পারত সে। সে স্কুলে পড়ার সময়েও যখন-তখন গান গাইত এবং শিক্ষকদের বিদ্রূপ করত। হাতখরচ হিসেবে বাড়ি থেকে তিন হাজার ফ্রা’র মতো যে মোটা টাকা পেত তা সে বাজে খরচ করে উড়িয়ে দিত। সে ছিল এক বড় চাষির ছেলে। কিভাবে ছেলেকে সম্মান দিয়ে চলতে হয় তা সে তার বাপ-মাকে শেখাত। সে তার বাবা-মা সম্বন্ধে বলত, ওরা চাষি, বুর্জোয়া নয়, তাই তাদের কিছুটা বোধশক্তি আছে।
বাহোরেল ছিল খেয়ালি। সে প্রায়ই বিভিন্ন কাফেতে ঘুরে বেড়াত। পথে পথে পায়চারি করে বেড়াত। ভুল করাই যেমন মানুষের কাজ তেমনি পথে পথে ঘুরে বেড়ানোই হল প্যারিসবাসীর কাজ। তবু তার মধ্যে ছিল এক চিন্তাশীল মন এবং এলিসি সংস্থা ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত।
যুবকদের এই সঙ্ঘের মধ্যে মাথায় টাকওয়ালা এক যুবক ছিল। তার নাম ছিল বোসেত। বোসেতের বাবার নাম ছিল মার্কুই দ্য আভারে। অষ্টাদশ লুই যেদিন বিদেশ থেকে ফ্রান্সে ফিরে এসে ক্যালে বন্দরে নামেন সেদিন তার জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করে। দেন বোসেতের বাবা ল্যাগলে। এজন্য খুশি হয়ে রাজা তাকে ডিউক উপাধি দান করেন। ল্যাগলে রাতারাতি হয়ে ওঠে মার্কুই দ্য আভারে।
