যে এঁজোলরাস ফরাসি যুক্তিতর্কের দিকটির প্রতিনিধিত্ব করত সেই এঁজোলরাসের পাশে ছিল কমবেফারে যে দর্শনের দিকটির প্রতিনিধিত্ব করত। যুক্তি বা তর্কবিদ্যা আর দর্শনের সঙ্গে তফাৎ এই যে যুক্তিতর্ক যখন সব সমস্যার যুদ্ধের দ্বারা সমাধান করতে চায়, দর্শন সে সমস্যার সমাধান করতে চায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে। কমবেফারে ছিল যেন এঁজোলরাসের সম্পূরক। এঁজোলরাস কোনও বিষয়ে বাড়াবাড়ি করলে তাকে সংহত করত কমবেফারে। কমবেফারে এঁজোলরাসের মতো অতটা উন্নত না হলেও তার মনের প্রসারতা ছিল। বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে সে সভ্যতার কথাটাও বলত। রুক্ষকঠিন পাহাড়ের মতো যে কোনও নীতি ও তত্ত্বকথার চারদিকে সে এনে দিত উদার উন্মুক্ত দিগন্তের প্রসারতা। এঁজোলরাস চেয়েছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার আর কমবেফারে চেয়েছিল বৈধ অধিকার। প্রথম জন রোবোসপিয়ারের সঙ্গে মিলে মিশে চলত আর দ্বিতীয় জন ছিল কনডরমেতের ভক্ত। এঁজোলরাসের থেকে অনেক বেশি বাস্তবজীবন সম্বন্ধে সচেতন ছিল কমবেফারে। একজন ছিল নীতি আর একজন জ্ঞানের উপাসক। এঁজোলরাস ছিল পুরুষোচিত শক্তি ও বীর্যবত্তার উপাসক, কমবেফারে ছিল বিশুদ্ধ জ্ঞান আর মানবতাবাদের উপাসক। সে নাগরিক’ কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ’ এ কথাটাও বলত। সে সবকিছু পড়ত, আর পাঁচজনের কথা শুনত, বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পরিচিত ছিল। সে কুসংস্কারে বিশ্বাস না করলেও কোনও কিছু উড়িয়ে দিত না। এমনকি ভূতপ্রেতের অস্তিত্বকে স্বীকার না করলেও অস্বীকার করত না। সে বলত, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে স্কুলমাস্টারদের ওপর। আবার দেশের শিক্ষাসমস্যা নিয়েও চিন্তা করত। আলোচনা করত। সে বিশ্বাস করত সমাজের কাজ হল বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধন করে সকল মানুষের নৈতিক ও বুদ্ধিগত মানকে উন্নত করার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করে যাওয়া। বিজ্ঞানের সব রকম সাহায্য নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলায় সে ছিল বিশেষ আগ্রহী। মানবজাতির অগ্রগতির পথে কুসংস্কার, স্বৈরাচার প্রভৃতি কোনও বাধা-বিপত্তিকে স্বীকার বা ভয় করত না সে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, পরিশেষে জ্ঞানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে সব কিছুর উপর। এঁজোলরাস ছিল যেন সেনাপতি আর কমবেফারে ছিল পদপ্রদর্শক। এঁজোলরাস সব পেতে চাইত লড়াই করে, সংগ্রাম করে এগিয়ে যেতে। কমবেফারে লড়াই যে চাইত না, তা নয়। অগ্রগতির পথে কোনও প্রত্যক্ষ বাধা অপসারিত করার জন্য বলপ্রয়োগ ও সগ্রামের পক্ষপাতী ছিল। তবে পারতপক্ষে যতদূর সম্ভব মানুষকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে মানুষের মনকে উন্নত করে কর্তব্য সম্বন্ধে তাদের সচেতন করে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যেত সে। আগুন আর আলোর মধ্যে আলোটাকেই বেছে নিয়েছিল কমবেফারে। আগুনের কৃত্রিম আভায় অন্ধকার কাটে ঠিক, কিন্তু সব অন্ধকারের পরিপূর্ণ অপসারণের জন্য সূর্যোদয়ের জন্য কেন অপেক্ষা করব না আমরা যা কিছু মহান তার ভয়ঙ্কর ঐশ্বর্যের চোখধাঁধানো উজ্জ্বলতার থেকে যা কিছু শুভ তার শান্ত শুভ্র জ্যোতিকে বেশি পছন্দ করব। যে ১৭৯৩ সালে সত্যের সন্ধানে সমগ্র জতি বিপ্লবের গভীরে ঝাঁপ দেয়, যে ঘটনার আবর্তে জড়িয়ে পড়ে, কমবেফারে তাকে ভয় করত। সে স্থবিরতা বা স্থিতিশীলতা চাইত না, আবার অস্বাভাবিক দ্রুত গতির মত্ততাকেও চাইত না। তার বন্ধুরা যখন বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যোন্নতির কথা বলত, সে বলত মানুষের প্রগতি হবে বুদ্ধিবিবেচনা প্রসূত, যার মধ্যে কোনও মত্ততা বা অপরিণামদর্শিতা থাকবে না, সে বলত প্রগতি তার নিজের পথ আপনিই বেছে নেবে। সে প্রগতি এক শান্ত শুভ পদ্ধতির পথ ধরে এগিয়ে যাবে। কমবেফারে মানবজাতির এমন এক ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করত যে ভবিষ্যৎ হবে শুভ শক্তি আর সরলতার মূর্ত প্রতীক, যা মানবজাতির বিরাট বিবর্তনধারাটিকে ক্ষুণ্ণ করবে না কিছুমাত্র। সে প্রায়ই বলত যা কিছু তা হবে নির্দোষ, সমস্ত কলুষ থেকে মুক্ত। সে বলত এক ধ্বংসাত্মক শক্তির ভয়ঙ্কর ঐশ্বর্যে দীপ্তিমান এবং ঈগলের মতো যে বিপ্লব চোখে আগুন আর ঠোঁটে রক্ত নিয়ে এক অন্ধ আদর্শের লক্ষ্যাভিমুখে এগিয়ে যায় সে বিপ্লবের মধ্যে প্রগতি বা অগ্রগতির কোনও সৌন্দর্য থাকতে পারে না। হাঁসের ডানাওয়ালা দেবদূত আর ঈগলের ডানাওয়ালা দেবদূতের মধ্যে যা পার্থক্য–ওয়াশিংটন আর দাঁতনের মধ্যেও সেই পার্থক্য।
জাঁ প্রভেয়ার ছিল কমবেফারের থেকে আরও নরম চিত্তের মানুষ। যে কল্পনা এবং আবেগ সেকালের যুবমানসের বৈশিষ্ট্য সেটা পূর্ণমাত্রায় ছিল তার মধ্যে। আসলে আঁ প্রভেয়ার ছিল প্রেমিক। সে ফুল ভালোবাসত, বাঁশি বাজাত, কবিতা লিখত, মানুষকে ভালোবাসত, নারী ও শিশুদের দুঃখে সমবেদনা জানাত ও কাঁদত। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ও ঈশ্বরে বিশ্বাস করত। আঁদ্রে শেনিয়েরের গলা কাটার জন্য সে বিপ্লবকে ভর্ৎসনা করত। সে ছিল খুবই দয়ালু। তার কণ্ঠস্বর নরম হলেও মাঝে মাঝে তা গুরুগম্ভীর ও প্রভুত্বমূলক হয়ে উঠত। সে খুব পড়াশুনো করত। সে ইতালি, লাতিন, গ্রিক ও হিব্রু–এই চারটি ভাষা জানত এবং এই চারটি ভাষার সাহায্যে দান্তে, জুভেলাস, এসকাইলাস আর ইগাইয়ার রচিত কাব্য পড়ত। ফরাসি সাহিত্যে সে রেসিনের থেকে কর্নেল আর কর্নেলের থেকে অ্যাগ্রিপ্পা দ্যবিগ্নের লেখা পছন্দ করত। ফুলগাছে ঘেরা পথে বা প্রান্তরের উপর দিয়ে পথ চলতে ভালোবাসত সে। আকাশে মেঘেদের গতিভঙ্গির প্রতি তার যেমন কোনও খেয়াল ছিল না তেমনি সামাজিক ঘটনাবলির গতিপ্রকৃতির দিকেও কোনও খেয়াল ছিল না তার। তার মনের ছিল দুটো দিক–একদিকে ছিল মানুষ আর একদিকে দেবতা। মানুষের জন্য সে পড়াশুনো করত আর ঈশ্বরের জন্য সে ধ্যান করত, উপাসনা করত। সারাদিন ধরে বেতন, মূলধন, ধর্ম, বিবাহ, চিন্তা ও প্রেমের স্বাধীনতা, শিক্ষা, শাস্তিক্যবস্থা, দারিদ্র্য, সম্পত্তি, উৎপাদন, বণ্টন, সমাজের নিচের তলার মানুষদের আবিষ্কার ও জীবনযাত্রা প্রভৃতির নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাত সে। কিন্তু রাত্রিতে সে শুধু ভাবত অনন্ত আকাশের কথা। এঁজোলরাসের মতো প্রুভেয়ারও ছিল ধনীঘরের একমাত্র ছেলে। সে ছিল লাজুক প্রকৃতির, খুব শান্ত ও নরম সুরে কথা বলত, যখন-তখন লজ্জায় রাঙা হত। আবার মাঝে মাঝে সে হয়ে উঠত নির্ভীক।
