পরিবর্তনের যে প্রবল হাওয়া বইছিল তাতে পুরনো প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার ভিত্তি কেঁপে উঠছিল। সে ব্যবস্থায় কেউ আস্থা স্থাপন করতে পারছিল না। পরিবর্তনের হাওয়ায় ছিল বিপ্লবের পূর্বাভাস। জনগণের উচ্চাভিলাষের সঙ্গে রাষ্ট্রনেতাদের ক্ষমতাদ্বন্দ্বের এক অঘোষিত লড়াই চলছিল। জার্মানির তুগেনবাদ বা ইতালির কার্বোনারির মতো কোনও বড় প্রতিষ্ঠান তখন ফ্রান্সে ছিল না। এইতে তখন কুর্দ এবং প্যারিসে এলিসি নামে এক সংস্থা গড়ে উঠছিল সবেমাত্র।
আপাতদৃষ্টিতে এলিসি সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল শিশুশিক্ষার বিস্তার। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের আত্মোন্নতি।
এলিসি অক্ষর তিনটি হল ‘অ্যাবাইসি’ এই ফরাসি শব্দের অপভ্রংশ, যার অর্থ হল সাধারণ জনগণ। সমাজে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিষ্ঠা চাই।
এলিসি প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুব একটা বড় ছিল না, তার সদস্যসংখ্যা বেশি ছিল না। আসলে সেটা ছিল এক রাজনৈতিক চক্রান্তের গোপন সংস্থা। প্যারিসের মধ্যে দুটো জায়গায় তার সদস্যরা মিলিত হত। একটা ছিল লে হ্যাঁনের কাছে কোরিনথের পানশালায় আর একটা জায়গা ছিল প্লে সেন্ট মাইকেল অঞ্চলে মুর্সে নামে একটা ছোট কাফেতে। প্রথম জায়গাটাতে সংস্থার শ্রমিক সদস্যরা মিলিত হত আর দ্বিতীয়টাতে মিলিত হত ছাত্রেরা।
এলিসি সোসাইটির আলোচনাসভা বসত কাফে মুসের পেছন দিকের একটা ঘরে। আসল কাফে থেকে সেই ঘরটার মাঝখানে একটা রাস্তা ছিল। ঘরটার মধ্যে দুটো জানালা আর একটা দরজা ছিল। সেখানে সদস্যরা প্রায়ই এসে মদ খেত আর ধূমপান করত। তারা জোর হাসাহাসি করত এবং সাধারণ বিষয়ে জোর গলায় কথা বলত। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় কোনও বিষয়ে নিচু গলায় কথা বলত। একদিকের দেয়ালে প্রজাতন্ত্রের আমলের ফ্রান্সের একটা মানচিত্র টাঙানো ছিল।
এলিসি সংস্থার বেশির ভাগ সদস্য ছিল ছাত্র। এইসব ছাত্রের সঙ্গে যেসব শ্রমিকের যোগাযোগ ছিল সেইসব শ্রমিক এই সংস্থার সদস্য হত। পরে এইসব সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন ইতিহাসে স্থান পায়। এরা হল এঁজোলরাস, বেফারে, জাঁ প্রুভেয়ার, কুলি, কুরফেরাক, বাহেরেল, ল্যাগলে, জলি আর গ্রান্তেয়ার। এরা সবাই ছিল বয়সে যুবক। এরা সবাই মিলে যেন একটি পরিবার গঠন করে। তারা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ল্যাগলে ছাড়া তারা সবাই মিদি থেকে আসে।
আমরা প্রথমেই তো এঁজোলরাসের নাম করেছি। তার একটা কারণও আছে। সে ছিল ধনী পিতামাতার একমাত্র সন্তান। দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি অন্যদিকে ত্রাসের বস্তু। একাধারে ভীষণ সুন্দর এই ছেলেটি ছিল যেন দুর্ধর্ষ অ্যান্টিনোয়াস। তার মুখখানাকে সব সময় চিন্তায় গম্ভীর দেখাত। তাকে দেখে মনে হত সে যেন বিপ্লবে অনেক পরিশ্রম করেছে। মনে হত সে যেন বিপ্লবের প্রতিটি ঘটনার কথা জানে। সেই বিরাট বিপ্লবের সব ঢেউ যেন তার রক্তের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। সে ছিল সত্যিই এক অদ্ভুত যুবক যাকে দেখে একই সঙ্গে চিন্তাশীল পণ্ডিত ও বীর যোদ্ধা বলে মনে হত। একাধারে সে ছিল যেন গণতন্ত্রের সৈনিক আর ধর্মের যাজক, যিনি সমকালীন সব আন্দোলন প্রতি-আন্দোলনের ঊর্ধ্বে। তার ছিল দুটো বড় বড় চোখ, নিজের ঠোঁটটা থাকত সব সময় ঘৃণায় কুঞ্চিত, আর ছিল প্রশস্ত ললাট, যা ছিল দিগন্তের উপর শোভিত উদার আকাশের মতোই প্রশান্ত। সে ছিল এমনই একজন যুবক যার গায়ের চামড়া আর মুখখানা মেয়েদের মতো ম্লান হলেও মনে-প্রাণে সে ছিল অত্যুৎসাহী আর অতিপ্রাণচঞ্চল। তার বয়স বাইশ হলেও তাকে সতেরো বছরের এক কিশোর বলে মনে হত। নারী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই কঠোর এবং পৃথিবীতে কোনও নারীর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার কোনও চেতনাই ছিল না। তার একমাত্র আসক্তি ছিল শুধু ন্যায়পরায়ণতার প্রতি, যতসব বাধা-বিপত্তিকে জয় করাই ছিল তার একমাত্র চিন্তা। সে কোনও গোলাপ দেখত না, কোনও পাখির গান শুনত না, বসন্তের কোনও মদির মোহময় আবেদনে সাড়া দিত না। পরমাসুন্দরী পরী ইভাদনের উন্নত অনাবৃত বক্ষস্থলও কোনওভাবে বিচলিত করতে পারত না তাকে। হর্মোদিয়াসের মতো ফুলের বনে শুধু তরবারি লুকিয়ে রাখা ছাড়া ফুলের অন্য কোনও প্রয়োজন ছিল না তার কাছে। এমনকি আমোদ-প্রমোদের ক্ষেত্রেও সে ছিল কঠোর এবং নীতিবাগীশ। প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন কোনও বস্তু বা ঘটনার প্রতি কোনও নজর বা আগ্রহ ছিল না তার। সে ছিল যেন কোনও স্বাধীনতা প্রেমিকের প্রাণহীন মর্মরমূর্তি। তার কথাগুলো কড়া হলেও কণ্ঠে ছিল গীতিময়তার সুর, যা ক্রমশ বাগিতার উচ্চস্তরে উঠে যেত ধীরে ধীরে। কোনও মেয়ের পক্ষে তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলা বড় শক্ত ছিল। প্লেস কামাই বা র্যু সেন্ট জাঁ দ্য বোভাইয়ের কোনও সুন্দরী যুবতী যদি তার তরুণ বালকের মতো সুন্দর মুখ, নীল চোখের সুন্দর পাতা, হাওয়ায় উড়তে থাকা রেশমি চুলের রাশ, ঝকঝকে দাঁতের উপর লাল ঠোঁট প্রভৃতির দ্বারা সমৃদ্ধ তার দেহসৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার দিকে এগিয়ে যেত তা হলে তীক্ষ্ণ নীরস দৃষ্টির শরে বিদ্ধ হয়ে পিছিয়ে আসতে হত, যেন এক অনতিক্রম্য দুর্লঙ্ খাদের অন্তহীন বিশালতার সম্মুখীন হতে হত, যে খাদ তাকে এই শিক্ষাই দিত যে সে যেন এজেকাইলের শেরুবিসের সঙ্গে বোমারশাই-এর শেরুবিলিকে গুলিয়ে না ফেলে।
