মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের মুখ থেকে সব হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি কড়া কর্কশ গলায় বললেন, আমি তোমার পিতা।
মেরিয়াস মুখটা নামিয়ে বলল, আমার পিতা একজন সামান্য সৈনিক হলেও তিনি বীরত্বের সঙ্গে প্রজাতন্ত্র ও ফ্রান্সের সেবা করেন এবং দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে গৌরবের সঙ্গে উল্লিখিত আছে। তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে বৃষ্টিতে, বরফে, কাদায়, জলে, কামানের সামনে বুক পেতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি শত্রুপক্ষের দুটো পতাকা দখল করেন, কুড়িবার আহত হন, অথচ সম্পূর্ণ বিস্মৃত ও অবহেলিত অবস্থায় মারা যান। তার শুধু একটামাত্র দোষ ছিল। দেশ আর আমি এই দুই অকৃতজ্ঞকে সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। অন্তর উজাড় করে সব কিছু বিলিয়ে দেন তাদের জন্য।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ আর সহ্য করতে পারছিলেন না। প্রজাতন্ত্র’ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বসে থাকতে থাকতে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি লাফিয়ে উঠলেন। মেরিয়াসের প্রতিটি কথার আঘাতে ব্যথাহত হয়ে উঠছিলেন। তাঁর মুখের রংটা ধূসর থেকে গোলাপি এবং ক্রমে গোলাপি থেকে আগুনের মতো লাল হয়ে উঠল। তিনি গর্জন করে উঠলেন, ঘৃণ্য অর্বাচীন কোথাকার। আমি তোমার পিতার কথা কিছু জানি না, আর জানতে চাইও না। তবে এইটুকু জানি যে ওই ধরনের লোকরা সব শয়তান, দস্যু, ডাকাত, খুনি। তাদের সবাই তাই। কোনও ব্যতিক্রম নেই। তুমি যদি ব্যারন হও তা হলে আমার চটি জোড়াটার থেকে তার দাম বেশি নয়। যেসব লোক রোবোসপিয়ারের সেবা করে তারা ছিল শয়তান আর যেসব লোক বোনাপার্টের সেবা করে তারা ছিল জুয়োচোর। যারা তাদের বৈধ রাজার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যারা ওয়াটারলু যুদ্ধ থেকে ইংরেজ ও প্রুশীয়দের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল তারা কাপুরুষ, তারা দুবৃত্ত। আমি শুধু এইটুকু জানি। তোমার পিতা যদি তাদেরই একজন হয় তা হলে খুবই দুঃখের ব্যাপার। তা হলে আমার করার কিছু নেই।
মেরিয়াস রাগে কাঁপতে থাকে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয়চেতনা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। কোনও যাজক যদি দেখে তার উপাস্যবস্তুকে কেউ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে অথবা কোনও সন্ন্যাসী যদি দেখে তার বিগ্রহ মূর্তির উপর কেউ থুতু ফেলেছে তা হলে তার যেমন অবস্থা হয় তেমনি মেরিয়াসেরও হল। এটা সহ্য করতে পারা যায় না। কিন্তু সে কী করবে? তার পিতা অপমানিত হয়েছে তার সামনে, কিন্তু এক্ষেত্রে অপমানকারী হচ্ছে তার মাতামহ। সে তার মাতামহকে অপমান করে যেমন প্রতিশোধ নিতে পারে না তেমনি পিতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অপমানের বোঝও সে সহ্য করতে পারে না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে চিৎকার করে বলে উঠল, বুর্বনদের সঙ্গে মোটা শুয়োর অষ্টাদশ লুই নিপাত যাক!
অষ্টাদশ লুই চার বছর আগেই মারা গেছে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ উঠে ঘরের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দর্পিত পদভরে পায়চারি করতে লাগলেন। যেন মনে হল পাথরের এক ভারী মূর্তি হেঁটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তিনি তাঁর মেয়ের উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বললেন, এই ভদ্রলোকের মতো একজন ব্যারন এবং আমার মতো একজন বুর্জোয়া কখনই এক বাড়িতে থাকতে পারে না।
তার পর প্রচণ্ড রাগের চাপে কপালটাকে ফুলিয়ে মেরিয়াসের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, বেরিয়ে যাও।
মেরিয়াস সেইদিনই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
পরদিন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তাঁর মেয়েকে বললেন, ছয় মাস অন্তর কিছু করে ওই রক্তচোষাটাকে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমার কাছে তার নাম কখনও করবে না।
মেডেলের মতো যে খাপটাতে কর্নেলের নিজের হাতে লেখা চিঠিটা ছিল সেই খাপটা নিকোলেত্তের হাত থেকে কোথায় পড়ে যায়। সে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের হুকুমে মেরিয়াসের মালপত্র সব গুছিয়ে দিচ্ছিল। মেরিয়াস সেটা না পেয়ে ভাবল তার মাতামহ ইচ্ছা করে তার বাবার হাতের লেখা চিঠিটা নষ্ট করে দিয়েছে।
মেরিয়াস বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় সে কোথায় যাচ্ছে তা বলে গেল না। সে কোথায় যাচ্ছে তা সে নিজেই জানে না। তার কাছে তখন শুধু তিরিশ ফ্র, একটা হাতঘড়ি আর কিছু পোশাক ছিল। একটা ব্যাগে ভরে এইসব কিছু নিয়ে সে চলে গেল। সে একটা গাড়ি ভাড়া করে ড্রাইভারকে লাতিন কোয়ার্টারের দিকে যেতে বলল।
এরপর মেরিয়াসের কী হবে?
D0ne page 450 চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১.
আপাতশান্ত আপাত উদাসীন যুগটার অন্তরালে একটা ক্ষীণ বিপ্লবের হাওয়া বইছিল। যেন অতীত ‘৮৯ ও ‘৯২ সালের ভেতর থেকে একটা করে দমকা হাওয়া উঠে এসে নিস্তরঙ্গ বাতাসটাতে ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভাবধারার পরিবর্তন হচ্ছিল। সবাই এগিয়ে যেতে চাইছিল, অগ্রগতির মোহে মেতে উঠছিল সবাই। রাজতন্ত্রীরা উদারনীতিবাদী হয়ে উঠছিল। আবার উদারনীতিবাদীরা গণতন্ত্রবাদী হয়ে উঠছিল।
নেপোলিয়নের নামের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার জয়গান গাইছিল সবাই। ইতিহাসের এমনই একটা যুগের কথা বলছি আমরা, যে যুগ যেন একটা মরীচিৎকার পেছনে ছুটে চলেছিল। ভলতেয়ারপন্থী রাজতন্ত্র আর বোনাপার্টপন্থী উদারনীতিবাদ মিলে মিশে যেন এক হয়ে গিয়েছিল।
এছাড়া আরও কিছু মতবাদ ছিল। একদল লোক মৌল নীতির খোঁজ করত আর একদল চাইত আইনের অনুশাসন। তবে বেশির ভাগ লোক এমন এক সর্বাত্মক তত্ত্বে বিশ্বাস করত যে তত্ত্ব তাদের মনকে উর্ধ্বে আকর্ষণ করবে। সে তত্ত্ব অলীক অবাস্তব হলেও তাতে কোনও ক্ষতি ছিল না, কারণ আজ যা অলীক এবং অবাস্তব, আগামীকাল তা-ই হয়ে উঠবে রক্তমাংসের মানুষের মতো জীবন্ত।
