এ ধরনের কাজে থিওদুলের কোনও মত ছিল না। কিন্তু তার পিসি তাকে দশ লুই-এর একটা মুদ্রা দেওয়ায় সে তৎপরতা দেখায় এ কাজে। এ ছাড়া আরও দিতে পারে পরে। সে বলল, ঠিক আছে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
তার পিসি তাকে আলিঙ্গন করল। তার পর বলল, তুমি কখনও এই বাড়ি থেকে পালাতে পার না যখন-তখন। তোমার শৃঙ্খলাবোধ ও কর্তব্যবোধ আছে। কোনও নির্লজ্জ কাজের জন্য তুমি যখন-তখন বাড়ি ছেড়ে যাবে না।
থিওদুল সততার হাসি হাসল।
সেদিন সন্ধ্যায় মেরিয়াস যখন ঘোড়ার গাড়িতে চেপে রওনা হল তখন সে বুঝতে পারল না তাকে একজন লক্ষ করছে। এদিকে থিওদুল কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লাগল। পরদিন সকালে ভার্নলে গাড়ি থামতেই গার্ড থিওদুলকে গাড়ি পাল্টাবার কথা মনে করিয়ে দিল। ভার্নলে নামার পর থিওদুলের মনে পড়ে গেল মেরিয়াসের কথাটা। কিন্তু কথাটা মনে করতে হাসি পেল তার।
তার মনে হল মেরিয়াস অনেক আগেই নেমে গেছে। কী ছাইপাস চিঠি দিয়ে জানাব?
এমন সময় সে দেখল গাড়ির উপর থেকে কালো পায়জামা পরে মেরিয়াস নামছে।
এক চাষি মেয়ে একঝুড়ি ফুল বিক্রি করছিল। মেরিয়াস বড় একগোছা ফুল কিনল।
থিওদুল ভাবল, মেরিয়াস যে মেয়েটার প্রেমে পড়েছে সে নিশ্চয় খুব সুন্দরী। মেয়েটাকে একবার দেখতে হবে আমায়।
তার পিসিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির জন্য নয়, কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই এ কথা ভাবল সে।
মেরিয়াস একবার থিওদুলের দিকে তাকালও না। দু তিনজন সুন্দরী সুসজ্জিতা মেয়ে নামল গাড়ি থেকে। সেদিকেও তাকাল না মেরিয়াস। কোনও দিকে খেয়াল নেই তার।
থিওদুল ভাবল, ও নিশ্চয় প্রেমে পড়েছে।
মেরিয়াস ভার্নল শহরের চার্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
থিওদুল ভাবল, ভালো কথা। চার্চই হল আজকাল প্রেম করার জায়গা।
সে দেখল, মেরিয়াস চার্চের ভেতরে না গিয়ে উঠোনের ঘাসে ঢাকা একটা দিকে এগিয়ে চলল। তার পর ঘাসের উপর কালো কাঠের একটা ক্রসের সামনে নতজানু হয়ে বসে হাতের ফুলের গোছাটা নামিয়ে রাখল। হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে প্রার্থনা করতে লাগল সে।
থিওদুল দেখল সেই কালো ক্রসের উপর সাদা অক্ষরে লেখা আছে কর্নেল ব্যারন পঁতমার্সি।
তা হলে ওর প্রেমিকা হল একটা কবর।
.
৮.
এক কবরের কাছেই প্যারিস থেকে বারবার আসে মেরিয়াস। আর তার মাতামহ বলে সে যাচ্ছে তার প্রেমিকার কাছে।
ব্যাপারটা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল লেফটন্যান্ট থিওদুল। একজন মৃত ব্যক্তি আর একজন মৃত কর্নেলের প্রতি তার দ্বিগুণীকৃত শ্রদ্ধার এক অনুভূতি সে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে পারবে না।
থিওদুল সেখান থেকে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে চলে গেল। সে ঠিক করল কোনও কথা সে তার পিসিকে জানাবে না চিঠিতে।
এদিকে তিন দিন পর একদিন সকালে বাড়ি ফিরল মেরিয়াস। দুটো রাত গাড়িতে যাওয়া-আসা করায় ঘুম হয়নি তার। সে সোজা তার নিজের ঘরে গিয়ে তার উপরকার কোট আর জামার উপর যে ফিতেটা ব্যবহার করত সেটা খুলে স্নান করতে চলে গেল।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদও সেদিন খুব সকালেই উঠেছিলেন। তিনি মেরিয়াসের আসার শব্দ পেয়ে সোজা তার ঘরে চলে যান। ভাবলেন, তিনি তাকে আলিঙ্গন করে কিছু কথা বার করে নেবেন। কিন্তু মেরিয়াসের ঘরে গিয়ে তিনি দেখলেন মেরিয়াস আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। দেখলেন বিছানার উপর তার কোট আর ফিতেটা নামানো রয়েছে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, তবু ভালো।
সেই কোট আর ফিতেটা নিয়ে সোজা বসার ঘরে চলে গেলেন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ। যেখানে তাঁর মেয়ে সূচিশিল্পের কাজ করছিল। তিনি মেয়েকে বললেন, জয় আমাদের হবেই। এবার আমরা রহস্য ভেদ করবই। ওর সব চতুরালি ধরে ফেলব। মেয়েটার ছবি আছে এই ফিতেটার সঙ্গে।
ফিতেটার সঙ্গে মেডেলের মতো দেখতে ছবি রাখার একটা খাপ ছিল। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, এর মধ্যে নিশ্চয় কোনও মেয়ের ছবি আছে। ছেলের রুচিটা খুব খারাপ হয়ে গেছে।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ বললেন, খোল বাবা। খুলে দেখ কী আছে।
খাপটা খুলে দেখা গেল তার মধ্যে একটা ভাজকরা কাগজ রয়েছে। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, সেই পুরনো কাহিনী, নিশ্চয় এটা একটা প্রেমপত্র।
কিন্তু কাগজটা খুলে দেখা গেল কর্নেল পঁতমার্সির লেখা একটি চিঠি, যাতে সে তার ছেলেকে তার শেষ কথা জানায়।
চিঠিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে কোনও মৃত লোকের পাশে থাকাকালে কোনও মানুষ যেমন এক হিমশীতল অনুভূতির দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ওদের অবস্থাও তেমনি হল। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বলে উঠলেন, এটা হচ্ছে সেই ডাকাতটার হাতের লেখা।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ সেই কাগজটা আবার ভাঁজ করে প্যাকেটটার মধ্যে রেখে দিল। এমন সময় মেরিয়াসের কোটের পকেট থেকে কতকগুলি ছাপা কার্ড পড়ে গেল। ওরা পড়ে দেখল, তাতে লেখা আছে, লে ব্যারন মেরিয়াস পঁতমার্সি।
বৃদ্ধ গিলেনৰ্মাদ ঘণ্টা বাজিয়ে নিকোলেত্তেকে ডাকলেন। সে এলে বললেন, এইগুলো রেখে দিয়ে এস।
অবশেষে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ বলল, চমঙ্কার।
মেরিয়াস স্নান সেরে ঘরে এসে ঢুকতেই মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বিদ্রুপাত্মক কণ্ঠে বললেন, বেশ বেশ। তা হলে তুমি হচ্ছ একজন ব্যারন। আমি কি জানতে পারি এর মানে কী?
মেরিয়াস কিছুটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে বলল, এর মানে এই যে আমি আমার পিতার পুত্র।
