কারও কাছে তার এই ঘৃণা প্রকাশ করেনি সে। সে শুধু কথা কম বলত, বাড়িতে কম থাকত। খাবার সময়ও বিশেষ কোনও কথা বলত না। তার মাসি একদিন যখন এ বিষয়ে প্রশ্ন করে তখন সে পড়া আর পরীক্ষার কথা বলে এড়িয়ে যায়।
তার মাতামহ সেই একই কথা বলে, ছেলেটা প্রেমে পড়েছে। তার উপসর্গ আমি বুঝতে পারছি।
তার মাসি বলত, কিন্তু কোথায় যায় ও?
এই সময় একদিন তার বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য মঁতফারমেলে গিয়ে থেনার্দিয়েরের খোঁজ করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে হোটেলটি উঠে গেছে। হোটেল তুলে দিয়ে থেনার্দিয়ের কোথায় গেছে তা কেউ বলতে পারল না। যাই হোক, সেখানে খোঁজখবর নিতে চার দিন কেটে গেল মেরিয়াসের।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ সেই এক কথা বলতে লাগলেন, ছেলেটা এখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
তাঁদের ধারণা মেরিয়াস তার বুকের মাঝে এমন একটা কথা লুকিয়ে রেখেছে, যে কথা সে কারও কাছে প্রকাশ করতে পারছে না।
.
৭.
একজন অশ্বারোহী বিভাগের অফিসারের কথা আগেই বলা হয়েছে। সে ছিল মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের ভাইপো’র ছেলে। তার নাম ছিল লেফটেন্যান্ট থিওদুল গিলেনৰ্মাদ। সে প্যারিসে খুব কমই আসত; এত কম আসত যে মেরিয়াস তাকে কখনও দেখেনি। ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদও থিওদুলকে দেখেনি ভালো করে। কিন্তু ভালো করে না দেখলে বা তার কোনও কথা না শুনলেও তাকে সে ভালোবাসত। তাকে আদর্শ পুরুষ বলে মনে করত।
একদিন সকালে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ উত্তেজিত অবস্থায় তার নিজের ঘরে চলে গেল। মেরিয়াস আবার বাইরে যাবার জন্য অনুমতি চেয়েছে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের কাছ থেকে। তার কথা শুনে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, সে আগের থেকে আরও খারাপ হয়ে গেছে।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ সিঁড়িতে যেতে যেতে বলল, এটা কিন্তু সত্যিই বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যায় ও?
সে ভেবেছিল মেরিয়াস নিশ্চয় কোনও অবৈধ প্রেমের নায়ক। সে ঠিক তার প্রেমিকার সঙ্গে কোনও গোপন সংকেতস্থানে দেখা করতে চলেছে।
যাই হোক, তার মন থেকে এই উত্তেজনাটা কমাবার জন্য সে তার সূচিশিল্পের কাজ নিয়ে বসল। সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কাজ করেছে এমন সময় হঠাৎ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল থিওদুল।
থিওদুলের মতো একজন বীরপুরুষকে তার ঘরের সামনে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল সে। বলল, থিওদুল তুমি!
হ্যাঁ, আমি এসেছি পিসি। এইদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম।
ঠিক আছে, এখানে এসে আমাকে চুম্বন কর।
থিওদুল তাই করল।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ তার লেখার টেবিলের কাছে চলে গেল। বলল, অন্তত সপ্তাখানেক থাকবে তো?
হায়, আমাকে আজ সন্ধ্যাতেই চলে যেতে হবে।
না না, তা কখনই হতে পারে না।
কোনও উপায় নেই।
আর একটু বেশি সময় থাক থিওদুল।
আমার অন্তর থাকতে চাইছে, কিন্তু কর্তব্য থাকতে দিচ্ছে না।
আমার আসলে মেবুন থেকে ফাঁলোতে যচ্ছিলাম। যাবার পথে প্যারিসে থামতে হল। তাই ভাবলাম একবার পিসির সঙ্গে দেখা করে যাই।
এতে শুধু তোমার কষ্ট হল।
এই বলে দশ লুই-এর একটা মুদ্রা তার হাতে গুঁজে দিল।
কষ্ট নয়, আনন্দও পেলাম।
থিওদুল আবার চুম্বন করল তার পিসিকে।
তার সামরিক পোশাকের চাপে তার পিসির বুকটাতে যেন আঁচড় কেটে গেল। এতে তার পিসি আনন্দ অনুভব করছিল।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ বলল, তুমি কি অশ্বারোহী সেনাদলের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলে?
থিওদুল বলল, আমি আমার চাকরের কাছে ঘোড়াটাকে দিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ঘোড়ার গাড়িতে এসেছি এবং তাতেই ফিরে যাব। একটা কথা তোমায় জিজ্ঞাসা করছি।
বল।
আমার মনে হয় মেরিয়াস পঁতমার্সিও ওই একই গাড়িতে যাবে।
কৌতূহলী হয়ে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ বলল, কী করে জানলে?
আমি আমার আসন সংরক্ষণ করতে গিয়ে দেখি তালিকায় তার নাম রয়েছে।
তার পিসি বলল, ছেলেটা বড় বদমায়েস। সে তোমার মতো ভদ্র নয়। তা হলে সে। গাড়িতেই রাত কাটাবে?
আমাকেও তাই করতে হবে।
কিন্তু তোমাকে কর্তব্যের খাতিরে এটা করতে হবে আর সে উচ্ছল জীবনযাপনের জন্য এটা করবে।
থিওদুল বলল, হা ভগবান!
এমন সময় ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদের মাথায় একটা পরিকল্পনা খেলে গেল। সে বলল, আচ্ছা ও তো তোমায় চেনে না। তাই নয় কি?
আমি ওকে চিনি, কিন্তু ও বোধ হয় আমাকে চেনে না। আমার সঙ্গে কোনওদিন কথা বলেনি।
তোমরা দু জনে একই গাড়িতে যাবে?
হ্যাঁ, সে গাড়ির উপরে বসবে আর আমি ভেতরে।
ও কোথায় যাবে?
আঁদেলিসে।
মেরিয়াস কি ওখানেই যাচ্ছে?
অবশ্য পথে মাঝখানে কোথাও নেমে পড়বে কি না জানি না। আমাকে ভালে নেমে গাড়ি পাল্টাতে হবে। ওর গন্তব্যস্থল কোথায় তা আমি ঠিক জানি না।
মেরিয়াস নামটাই বাজে। তোমার নামটা কত ভালো, থিওদুল।
থিওদুল বলল, আমার নামটা আলফ্রেড হলে ভালো হত।
যাই হোক, আমার একটা কথা শোন থিওদুল। বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
বল পিসি।
কথাটা হল এই যে, মেরিয়াস বাড়ি থেকে প্রায়ই চলে যায়।
তাই নাকি?
সে কোথাও প্রায়ই যায়। এক একবার কয়েক রাত বাড়ি ফেরে না।
তাই নাকি?
আমরা জানতে চাই কী করেছে ও, কোথায় যাচ্ছে।
অভিজ্ঞ সৈনিকের মতো শান্তভাবে বলল, উড়তে শিখেছে।
তার পর হাসতে হাসতে বলল, নিশ্চয় কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছে।
‘মেয়ে’ এই কথাটা শুনে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদের মনে হলো তার বাবাই যেন কথাগুলো বলছে। এ কথায় তার মনের বিশ্বাসটাও দৃঢ় হয়ে উঠল। সে বলল, একটা কাজ তোমায় করতে হবে। মেরিয়াস কোথায় যায় তা দেখতে হবে তোমায়। সে তোমাকে চেনে না; সুতরাং কোনও অসুবিধা হবে না। যদি কোনও মেয়েকে দেখ তা হলে তাকে ভালো করে দেখবে এবং আমাদের চিঠি দিয়ে জানাবে। আমরা এ ব্যাপারে খুব আগ্রহী।
