একদিন সন্ধ্যাবেলায় তার উপরতলার ঘরে জানালার ধারে বসে বাতির আলোয় পড়ছিল। তার সামনে জানালাটা ভোলা ছিল। পড়ছিল আর ভাবছিল সে। অনন্ত প্রসারিত অন্ধকার হতে অসংখ্য চিন্তা আকাশের অজস্র তারার মতোই ভিড় করে আসছিল তার মনে। সে তখন পড়ছিল এঁদ আর্মির বিবরণ।
যুদ্ধক্ষেত্রে লেখা সেই মহাকাব্যিক বিবরণে প্রায়ই ম্রাটের নামের সঙ্গে তার পিতার নামোল্লেখ দেখতে পায় সে। সহসা সাম্রাজ্যের সমস্ত গৌরব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যেন তার সামনে। এক ভাবের জোয়ার খেলে যায় যেন তার মধ্যে। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছিল তার পিতার আত্মা যেন তার খুব কাছে এসে পড়েছে। সে তার পিতার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে কানে। সেই সঙ্গে সে যুদ্ধের বাদ্যধ্বনি, কামানের গর্জন, সৈনিকদের পদধ্বনি এবং অশ্বের ক্ষুরের শব্দ সব শুনতে পেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে দেখল বিরাট নক্ষত্রমণ্ডল অন্ধকার অনন্ত আকাশের গভীরে কিরণ দান করছে। আর তার সামনে খোলা বই-এর মধ্যে শব্দগুলো জীবন্ত ঘটনার রূপ ধারণ করেছে। তার অন্তরটা এক অব্যক্ত অনির্দেশ্য বেদনায় মোচড় হয়ে উঠল। এক নতুন সত্যের উপলব্ধিতে আত্মহারা এবং রুদ্ধশ্বাস হয়ে উঠল সে। সহসা কেন বা কোন প্রবৃত্তির তাড়নায় সে জানে না, উঠে দাঁড়িয়ে জানালায় ঝুঁকে হাত দুটো বাইরে প্রসারিত করে অনন্ত আকাশের পানে তাকিয়ে আবেগের সঙ্গে বলে উঠল, সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন!
সেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত থেকে কর্সিকার সেই নরখাদক রাক্ষস, সেই তথাকথিত অত্যাচারী নেপোলিয়ন অদৃশ্য হয়ে গিয়ে তার জায়গায় মহান সিজারের এক দূরধিগম্য উচ্চতায় অত্যুজ্জ্বল ভাস্বরতায় দীপ্যমান হয়ে উঠল। তার পিতার কাছে নেপোলিয়ন ছিলেন এক সাধারণ সেনানায়ক, যার অধীনে সে সৈনিকের কাজ করত। কিন্তু মেরিয়াসের কাছে নেপোলিয়ন অনেক বড়। মেরিয়াসের নেপোলিয়ন হলেন সেই দুর্জয় ফরাসি শক্তির প্রতিষ্ঠাতা যে শক্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য রোমক শক্তির সমতুল্য এবং সে শক্তি ছিল সমগ্র পৃথিবীর ওপর এক অবিসংবাদিত প্রভুত্ব বিস্তারে তৎপর। নেপোলিয়ন ছিলেন এক জাতীয় পতনের বিরাট রূপকার, তিনি ছিলেন একাদশ লুই, রিচলু, চতুর্দশ লুই, বিপ্লবী কমিটির উত্তরাধিকারী। যেহেতু তিনি ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ সেইহেতু তার কিছু দোষ, কিছু দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, কিছু অপরাধও হয়তো করেছিলেন; তথাপি তিনি তাঁর পতনের মাঝেও ছিলেন রাজকীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, ত্রুটি-বিচ্যুতির কালিমার মাঝেও মহত্ত্বে ভাস্বর এবং অপরাধের মাঝেও দুর্দমনীয়ভাবে শক্তিমান। তিনি ছিলেন এমনই এক ভাগ্যবিধাতা যিনি সব জাতিকে একটি জাতির প্রভুত্বকে মেনে নিতে বাধ্য করেন। তিনি ছিলেন গৌরবোজ্জ্বল ফ্রান্সের মূর্ত প্রতীক, যিনি তরবারির দ্বারা সমগ্র ইউরোপ এবং তার প্রতিভার বিচ্ছুরিত আলো দিয়ে সমগ্র বিশ্বকে জয় করেন। মেরিয়াসের চোখে বোনাপার্ট হলেন প্রজাতন্ত্র হতে উদ্ভূত এক স্বৈরাচারী, বিপ্লবের মূর্তিমান সারাংশ। তার মনে নেপোলিয়ন একাধারে মানুষের মতো মানুষ এবং জনগণ, যিশু ছিলেন একই সঙ্গে মানব এবং দেবতা।
ধর্মান্তরিত মানুষ যেমন নতুন ধর্মগ্রহণের মত্ততায় অনেক দূর এগিয়ে যায় তেমনি মেরিয়াসও অনেক দূর এগিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল নেপোলিয়নের প্রতিভার পুজো করতে গিয়ে প্রকারান্তরে সে শক্তিরই উপাসনা করে ফেলেছে। বুঝতে পারেনি সে তার উপাস্য ব্যক্তির দুটি দিক দেবভাব ও পশুভাবের সঙ্গে জড়িত করে ফেলেছে নিজেকে। সে যেন সত্যের অনুসরণ করতে গিয়ে মিথ্যার গহ্বরে পড়ে গেছে। একদিন যে রাজতন্ত্রের পতনের অশ্রুপাত করেছিল আর পাঁচজনের সঙ্গে আজ সেই প্রজাতন্ত্রের পতনের মাঝে দেখল ফরাসি জাতির এক নতুন অভ্যুদয়। একদিন যাকে সূর্যাস্ত ভেবেছিল আজ বুঝল সেটা সূর্যোদয়।
তার মধ্যে যখন এত সব তীব্র আলোড়ন চলছিল, তখন তার বাড়ির লোক কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেনি এ বিষয়ে। সে যখন বুর্বন ও জ্যাকোবাইনদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে, রাজতন্ত্রীদের সঙ্গে সব সংস্রব ত্যাগ করে গণতন্ত্ৰীবাদী ও পুরোপুরিভাবে বিপ্লবী হয়ে ওঠে তখন একদিন কোয়ে দে অরফেভারে গিয়ে একশো কার্ড ছাপিয়ে আনে। সেই কার্ডের উপর ‘লে ব্যারন মেরিয়াস পঁতমার্সি’, এই নামটা মুদ্রিত ছিল। তার যে বিরাট পরিবর্তন এসেছিল, তার মৃত পিতার প্রতি আসক্তির ফলে যে মানসিক রূপান্তর এসেছিল তার মধ্যে এই কার্ড তারই ফলশ্রুতি। কিন্তু সে কার্ডগুলো সে নিজের পকেটের মধ্যেই রেখেছিল।
সে পিতার দিকে যতই ঝুঁকে পড়ছিল ততই সে তার মাতামহের কাছ থেকে দূরে সরে পড়ছিল। আমরা আগেই বলেছি তার প্রতি মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের মনোভাব ক্রমশই কঠোর হয়ে উঠেছিল। চিন্তাশীল এক যুবক ও চপলমতি এক বৃদ্ধের মধ্যে ফারাকটা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। মেরিয়াস আর মাতামহ যেন একটি সেতুর উপর দাঁড়িয়েছিল দু জনে। সেতুটা হঠাৎ ভেঙে যেতেই দু জনে নদীর দু পারে চলে যায়। অনতিক্রম্য হয় ওঠে দু জনের ব্যবধান। তার মাতামহের প্রতি মেরিয়াসের রাগের কারণ হল এই যে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ পিতাকে পুত্রের কাছ থেকে এবং পুত্রকে পিতার কাছ থেকে নির্মমভাবে ছিনিয়ে নিয়ে পৃথক করে রেখেছিলেন। পিতার প্রতি নবজাগ্রত শ্রদ্ধাবশত সে বৃদ্ধ মাতামহকে ঘৃণা করতে শুরু করে।
