অবসর সময়ে মেরিয়াস যখন এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকত বেশ কিছুদিন ধরে তখন তার মাতামহ ও মাসির সঙ্গে প্রয়ে দেখাই হত না। সে শুধু খাবার সময় একবার করে বাড়িতে আসত। কিন্তু অন্য সময় তাকে দেখাই যেত না।
তার মাসি এতে দুঃখ পেত। কিন্তু মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বলতেন, মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার এই হল সময়। আমি বেশ বলতে পারি এই জন্যই ও আমাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। বড় রকমের এক প্রেমে পড়েছে নিশ্চয়।
এ সত্যিই এক প্রেম।
মেরিয়াস তখন তার বাবাকে জীবনে প্রথম ভালোবাসতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে তার আজন্মলালিত ভাবধারারও পরিবর্তন শুরু হল।
বর্তমান কালের ইতিহাস পড়ে যে ভাব তার মনে জাগল তা হল এক চরম বিস্ময়ের ভাব।
এতদিন পর্যন্ত প্রজাতন্ত্র আর সাম্রাজ্যতন্ত্রের নাম শুনলে আঁতকে উঠত ভয়ে। ও দুটো নাম যেন আস্ত দুটো কুলক্ষণ। প্রজাতন্ত্র মানেই সন্ধ্যার গিলোটিন আর সম্রাট বা সাম্রাজ্য মানেই রাত্রির তরবারি। কিন্তু যখন এ দুটোর ইতিহাস ভালোভাবে পড়ে দেখল তখন সে এক বিরাট বিস্ময়ের সঙ্গে বুঝতে পারল একদিন যাকে সে এক অশুভ রাত্রির নিপাট নিচ্ছিদ্র অন্ধকার বলে জেনে এসেছে, সে রাত্রির অন্ধকারেও অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্র আছে।
যেমন মিরাবো ভার্গনিয়াদ, সেন্ট জাস্ট, রোবোসপিয়ার, ক্যামিলে, দাঁতন এবং নেপোলিয়নের মতো সূর্যের উদয়। এইসব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতায় নিজেকে ম্লান মনে করে পিছিয়ে আসে সে। কিন্তু বিস্ময়ের ঘোরটা কাটলে তার বুদ্ধিবৃত্তিকে সংহত করে এবং মন থেকে ঘৃণার ভাবটাকে অপসারিত করে ঘটনাগুলো সে যদি গভীরভাবে তলিয়ে দেখে, এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আগের থেকে একটু কম ভয় করে তা হলে দেখতে পারে সব ঘটনাগুলো দুটি প্রধান ভুলে পরিণত হয়। প্রজাতন্ত্র হল জনগণকে প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের প্রতীক এবং সাম্রাজ্য হল সমগ্র ইউরোপের ওপর আরোপিত ফরাসি ভাবধারা, আদর্শ ও জাতীয় প্রভুত্বের প্রতীক। বিপ্লব থেকে বেরিয়ে আসে জনগণের এক উজ্জ্বল মূর্তি আর সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসে ফরাসি জাতীয় গৌরব।
এই উদ্ঘাটিত মন কিভাবে ধীরে ধীরে উন্নত হয় তা আমরা দেখাবার চেষ্টা করছি। উন্নতি কখনও রাতারাতি হয় না। মেরিয়াস দেখল, এতদিন সে যেমন তার বাবাকে বুঝতে পারেনি, তেমনি সে তার দেশকেও বুঝতে পারেনি। সে কাউকে চিনতে পারেনি, সে যেন ইচ্ছা করে চোখ বন্ধ করে বসেছিল। এখন তার চোখ খুলে গেছে এবং এখন সে তার দেশের গুণগান করছে এবং ভক্তিভরে তার বাবাকে বরণ করে নিচ্ছে।
আজ সে এই ভেবে দুঃখে অভিভূত হয়ে উঠল যে আজ তার মৃত বাবা ছাড়া তার মনের গভীর গোপন কথাগুলো বলার দ্বিতীয় কোনও লোক নেই। ঈশ্বর যদি দয়া করে কোনওক্রমে তার বাবাকে বাঁচিয়ে দেন তা হলে সে দারুণ আগ্রহের সঙ্গে তার কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলত, বাবা, আমি এসেছি, আমি তোমার সন্তান। তোমার চিন্তা আমার চিন্তা এক। তার বাবাও তা হলে কত স্নেহভরে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করত। ছেলের ভালোবাসা না পেয়েই এত কম বয়সে কেন মারা গেল তার বাবা? মেরিয়াস যখন প্রথম জীবনের গুরুত্ব বুঝতে পারল, যখন সে তার জীবনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য খাড়া করে তুলঁল, যখন তার চিন্তাশক্তি দানা বেঁধে উঠল এবং তার ধর্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়ে উঠল তখনি এক নিদারুণ দুঃখে তার অন্তরটা চমকে উঠতে লাগল। এক নতুন আলোয় প্লাবিত হয়ে উঠল তার সমগ্র মনোভূমি। এক নতুন সত্তা জেগে উঠতে লাগল যেন তার মধ্যে। তার পিতা এবং স্বদেশকে নতুন করে চিনতে পারার সঙ্গে সে যেন নবজন্ম লাভ করল।
যে সব বস্তু বা ব্যক্তিকে একদিন সে ঘৃণা করেছিল আজ তা যেন এক নতুন অর্থে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল তার কাছে। আজ সে ঐশ্বরিক ও মানবিক বিধানের অর্থ বুঝতে পারল এবং সে সব মহাপুরুষকে একদিন সে ঘৃণার চোখে দেখত এবং উপহাস করে উড়িয়ে দিত, তাঁদের গুরুত্ব সম্বন্ধে এক পরিষ্কার ধারণা লাভ করল।
তার বাবার সঙ্গে সঙ্গে নেপোলিয়নকেও নতুনভাবে দেখতে শুরু করল। কিন্তু তার মনের মধ্যে নেপালিয়নের এই পুনর্বাসনের কাজটা কিন্তু সহজে হয়নি।
তার শৈশব ও বাল্যের চিন্তা ১৮১৪ সালে যারা তার চারপাশে ছিল তাদের দ্বারাই গড়ে ওঠে। রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগে ফ্রান্সের প্রায় সকলেই কথায় কথায় নেপোলিয়নের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা এবং অশ্রদ্ধা প্রকাশ করত। সে যুগে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যেন ছিলেন রূপকথার এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস। অনেকে তাকে ভয় করত এবং অনেকে আবার উপহাস করত। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ভয় আর উপহাসের বস্তু। বোনাপার্টের নাম উল্লেখ করে কেউ রাগে দাঁত কড়মড় করতে পারত আবার এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেও পারত। কিন্তু সে যা-ই করুক তার ভিত্তিমূলে ছিল ঘৃণা। নেপোলিয়ন সম্বন্ধে তার মনে সঠিক ধারণা না থাকায় আর পাঁচজনের দেখাদেখি মেরিয়াসও ঘৃণা করতে থাকে তাকে।
কিন্তু সম্প্রতি দেশের সমকালীন ইতিহাস পড়ে এবং সামরিক নথিপত্র ঘেঁটে সে সঠিক জ্ঞান লাভ করল। দুর্বোধ্যতার যে কুয়াশা নেপোলিয়নকে ঢেকে রেখেছিল তার সামনে আজ সে কুয়াশা সরে যেতেই সে বেশ বুঝতে পারল নেপোলিয়নকে ভুল বুঝেছিল সে। তার চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা ক্রমশই স্পষ্টতা ও পূর্ণতা লাভ করতে লাগল। ক্রমশ অন্ধকার থেকে উজ্জ্বল আলোর রাজ্যে উঠে গেল সে।
