ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষ হবার পর একজন সার্জেন্ট আমার জীবন রক্ষা করে। তার নাম ছিল থেনার্দিয়ের। আমার মনে হয় বর্তমানে সে প্যারিসের অদূরে শেলেস বা মঁতফারমেল গাঁয়ে একটা হোটেল চালায়। আমার ছেলে যদি তাকে কখনও খুঁজে পায় তা হলে যথাশক্তি সে সেবা করবে তার।
পিতার প্রতি কর্তব্যবোধের খাতিরে নয়, মৃতের শেষ ইচ্ছার প্রতি সাধারণ মানুষের এক অন্ধ শ্রদ্ধার বশবর্তী হয়ে কাগজটা রেখে দিল মেরিয়াস।
পঁতমার্সির মৃত্যুর পর তার কোনও কিছুই আর অবশিষ্ট রইল না। তার তরবারি আর সামরিক পোশাক পুরনো জিনিস কেনাবেচার এক দোকানে কম দরে বিক্রি করে দিলেন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ।
মেরিয়াস ভার্নলে মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা ছিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হবার সঙ্গেই সঙ্গেই সে প্যারিসে ফিরে আসে। তখন সে আইন পড়ছিল। সে আবার পড়াশোনায় মন দিল। তার বাবার জীবদ্দশাতে যেমন সে তার কথা ভাবেনি তেমনি তার মৃত্যুর পরেও তার কথা কিছুই ভাবল না।
মেরিয়াস শুধু কিছুদিনের জন্য মাথার টুপির উপর একটা কালো ব্যান্ড এটে রাখল। এই হল তার পিতার প্রতি শেষ কর্তব্য।
.
৫.
মেরিয়াসের ধর্মীয় আচার-আচরণগুলো তার বাল্যকাল থেকেই গড়ে ওঠে। সে নিয়মিত সেন্ট সাপ্লিসের ছোট চাৰ্চটায় সমবেত প্রার্থনাসভায় যোগদান করতে যেত। সাধারণত সে তার মাসির পাশে বসত। কিন্তু একদিন অন্যমনস্কতার জন্য একটা থামের পাশে বসে পড়ে। থামটার গাঁয়ে একটা জায়গায় লেখা ছিল, মঁসিয়ে মেবুফ।
প্রার্থনাসভা শুরু হতে না হতেই একজন বৃদ্ধ এসে মেরিয়াসের কাছে এসে বলল, মঁসিয়ে, এটা আমার জায়গা।
মেরিয়াস সরে গেল তাড়াতাড়ি। বৃদ্ধ মেবুফ সেখানে বসল।
মেবুফ বলল, আপনার সময় নষ্ট ও বিরক্ত করার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন মঁসিয়ে। আপনি হয়তো আমাকে অভদ্র ভাববেন। অবশ্য এর কারণ আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলব।
মেরিয়াস বলল, তার দরকার হবে না।
মেবুফ বলল, হ্যাঁ, কারণ আছে। আমার সম্বন্ধে কারও মনে কোনও ভুল ধারণা থাকুক, এটা আমি চাই না। আমি আপনাকে বলব কেন আমি এই বিশেষ জায়গাটাতে বসি। বেশ কয়েক বছর আগে দু তিন মাস অন্তর এই জায়গাটাতে একজন বিষাদগ্রস্ত পিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। সে ছেলেকে এখান থেকে লুকিয়ে দেখত, কারণ পারিবারিক বিরোধের কারণে এ ছাড়া তার ছেলেকে দেখার জন্য কোনও সুযোগ ছিল না। যখন তার ছেলে চার্চের প্রার্থনাসভায় যোগদান করতে আসত ঠিক সেই সময়ে আসত সে। ছেলেটি জানত না যে তার বাবা এত কাছে আছে তার। আসলে সে তার বাবাকে চিনতই না, বাবা এই থামের আড়ালে লুকিয়ে চোখে জল নিয়ে তার ছেলের পানে তাকিয়ে থাকত। সে তার ছেলেকে গভীরভাবে ভালোবাসত। আমি সে দৃশ্য না দেখে পারতাম না। সেই থেকে এ জায়গাটা পবিত্র হয়ে আছে আমার কাছে। আমার বসার জন্য আলাদা বেঞ্চ থাকা সত্ত্বেও এই জায়গায় বসেই আমি প্রার্থনা শুনি।
আমি সেই বিষাদগ্রস্ত দুঃখী মানুষটির সঙ্গে পরে পরিচিত হই। তার শ্বশুর এবং ছেলেটির এক ধনী মাসি তাকে এই বলে সতর্ক করে দেয় যে, সে তার ছেলের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখলে বা ছেলেকে দেখতে গেলে তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে ছেলেটিকে বঞ্চিত করবে তারা। এই কারণে অর্থাৎ ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নিজে সব ব্যথা সব দুঃখ বরণ করে নিয়ে ছেলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে। রাজনীতিই হল পারিবারিক বিচ্ছেদের কারণ। অবশ্য সব লোকেরই একটা করে রাজনৈতিক মতামত থাকবে। কিন্তু তা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। একটা লোক ওয়াটারলুর যুদ্ধে যোগদান করেছে বলেই সে রাক্ষস হয়ে গেল! একজন পিতাকে তার পুত্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার এটা কখনও একটা সংগত কারণ হতে পারে না। ভদ্রলোক ছিলেন বোনাপার্টের অধীনস্থ এক কর্নেল। সম্প্রতি মারা গেছেন। তিনি ভার্নলে বাস করতেন। সেখানে আমার ভাই গির্জার প্রধানের পদে আছেন। তার কপালে তরবারির আঘাতজনিত এক ক্ষতচিহ্ন ছিল। তার নামটা আমি ভুলে গেছি। পতমেরি অথবা মতপারসি।
মেরিয়াসের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। সে বলল, তাঁর নাম হল পঁতমার্সি।
হ্যাঁ, এটাই তার নাম। তুমি কি তাকে চিনতে?
মেরিয়াস বলল, তিনিই আমার পিতা।
মেবুফ বলল, ওহ, তুমিই তা হলে তাঁর ছেলে! এখন বড় হয়ে উঠেছ। তোমার বাবা সত্যিই তোমাকে বড় ভালোবাসতেন।
সভাশেষে যাবার সময় মেবুফের হাত ধরে তার বাসা পর্যন্ত গেল মেরিয়াস। পরের দিন সে তার মাতামহের কাছে গিয়ে বলল, কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমি শিকারে যাব ভাবছি। আপনি কি তিন দিনের জন্য সেখানে যাবার অনুমতি দেবেন?
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, তিন কেন, চার দিনের জন্য যেতে পার। ভালো করে আনন্দ কর।
এরপর তাঁর বড় মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি জোর করে বলতে পারি, ও নিশ্চয় কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছে।
.
৬.
মেরিয়াস কোথায় গিয়েছিল পরে আমরা জানতে পারব। তিন দিন পরে সে প্যারিসে ফিরে এসেই সোজা চলে যায় আইন কলেজের লাইব্রেরিতে। সেখানে সে মন্ত্রিউল পত্রিকার সংখ্যাগুলো একের পর এক পড়ে যেতে থাকে।
সেখানে মন্ত্রিউল-এর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত প্রজাতন্ত্র ও সম্রাট নেপোলিয়নের আমলের ফরাসি দেশের ইতিহাস পড়তে থাকে। তাতে ছিল সেন্ট হেলেনার স্মৃতিকথা, কিছু জীবনী, সংলাপ, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা প্রভৃতি অনেক তথ্য। এঁদ আর্মি বুলেটিনের এক জায়গায় তার বাবার নাম দেখতে পেয়ে আবেগে উত্তেজিত হয়ে ওঠে সে। এই উত্তেজনাটা এক সপ্তা ধরে তার মনের মধ্যে ছিল। সে সেইসব সেনাপতির সঙ্গে একে একে দেখা করল, যাদের অধীনে তার বাবা সৈনিক হিসেবে কাজ করেছে। সে মেবুফের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলল এবং তার কাছ থেকে তার বাবার জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারল। তার ফুলবাগানের কথা, নির্জন জীবনযাপনের কথা সব জেনে নিল। অবশেষে সে তার বাবার জীবন ও চরিত্রের একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকে ফেলল। বুঝল তার বাবা ছিল এমনই একটা আশ্চর্য মানুষ যার মধ্যে ছিল সিংহ আর মেষশাবকের এক অদ্ভুত সমন্বয়।
