মেরিয়াসের দেহটা কিছুটা কেঁপে উঠল। মেরিয়াস বুঝতে পারল তার বাবার কাছে তাকে যেতেই হবে। এ কাজ তার কাছে শুধু অপ্রত্যাশিত ও বিস্ময়কর নয়, অস্বস্তিকরও বটে। এইভাবে তার বাবার সঙ্গে পুরনো বিচ্ছেদের অবসান ঘটবে এটা সে ভাবতেই পারেনি। মেরিয়াসের মনে বরাবর এই ধারণা দানা বেঁধেছিল যে তার প্রতি তার বাবার কোনও স্নেহ-মমতা নেই। তাই তার বাবার প্রতিও কোনও ভক্তি-ভালোবাসা জাগেনি তার মনে। তার বাবা যদি প্রথম থেকে তাকে দেখত তা হলে কেন তাকে অপরের কাছে। থাকতে হবে?
কথাটা শুনে বিস্ময়ে এত অভিভূত হয়ে পড়ল মেরিয়াস যে সে আর কোনও প্রশ্ন করল না মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদকে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, মনে হয় সে অসুস্থ। সে তোমাকে দেখতে চায়। আবার দু জনেই চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বললেন, তোমাকে খুব সকালে উঠতে হবে। আমি জানি কুর দে ফঁতেন যাবার একটা গাড়ি ছাড়ে সকাল ছটায় এবং সেখানে সন্ধ্যার সময় পৌঁছায়। তোমাকে সেই গাড়িটা ধরতে হবে। সে চিঠিতে লিখেছে, তোমাকে যেতেই হবে।
চিঠিটা মুচড়ে পকেটের মধ্যে রেখে দিলেন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ। মেরিয়াস ইচ্ছা করলে সেই রাতেই রওনা হয়ে পরদিন সকালে তার বাবার কাছে পৌঁছতে পারত। কারণ সেই রাতেই একটা গাড়ি ছাড়ে এবং সেটা ভার্নল শহরের পাশ দিয়ে যায়। কিন্তু সে গাড়ি সম্বন্ধে সে বা মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ কোনও কথা বলল না। কোনও খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করল না।
পরদিন সন্ধ্যার সময় ভাল শহরে পৌঁছল মেরিয়াস। গাড়ি থেকে নেমেই যাকে সামনে পেল মঁসিয়ে পঁতমার্সির বাড়িটা কোথায় তা জিজ্ঞাসা করল। তার বাবার নামের আগে কর্নেল বা ব্যারন কিছু বলল না।
বাড়িতে পৌঁছে দরজার ঘণ্টা বাজাতেই বাতি হাতে একজন মহিলা দরজা খুলে দিল।
মেরিয়াস তাকে বলল, এটা কি পঁতমার্সির বাড়ি?
কোনও কথা না বলে মহিলা মেরিয়াসের দিকে তাকাল।
মেরিয়াস আবার বলল, এখানে তিনি থাকেন?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল মহিলা।
মেরিয়াস বলল, আমি তাঁর পুত্র। আমার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি।
মহিলা বলল, আর অপেক্ষা করছেন না।
মেরিয়াস দেখল মহিলার চোখে জল।
মহিলা নীরবে একটা ঘরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখাল। মেরিয়াস সে ঘরে ঢুকে গেল। গিয়ে দেখল ঘরের মধ্যে তিনজন লোক রয়েছে। ঘরের মধ্যে একটা বাতি জ্বলছে। তিনজন লোকের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে আছে, একজন নতজানু হয়ে বসে আছে আর একজন মেঝের উপর শায়িত আছে। প্রথম দু জন হল ডাক্তার আর যাজক; তৃতীয় ব্যক্তি হল কর্নেল পঁতমার্সি।
তিন দিন আগে মস্তিষ্কের জ্বরে আক্রান্ত হয় পঁতমার্সি। রোগের গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরে সে তার ছেলেকে পাঠাবার জন্য মঁসিয়ে গিলেনর্মাদকে চিঠি লেখে। অবস্থা তার ক্রমশই খারাপের দিকে যেতে থাকে এবং আজ সন্ধ্যায় প্রলাপ বকতে বকতে হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে পড়ে। বাড়িতে যে মহিলাটি থাকত সে তাকে থামাতে বা আটকে রাখতে পারেনি। পঁতমার্সি শুধু বলছিল, আমার ছেলের আসতে দেরি হচ্ছে। আমাকে তার কাছে যেতে হবে।
যেতে গিয়ে পাশের ঘরে পড়ে যায় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ডাক্তার আর যাজককে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের দু জনেরই আসতে দেরি হয়। বাতির স্বল্প আলোয় পঁতমার্সির গালে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের একটা রেখা দেখতে পাওয়া যায়। যে চোখ থেকে সে জল গড়িয়ে পড়ে সে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। তার ছেলের আসতে দেরি হওয়ার জন্যই এ জল বেরিয়ে আসে তার চোখ থেকে। চোখ বন্ধ হলেও সে জল শুকোয়নি।
মেঝের উপর মৃত লোকটিকে জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো দেখছে মেরিয়াস। গম্ভীর বীর পুরুষের মতো মুখ, মাথায় সাদা চুল, যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত দেহ। যে মুখের ওপর ঈশ্বরদত্ত দয়ার ছাপ ফুটে আছে, সেই মুখেই বীরত্বের চিহ্নস্বরূপ এক ক্ষতের দাগ। মেরিয়াস ভাবতে লাগল, এই ব্যক্তিই তার পিতা, এবং এখন সে মৃত। তবু সে বিচলিত হল না কিছুমাত্র। অন্য যে কোনও মৃত ব্যক্তির জন্য যে দুঃখ সে অনুভব করে তার বেশি কোনও দুঃখ সে অনুভব করল না।
তথাপি শোকবিলাপের এক বেদনায় ভরে উঠল সমস্ত ঘরখানা। বাড়ির মহিলাটি ঘরের এক কোণে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। যাজক নতজানু হয়ে প্রার্থনা করছিলেন মৃতের জন্য। ডাক্তারের চোখেও জল এসেছিল। তিনি চোখ মুছছিলেন। মৃতের চোখের জল তখনও শুকোয়নি।
ঘরের উপস্থিত সকলে মেরিয়াসের দিকে তাকাল। তারা কেউ তাকে চেনে না। নিজের মধ্যে কোনও শোকানুভূতি না জাগায় লজ্জাবোধ করছিল মেরিয়াস। তার টুপি হাতে ধরা ছিল। সেটা সে মেঝের উপর ফেলে দিল। যেন মনে হল সেটা ধরে রাখার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে শোকের চাপে। পরে সে তার জন্য নিজেকেই দোষ দিতে লাগল মনে মনে। ভাবল সে যদি তার বাবাকে ভালো না বাসতে পারে তা হলে সেটা কি তার দোষ?
কর্নেল পঁতমার্সি কিছুই রেখে যেতে পারেনি। বাড়িতে যা জিনিসপত্র আছে তা বিক্রি করে শুধু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ চলবে। পঁতমার্সি একটা কাগজে কী লিখে রেখে যায় মৃত্যুর আগে। কাগজটা মেরিয়াসের হাতে দেওয়া হল। লেখাটা কর্নেল পঁতমার্সির নিজের হাতে। এটা সে তার ছেলের উদ্দেশ্যে লিখে যায়। তাতে লেখা ছিল :
আমার ছেলের জন্য। ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্রে সম্রাট আমাকে ব্যারন উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু যে উপাধি আমি দেহের রক্তের বিনিময়ে লাভ করি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র তা আমাকে দান করতে অস্বীকার করে। সে উপাধি আমার পুত্র ধারণ ও বহন করবে। আশা করি সে তার যোগ্য হয়ে উঠবে।
