১৮১৪ থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত এই ছয় বছরের মধ্যে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা সব ঘটে যায়। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়টা অদ্ভুত ধরনের। এ সময়টা একদিকে প্রাণচঞ্চলতায় ভরা, আবার অন্যদিকে মৃত্যুর মতো হিমশীতল। একদিকে অন্ধকার, ছায়াচ্ছন্ন, আবার অন্যদিকে এক নতুন প্রভাতের আলোকরশ্মির দ্বারা উদ্ভাসিত। আলো-ছায়ায় মেশানো সে এক অদ্ভুত জগৎ, যা ছিল একই সঙ্গে নবীন এবং প্রাচীন, বিপ্ন এবং হর্ষোফুলু, যৌবনসমৃদ্ধ এবং বার্ধক্যজর্জরিত। তারা রাগের সঙ্গে ফ্রান্সকে দেখত, অতীতের ফ্রান্সকে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে দেখত। সে ফ্রান্সে মার্কুই এবং অভিজাত শ্রেণির লোকেরা রাস্তায় ভূতের মতো ঘুরে বেড়ায়। যারা বিদেশ থেকে এসে রাজতন্ত্রের অবসান দেখে তারা হতাশ হয়ে চোখের জল ফেলতে তাকে। তারা দেখে পুরনো জগতের সবকিছুই যেন এক বিরাট বন্যায় সর্বগ্রাসী প্লাবনে ভেসে গেছে। এ বন্যা ভাবাদর্শের বন্যা। এই বন্যা কত তাড়াতাড়ি পুরনো সবকিছুকে ডুবিয়ে দেয়, ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার কত তাড়াতাড়ি নতুন অনেক কিছুকে সৃষ্টি করে।
ব্যারনপত্নীর বাড়িতে যারা আসত তারা এইসব কথা ভাবত। মঁসিয়ে মার্তেনভিলে ছিলেন ভলতেয়ারের থেকে রসিক এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। তারা রাজনীতি আর সাহিত্য দুটোই আলোচনা করত, যে সব লেখকের নাম আজ লোকে ভুলে গেছে তারা তখন তাদের কথা আলোচনা করত। দেশের রাজনৈতিক অবস্থার ওপরেও মন্তব্য করত। তারা বলত নেপোলিয়ন ছিলেন কর্সিকার এক নরখাদক, রাজার সেনাদলে লেফটেন্যান্ট জেনারেলের কাজ করতে করতে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে অবতরণ করে বিরাট শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন।
কিন্তু ১৮১৮ সালের মধ্যে রাজতন্ত্রবাদীরা তাদের চিন্তা ও বিশ্বাসের শুচিতা কাটিয়ে ফেলে। অনেক তাত্ত্বিক এসে ঢুকে পড়ে তাদের দলে। তারা নীতিগতভাবে রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হলেও মুখে তা স্বীকার করতে লজ্জা পেত। আবার গোঁড়া নীতিবাদীরা প্রকাশ্যে তাদের মতবাদের কথা ঘোষণা করত।
তারা বলত, রাজতন্ত্রের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এই রাজতন্ত্র আমাদের অনেক সেবা করেছে। এই রাজতন্ত্র আমাদের পুরনো প্রথা ও রাজনীতি, ধর্ম, শ্রদ্ধাভক্তি, আত্মসম্মান সবকিছুকে প্রতিষ্ঠা দান করেছে নতুন করে। রাজতন্ত্র মানুষকে আনুগত্য, বীরত্ব, ভালোবাসা, ভক্তি প্রভৃতি দান করে। রাজতন্ত্র রাজার মহত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র জাতির মহত্ত্বকে তুলে ধরে। তবে রাজতন্ত্রের একটা ভুল, তা বিপ্লবের তাৎপর্যকে বুঝতে ভুল করে। বিপ্লব নতুন যুগের যে নতুন ভাবধারা নিয়ে এক নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি করে, রাজতন্ত্র তা বুঝতে পারেনি। কিন্তু রাজতন্ত্র যেমন বিপ্লবের উত্তরাধিকারী এবং যারা এই মতবাদে বিশ্বাসী, সেই আমাদেরও আরও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত ছিল রাজতন্ত্রের প্রতি। বোঝা উচিত ছিল, যে বিপ্লব রাজতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে সে বিপ্লব তার উদারনীতিবাদের পরিচয় দিতে পারেনি। একে যদি বিপ্লবীরা উদারনীতি বলে তা হলে সেটা হবে ধ্বংসাত্মক উদারনীতিবাদ। বিপ্লবী ফ্রান্স ঐতিহাসিক ফ্রান্সকে অশ্রদ্ধা করে অর্থাৎ সে যেন তার মাকেই অশ্রদ্ধা করে। আমরা যেমন আজ তাদের পতাকার মর্ম বুঝতে পারি না, বিপ্লবীরাও ঈগলচিহ্নিত পতাকার মর্ম বুঝতে পারেনি।
এইভাবে রাজতন্ত্রবাদী তাত্ত্বিকের দল রাজতন্ত্রের সমালোচনা করত এবং একই সঙ্গে তার গুণগান করত।
ব্যারনপত্নীর বাড়িতে অভিজাত সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলাদের যে সভা বসত তার বর্ণনা প্রসঙ্গে অধুনালুপ্ত এক সমাজের ছবি তুলে ধরা হল। এই বর্ণনায় কারও প্রতি তিক্ততা বা বিদ্রূপ প্রদর্শন করা হয়নি। ফ্রান্সের এক অতীত যুগ ও সমাজের প্রতিভূ ছিল যেন অভিজাতদের সেই সভাটা। তাদের আমরা ঠিক শ্রদ্ধা করতে না পারলেও ঘৃণা করা কোনও মতেই উচিত নয়।
পঁতমার্সির ছেলে মেরিয়াস প্রথমে স্কুল থেকে তার বাল্যশিক্ষা লাভ করে। প্রথম প্রথম তার মাসি তাকে বাড়িতে পড়াত। পরে সে বড় হয়ে উঠলে তার দাদামশাই মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। এই গৃহশিক্ষকও ছিলেন চিরায়ত ভাবধারার মানুষ এবং নিজের জ্ঞানবিদ্যা সম্পর্কে আত্মাভিমান ছিল তাঁর প্রচুর। এইভাবে মেরিয়াস পঁতমার্সি। স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া পড়তে থাকে সে। পরে সে আইন পাস করে। সে-ও হয়ে ওঠে এক গোঁড়া রাজতন্ত্রী। কিন্তু তার মা-বাবার প্রতি কোনও শ্রদ্ধা বা সহানুভুতি ছিল না। চপলতা ও উন্নাসিক ভাব মোটেই ভালো লাগত না তার। সে ছিল একই সঙ্গে উদার, উচ্চমনা, অহঙ্কারী, ধর্মপ্রবণ, আবেগপ্রবণ, আপোসহীন ও একদিক দিয়ে মনুষ্যবিদ্বেষী ও অসামাজিক।
.
৪.
মেরিয়াসের পড়াশুনো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ ফবুর্গ সেন্ট জার্মেনকে বিদায় জানিয়ে তাঁর র্যু দ্য ফিলের বাড়িতে চলে আসেন। তখন তার কাছে দু জন ভূত ছিল –একজন নারী আর একজন পুরুষ ভৃত্য। নারীভৃত্যের নাম নিকোলেত্তে আর পুরুষ ভৃত্যের নাম বাস্ক।
১৮২৭ সালে মেরিয়াসের বয়স যখন ছিল সতেরো তখন একদিন সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরে দেখে দাদামশাই একটা চিঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেরিয়াস কাছে এলে তিনি তাকে বললেন, মেরিয়াস, তোমাকে কাল ভার্নলে যেতে হবে।
