.
২.
একমাত্র ব্যারনপত্নীর বাড়ি ছাড়া জগতের আর কোনও কিছুই জানে না বা চেনে না মেরিয়াস। বাইরের জগৎ ও জীবনের যা কিছু এই বাড়িটার মধ্যে দিয়েই সে দেখে। কিন্তু কেমন এক হিমশীতল বিষাদে সব সময় যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছে বাড়িটা। এখানে আনন্দের থেকে নিরানন্দ ভাবটাই বেশি, উষ্ণতার থেকে শীতলতা বেশি, আলোর থেকে অন্ধকার বেশি।
মেরিয়াস এ বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের সব হাসি, মনের সব খুশি মিলিয়ে যায়।
পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে সে-ও বদলে যায়। সে বাড়িতে যত সব বর্ষীয়ান অভিজাত পুরুষ আর বর্ষীয়সী মহিলাদের দেখত আর তাদের যত সব বাতিকগ্রস্ত আচরণের পরিচয় পেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত মেরিয়াস। যে সব বর্ষীয়সী মহিলা ব্যারনপত্নীর বাড়িতে আসত তারা হল মাদাম নো, নেভি অব ক্যাম্বিস। তারা যে ঘরে আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসত সে ঘরটা এক সবুজ বাতির আলোর দ্বারা আলোকিত থাকত। উপস্থিত পুরুষ ও মহিলাদের মাথাভরা সাদা চুল, ঘরের মিটমিটে আলো, বিগত যুগের পোশাক, তাদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং দুর্বোধ্য কথাবার্তা এক অদ্ভুত ভাব জাগাত মেরিয়াসের মনে। তার মনে হত এরা যেন মহিলা নয়, প্রাচীন যুগের পিতামহী এবং ডাইনি। মনে হত তারা জীবন্ত মানুষ নয়, মানুষের প্রেমূর্তি।
কিন্তু এইসব প্রেমূর্তির মাঝে কিছুসংখ্যক যাজক ও সামন্তকে দেখা যেত। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কুই দ্য সাসেনে, বেরির ডিউকপত্নীর সেক্রেটারি, ভিকোঁতে দ্য ভ্যালেরয় যিনি চার্লস আঁতোনের ছদ্মনামে কিছু ছন্দোবদ্ধ প্রশস্তিমূলক কবিতা প্রকাশিত করেন, প্রিন্স দ্য বোফ্রেমত যার চুলগুলো সাদা হয়ে উঠলেও শক্তিতে যুবক এবং যার সুন্দরী স্ত্রী লাল মখমলের পোশাক পরে আসত, মার্কুই দ্য কোরিওলিস, কোঁত দ্য আমেন্দ্রে আর ছিলেন পোর্ত দ্য গি।
মঁসিয়ে পোর্ত দ্য গিকে সবচেয়ে বেশি বয়সের বলে মনে হত। তিনি শুধু ১৭৯৩ সালের স্মৃতিকথা বলতে ভালোবাসতেন। ওই বছর তিনি বিপ্লবীদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার অভিযোগে ধরা পড়েন এবং তিনি কারারুদ্ধ হন। সেখানে গিয়ে দেখেন মিরেপয়ের অশীতিপর বৃদ্ধ বিশপকেও ধরে এনে আটক রাখা হয়েছে। সেটা হল তুলঁ’র কারাগার। তাঁদের সেখানে কাজ ছিল ফাঁসির মঞ্চে সারাদিন গিলোটিনে যাদের মাথা কাটা যেত তাদের কাটা দেহ ও মুণ্ডগুলো সন্ধ্যার পর সরিয়ে এক জায়গায় ফেলে দেওয়া। তারা পিঠে করে মৃতদেহগুলো বয়ে নিয়ে যেত। তাদের লাল জামাগুলোতে চাপ চাপ রক্ত লেগে যেত। রাত্রিতে যে জামাগুলো ভিজে যেত, সকাল হতেই সেগুলো শুকিয়ে যেত। এই ধরনের কাহিনী কথিত হত ব্যারনপত্নীর বাড়িতে।
যাজকদের মধ্যে প্রথমে নাম করতে হয় আব্বে হানসার। এছাড়া ছিলেন পোপের লোক মাননীয় মাচি এবং দু জন কার্ডিনাল মঁসিয়ে দ্য লা লুজার্নে আর ক্লারমত ডনারে। কার্ডিনাল লুজার্নে পরে লেখক হিসেবে নাম করেছিলেন এবং লে কনজারভেতিউর-এ নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন। মঁসিয়ে ক্লারমত তুলুদের আর্কবিশপ ছিলেন, কিন্তু প্যারিসে নিয়মিত বেড়াতে আসতেন। তিনি লাল মোজা পরতেন এবং বিলিয়ার্ড খেলায় খুব ঝোঁক ছিল তার। তাকে ব্যারনপত্নীর বাড়িতে প্রথম নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেনলিসের বিশপ মঁসিয়ে দ্য রোকেনর যাঁর চেহারাটা খুব লম্বা ছিল এবং যিনি একাডেমি ফ্রাসোয়ার সদস্য হিসেবে প্রচুর খাটতেন। এইসব যাজক চার্চের লোক হলেও আসলে ছিলেন কেতাদুরস্ত সভাসদ এবং তাদের উপস্থিতি ব্যারনপত্নীর বাড়ির আবহাওয়াটাকে একটা আভিজাত্য দান করত। এছাড়া ফ্রান্সের পাঁচজন পিয়ার বা লর্ড ছিলেন। তথাপি সে যুগে বিপ্লবের প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় সামন্তদের এই সভায় একজন মধ্যবিত্ত সমাজের লোক উপস্থিত থাকতেন। তিনি মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ।
ব্যারনপত্নীর বাড়িতে যারা আসত তারা ছিলেন প্যারিস সমাজের শ্বেত প্রতিক্রিয়াশীলদের সার অংশ। তবে সেকালের রাজতন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত নামকরা লোকদের যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা হত। যেমন শ্যাতোব্রিয়াদ ব্যারনপত্নীর বাড়িতে ঢুকলে সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখত। তা সত্ত্বেও যে সব রাজতন্ত্রী প্রজাতন্ত্রকে মেনে নেন তাঁদের বাছাই করে এই সভায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কেঁতে বোগলৎ, যিনি সম্রাটের আমলে উচ্চ পদে আসীন ছিলেন।
বর্তমানে অভিজাত বাড়িগুলোর সে চেহারা আর নেই। আজকের দিনে রাজতন্ত্রীরা গণতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে।
ব্যারনপত্নীর কাছে বেশি বয়স বা কম বয়সের যে সব লোক আসত তারা সবাই মৃতবৎ। বাড়িটার মতোই নির্জীব। সেকেলে যেসব বৃদ্ধ এ বাড়িতে সভায় আসত তাদের ভুত্যগুলোও ছিল তাদের মতোই নির্জীব। তাদের দেখে মনে হত তারা যেন অনেক কাল আগে বেঁচে ছিল, এখন আর বেঁচে নেই এবং জোর করে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তাদের সম্বন্ধে শুধু একটা কথাই খাটে, তারা রক্ষণশীল। প্রভুরা যেমন প্রাণহীন পাথর দিয়ে তৈরি মনে হত, তেমনি তাদের ভত্যরা যেন ছিল খড়ের মানুষ। একজন বয়স্ক মহিলা বিদেশে বেড়াতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে এসে একটার বেশি ভৃত্য রাখতে পারত না। কিন্তু বাইরে কথায় কথায় সে বলত আমার লোকরা।
