মেজরের অর্ধেক বেতন নিয়ে ভার্নল শহরের একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয় তাকে। নেপোলিয়নের অধীনে সেনাদলে থাকার সময়েই মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের ছোট মেয়েকে বিয়ে করে সে। এই বিয়েতে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ-এর মত না থাকলেও বাধ্য হয়ে মত দেন শেষে। মত দিয়ে প্রতিবাদের সুরে বলেন, অনেক বড় বড় অভিজাত পরিবারকেও এইসব ব্যাপার সহ্য করতে হয়। স্ত্রী হিসেবে ভালোই ছিল মাদাম মার্সি। সে তার স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী ছিল। সে একটি পুত্রসন্তান রেখে অকালে মারা যায়। ছেলেটা কাছে থাকলে স্ত্রী বিয়োগজনিত নিঃসঙ্গতার মাঝেও সান্ত্বনা পেত পঁতমার্সি। কিন্তু মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তার মেয়ের ছেলের ওপর দাবি জানিয়ে তাকে কাছে রাখতে চান। বলেন, ছেলেকে এখন তাঁর কাছে না রাখলে তার কোনও সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করতে পারবে না সে। পঁতমার্সি তখন বাধ্য হয়ে ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ফুলের চাষ নিয়ে মেতে থাকে।
এরপর পঁতমার্সি রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সব কিছু পরিত্যাগ করে। রাজ্যের কোনও ষড়যন্ত্র বা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি সে। সে শুধু তার অতীতের কৃতিত্বের কথা স্মরণ করে এক নির্দোষ নিরীহ জীবনযাপন করত।
জামাই-এর সঙ্গে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তাঁর কাছে জামাই হল এক দস্যু। আর জামাই-এর কাছে তার শ্বশুর ছিল এক নির্বোধ বৃদ্ধ। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তার জামাই পঁতমার্সিকে কর্নেল বা ব্যারন বলে স্বীকার করতেন না। বরং তা নিয়ে উপহাস করতেন লোকের কাছে। তিনি জামাইকে আগেই বলে দিয়েছিলেন সে তার ছেলেকে দেখার জন্য কোনও দিন তার বাড়িতে আসতে পারবে না। যদি আসে তা হলে তার ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন সঙ্গে সঙ্গে এবং উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন। ছেলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগই রাখতে পারবে না সে। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তার নাতিকে নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলঁতে চেয়েছিলেন।
এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া হয়তো উচিত হয়নি পঁতমার্সির। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সবকিছু মেনে নেয় সে। সব দুঃখ সব অপমান নিজের মাথার উপর চাপিয়ে নেয় সে। অবশ্য মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের সম্পত্তির পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু তাঁর বড় মেয়ে তার মা’র তরফ থেকে মোটা রকমের এক সম্পত্তি পায়। সে অবিবাহিতা, সুতরাং তার মৃত্যুর পর তার সব সম্পত্তি তার বোনের ছেলেই পাবে।
ছেলেটির নাম মেরিয়াস। মেরিয়াস জানত তার মা নেই, কিন্তু বাবা জীবিত আছে। তবে শুধু কানে এই কথাটাই শুনেছে। এর বেশি কিছু জানতে পারেনি। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ যে সব জায়গায় তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান সেখানকার লোকেরা তার বাবার সম্বন্ধে যে সব উক্তি করে তাতে তার লজ্জা হয় বাবার কথা ভাবতে। তাকে দেখতে বা তার কথা জানতে আর ইচ্ছা হয় না।
এইভাবে বেড়ে ওঠে মেরিয়াস। দু-তিন মাস অন্তর একবার করে লুকিয়ে প্যারিসে যেত কর্নেল পঁতমার্সি। চোরের মতো লুকিয়ে নিজের ছেলেকে দেখতে যেত সে। সেন্ট আপ্রিসের চার্চে তার মাসির সঙ্গে যখন প্রার্থনাসভায় যেত মেরিয়াস তখন পঁতমার্সি চার্চের একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে থাকত ছেলেটাকে একবার শুধু চোখের দেখা দেখার জন্য। ম্যাদয়জেল গিলেনৰ্মাদ তাকে দেখে ফেলবে এই ভয়ে কাঁপত সে। যে জীবনে কত যুদ্ধ জয় করেছে, কত আঘাত কত আক্রমণের সামনে বুক পেতে দিয়েছে, সে আজ সামান্য এক নারীর ভয়ে ভীত।
এই অবস্থাতে ভার্নল শহরের ছোট গির্জার কুরে বা প্রধান যাজক আব্বে মেবুফে’র সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পঁতমার্সির।
বন্ধুত্ব হওয়ার আগে মেবুফই প্রথম দেখেন পঁতমার্সিকে। সেন্ট সাপ্লিস চার্চের একজন কর্মচারী ছিল মেবুফে’র ভাই। সেই সূত্রে মাঝে মাঝে সেই চার্চে যেতেন মেবুফ। সেখানে তিনি একাধিকবার লক্ষ করেন চার্চের একটি থামের আড়াল থেকে একটি লোক কপালে এক ক্ষতচিহ্ন ও চোখে অশ্রুধারা নিয়ে একটি ছেলেকে লুকিয়ে দেখছে। মেবুফে’র ভাইও ব্যাপারটা লক্ষ করে আশ্চর্য হয়ে যায়। বলিষ্ঠ চেহারার একজন পুরুষ কেন মেয়েদের মতো চোখের জল ফেলছে, তা সে বুঝতে পারে না।
একদিন সেন্ট সাপ্লিস চার্চের সেই কর্মচারী ভার্নলে তার ভাই-এর কাছে বেড়াতে গিয়ে সেন নদীর পুল থেকে কর্নেল পঁতমার্সিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পেরে যায়। সে তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কর্নেল পঁতমার্সির বাড়িতে চলে যায়। পঁতমার্সি প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। পরে সে তার জীবনের সব কথা খুলে বলে তাদের কাছে। তখন মেবুফরা জানতে পারেন কিভাবে পঁতমার্সি শুধু তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য জীবনের সব সুখ ত্যাগ করেছে। এই কারণেই কুরে মেকুফ কর্নেলকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে থাকে সেদিন থেকে এবং মার্সিও সে শ্রদ্ধার প্রতিদান দিত। এইভাবে দুটি সৎ লোক অর্থাৎ একজন বয়োপ্রবীণ যাজক এবং একজন বয়োপ্রবীণ সৈনিক এক বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। দু জনে দু জনকে গভীরভাবে বুঝতে পারে। একজন এই মর্ত্যভূমিতে দেশের সেবা করেছে, আর একজন স্বর্গে দেশের সেবা করে, অর্থাৎ দেশের জন্য স্বর্গলোকে প্রার্থনা জানায়। সুতরাং কোনও পার্থক্য নেই দু জনের মধ্যে।
শুধু সারা বছরের মধ্যে ছয় দিন মেরিয়াসকে তার বাবার কাছে দুটো চিঠি লেখার অনুমতি দেওয়া হত। একটা হল নববর্ষের দিন আর একটা হল সেন্ট জর্জের জন্মোৎসবের দিন। তার মাসি যা বলে দিত চিঠিতে তাই লিখত মেরিয়াস। সে চিঠির উত্তরে তার স্নেহ-ভালোবাসা জানিয়ে অনেক বড় চিঠি লিখত পঁতমার্সি। কিন্তু সে চিঠি তার ছেলের হাতে পৌঁছত না। সে চিঠি দুমড়ে-মুচড়ে তাঁর পকেটের মধ্যে ভরে রেখে দিতেন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ।
