ফুলগাছগুলোতে জল দিয়ে গোড়া খুঁড়ে সারাদিন পরিশ্রম করে গাঁদা, ডালিয়া প্রভৃতি অনেক ফুলের চাষ করত সে বাগানে। চীন, আমেরিকা থেকে আনা অনেক দুষ্প্রাপ্য গাছের চারা বসাত বাগানে। সে ছিল কল্পনাপ্রবণ। গ্রীষ্মকালে সকাল হতেই সে বাগানে গিয়ে আগাছা পরিষ্কার করা, মাটি খোঁড়া, গাছে জল দেওয়া, পাতা বা ডাল ছাঁটা প্রভৃতি নানারকমের কাজ করত। রং-বেরঙের ফুলের মাঝখানে বসে এক প্রশান্ত বিষাদ মুখ নিয়ে নীরবে কাজ করে যেত সে। কখনও কখনও পুরো একটা ঘণ্টা বসে বসে কী ভাবত। স্তব্ধ হয়ে পাখির গান শুনত অথবা সকালের রোদের ছটা পেয়ে যে শিশির মুক্তোবিন্দুর মতো হয়ে উঠেছে সেই শিশিরবিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকত। সে মদের থেকে দুধ বেশি পান করত। বাড়িতে যে মেয়েটি থাকত সে প্রায়ই বকত লোকটিকে। মেয়েটি তাকে শিশুর মতো জ্ঞান করত।
লোকটি এমনই লাজুক প্রকৃতির ছিল যে লোকে তাকে অসামাজিক মনে করত। সে বাড়ি আর বাগানের বাইরে কোথাও যেত না। একমাত্র যেসব গরিব তার বাড়িতে সাহায্যের জন্য আসত বা উঁকিঝুঁকি মারত তারা ছাড়া আর কোনও মানুষের মুখ দেখতে পেত না সে। আর একজনকে সে মাঝে মাঝে দেখতে পেত তিনি হলেন স্থানীয় কুরে বা যাজক আব্বে মেথুব। তবে শহরের কোনও লোক বা বিদেশি কোনও পথিক যদি তার বাগানের ফুল দেখতে চাইত তা হলে সে হাসিমুখে তার বাগানটা ঘুরিয়ে দেখাত তাকে। এই লোককেই বলা হত ‘ব্রিগ্রান্ড অফ দি লয়ের অর্থাৎ লয়ের নদীর দস্যু।
সে যুগের সামরিক ইতিহাসের কোনও ছাত্র যদি এঁদ আর্মি বা বিশাল সৈন্যদলের বুলেটিন বা ফ্রান্সের যুদ্ধের কোনও স্মৃতিকথা পড়ে তা হলে সে দেখতে পাবে জর্জ “তমার্সির নামটা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়েছে তাতে। পঁতমার্সি যুবক বয়সে সেঁতোনে সেনাদলের অধীনে এক পদাতিক হিসেবে যোগদান করে। রাজতন্ত্রের যুগে এক একটি প্রদেশের নাম অনুসারেই এক একটি সেনাদলের নামকরণ হয়। স্পায়ার, ওয়ার্মম, তাখেম প্রভৃতি বহু জায়গায় যুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে পঁতমার্সি এবং যে বারোজন বীর সৈনিককে হেসির রাজার এক বিরাট সৈন্যদলের আক্রমণের প্রতিরোধ করতে হয়েছিল, পঁতমার্সি ছিল তাদের অন্যতম। যুদ্ধটা হয়েছিল আন্দারনাম দুর্গপ্রাকারের বাইরে। শত্রুপক্ষের জোর গোলাবর্ষণের সামনে দাঁড়াতে না পেরে পিছিয়ে আসে তারা। মত প্যালিসেলে ক্লেবারের অধীনে যুদ্ধ করার সময় তার হাতের এক জায়গা ভেঙে যায়। তার পর সে সহকারী লেফটেন্যান্ট হয়। অস্টারলিৎস-এর যুদ্ধে যুদ্ধ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে পঁতমার্সি। রাশিয়ার রাজকীয় বাহিনী যখন ফরাসি চতুর্থ বাহিনীকে আক্রমণ করে, পঁতমার্সি তখন একদল সৈন্য নিয়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করে রুশবাহিনীকে তাড়িয়ে দেয়। সম্রাট তাকে একটা ক্রস উপহার দেন। পঁতমার্সি ওয়ামদারকে খাবুওয়ার মেনামকে আলেকজেন্দ্রিয়া এবং ম্যাককে উলথে বন্দি হতে দেখে সে এঁদ আর্মির অধীনে অষ্টম বাহিনীতে থাকার সময় মর্তিমারের অধীনে যুদ্ধ করে হামবুর্গ দখল করে। তার পর সে ৫৫তম ফ্ল্যান্ডার্স বাহিনীতে স্থানান্তরিত হয়। এলয়-এর যুদ্ধে বীর ক্যাপ্টেন লুই হুগো যখন তিন ঘণ্টা ধরে শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করে রাখে তখন যে তিনজন জীবিত অবস্থায় সেই আক্রমণের কবল থেকে বেরিয়ে আসে পঁতমার্সি ছিল তাদের অন্যতম। সে ফ্রেডন্যান্ডে যুদ্ধ করে। যুদ্ধের জন্য যেসব জায়গায় তাকে যেতে হয় সেগুলো হল মস্কো, লুৎজেন, বিরোসিনা, ড্রেসডেন, লিপজিগ, গেলেনহসেনের গিরিবর্ত্ত। এ ছাড়াও তাকে যেতে হয় মার্নের নদীর তীরে এক লাওর পরিখায়। আর্নে লে দাকের যুদ্ধে সে যখন একজন ক্যাপ্টেন ছিল তখন দশজন কশাককে তরবারির আঘাতে হত্যা করে তার ঊর্ধ্বতন অফিসারকে উদ্ধার করে। সেই যুদ্ধে সে আহত হয় এবং বোমার সাতাশটা টুকরো তার বাঁ হাতের উপর অংশ থেকে বার করা হয়। প্যারিসের পতনের আট দিন আগে সে অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগদান করে। সে একই সঙ্গে তরবারি ও বন্দুক চালনায় পারদর্শী ছিল। আবার সেনাদল পরিচালনাতেও সে ছিল সিদ্ধহস্ত। নেপোলিয়নের সঙ্গে স্পে এলবা যায় এবং ওয়াটারলু যুদ্ধে সে এক সেনাদল পরিচালনা করে। শত্রুপক্ষের নুলেবার্গ বাহিনীর পতাকা দখল করে সেটাতে রক্ত মাখিয়ে নেপোলিয়নের পায়ের তলায় ফেলে দেয়। তার মুখে তখন তরবারির আঘাত লাগে এবং ক্ষত হয় তাতে। নেপোলিয়ন তখন তাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, এখন থেকে তুমি হলে কর্নেল, ব্যারন, লিজিয়ন দ্য অনারের একজন অফিসার।
পঁতমার্সি তখন সম্রাটকে উত্তর করে, আমি আমার বিধবা পত্নীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি মহারাজ। তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সে ওহেনের পথে পড়ে যায়। এই হচ্ছে পঁতমার্সির জীবনকাহিনী। পঁতমার্সিই হল লয়েরের দস্যু।
এর পরের কাহিনীরও কিছুটা শুনেছি আমরা। থেনার্দিয়ের তাকে ওহেনের সেই পথ থেকে তোলে। পরে সে সেরে ওঠে। আবার সে ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেয়। রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তাকে অর্ধেক বেতন দিয়ে ভাল শহরে প্রহরাধীন অবস্থায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাজা অষ্টাদশ লুই সবকিছু বিবেচনা করে তার কর্নেল এবং লিজিয়ন দ্য অনারের পদ অস্বীকার করেন। তার পদোন্নতি মেনে নিলেন না তিনি। তবু পঁতমার্সি কর্নেল ব্যারন পঁতমার্সি’ এই নামে স্বাক্ষর করত এবং তার নীল রঙের জ্যাকেটের উপর লিজিয়ন দ্য অনারের ব্যাজটা না লাগিয়ে কোথাও বেরোত না। এজন্য তাকে নোটিশ দেওয়া হয় সরকারের তরফ থেকে। তবু সে আট দিন এই ব্যাজ পরে ঘুরে বেড়ায়, অথচ কেউ তার ওপর হস্তক্ষেপ করতে সাহস করেনি। এই সময় মেজর পঁতমার্সি’ নামে তার কাছে সরকারি চিঠি এলে সে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। স্যার হাডসন লো একসময় জেনারেল নেপোলিয়ন’ এই নামে চিঠি দিলে নেপোলিয়নও এইভাবে ফেরত পাঠান পত্রপ্রেরকের কাছে।
