১৮১৭ সালে বা তার কাছাকাছি একসময় সপ্তায় দু’দিন বিকালে তিনি তার এক নিকট প্রতিবেশী ব্যারনের বাড়িতে যেতেন। এই ব্যারনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীই তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী হয়। এই ব্যারন ষোড়শ লুই-এর অধীনে বার্লিনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পরে তিনি নির্বাসিত অবস্থায় সর্বস্বান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে কোনও বিষয়সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারেননি তিনি। শুধু তাঁর জীবনের স্মৃতিকথা সম্বলিত এক বিরাট পাণ্ডুলিপি রেখে যান, যা ছিল দশ খণ্ডে সমাপ্ত। জীবদ্দশায় সম্মোহনবিদ্যায় তাঁর প্রচুর আগ্রহ ছিল এবং এ নিয়ে অনেক গবেষণা করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর পক্ষে তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি, কারণ সে আর্থিক সামর্থ্য তার ছিল না। কোনও সন্তান না থাকায় অল্প যা কিছু আয় ছিল তাতে কোনও রকমে একা জীবনধারণ করতেন তিনি। অভিজাত সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে একা একা থাকতেন তিনি। শুধু সপ্তাহ দুদিন বিকালে তাঁর কিছু বন্ধু তাঁর নির্জন বাড়িতে আসত। যারা আসত তারা সবাই ছিল রাজতন্ত্রবাদী। তারা সবাই চা খেয়ে সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করত। সনদ, বোনাপাটপন্থীদের অবস্থা, অষ্টাদশ লুই-এর জ্যাকবিনবাদ, অযোগ্য লোকদের হাতে ‘কর্ডন মোর’ ভার দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হত।
তারা অনেক সময় কবিতা আবৃত্তি করত। তারা ফরাসি বিপ্লবকে হীনভাবে দেখত এবং বিপ্লবের ওপর যে গান রচিত হয় তার একটা বিকৃত প্রতিরূপ খাড়া করে সেটা গাইত।
১৮১৬ সালে ফুয়ালদেকে নিয়ে যে ঘটনা ঘটে তাতে তারা বাস্তিদে এবং জনগণের পক্ষে যোগদান করে, কারণ ফুয়াদে ছিল বোনাপার্টপন্থী। উদার নীতিবাদীদের তারা ‘ভাই ও বোন’ বলত এবং এর থেকে আমাদের আর কিছু হতে পারে না।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ ছাড়া আর একজন ব্যারনপত্নীর বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতেন। তার সম্বন্ধে লোকে বলাবলি করত, জান উঁকি কে? উনি হচ্ছেন ‘নেকলেস’ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ল্যামোথি। তখনকার দিনের বুর্জোয়ারা মানুষ হিসেবে অবাঞ্ছিত হলেও আত্মীয়তা সম্পর্কের খাতিরে বড় বড় লোকের বাড়িতে যাতায়াত করত। মাদাম পারের ভাই মেরিগান প্রিন্স দ্য সুবিদের বাড়িতে যেতেন এবং গিলন দু ব্যারি মার্শাল দ্য রিচর বাড়িতে পেতেন সাদর অভ্যর্থনা।
১৮১৫ সালে কোত দ্য ল্যামোথি ভ্যালয়ের বয়স ছিল পঁচাত্তর। তার চেহারাটা হিমশীতল হলেও তার আচরণ ছিল নিখুঁত। তাঁর কোটের বোতামগুলো ঠিকমতো আঁটা থাকত। তাছাড়া তাঁর ভ্যালয় নামটার জন্যও তিনি খাতির পেতেন বেশি।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের জোরে খাতির পেতেন। তাঁর আচরণে কোনও আনন্দ ও চঞ্চলতার ভাব না থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা শ্রদ্ধাজনক ভাব ফুটে ওঠে তাঁর চেহারার মধ্যে। তাছাড়া তাঁর মন্তব্যগুলোর একটা গুরুত্ব ছিল। অষ্টাদশ লুইকে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার পর প্রুশিয়ার রাজা তার সঙ্গে দেখা করতে এলে তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ এ ব্যাপারে সমর্থন করে মন্তব্য করেন, ফ্রান্সের রাজা অন্য দেশের রাজার প্রতি এই ধরনের ব্যবহার করে ঠিকই করেছেন। যে দেশেরই রাজা হোক ফ্রান্সের রাজার কাছে তিনি এক সাধারণ ব্যক্তি।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ ব্যারনপত্নীর বাড়িতে যখনি যেতেন তখনি তিনি তাঁর বড় মেয়েকে সঙ্গে করে যেতেন। বড় মেয়ের বয়স তখন ছিল চল্লিশ। কিন্তু দেখে মনে হত পঞ্চাশ। তাঁদের সঙ্গে সাত বছরের একটি ছেলেও থাকত। ছেলেটির চোখ-মুখ বেশ উজ্জ্বল এবং সুন্দর ছিল। ছেলেটি ব্যারনপত্নীর বাড়ির বৈঠকখানায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলে বলাবলি করত, ‘আহা বেচারি, মা নেই, বাবা দেখে না।’ এই ছেলেটি হল মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের ছোট মেয়ের ছেলে। তার বাবা একজন সামরিক অফিসার ছিল। ১৮১৫ সালে প্যারিসের পতনের সঙ্গে সঙ্গে লয়ের নদীর ওপারে কোথায় চলে যায়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই ছেলের কোনও খোঁজখবর রাখত না। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তাঁর এই জামাই সম্বন্ধে মন্তব্য করতেন, আমাদের বংশের কলঙ্ক।
.
২.
সেকালে ভার্নল শহর দিয়ে হেঁটে গিয়ে সেন নদীর উপর পাথরের পুলটা পার হয়েই পুলের উপর থেকে মাথা টুপি, হাতে বোনা পায়জামা আর জ্যাকেট পরা প্রায় পঞ্চাশ বছরের একটি লোককে দেখতে পেত। লোকটির গায়ের রংটা রোদে কালো হয়ে গিয়েছিল। তার মাথার চুল ছিল একেবারে সাদা। আর কপালে উপর একটা ক্ষতের দাগ ছিল, যে দাগটা তার গাল পর্যন্ত নেমে এসেছিল। নদীর ধারে পাঁচিল-ঘেরা একটা বাগানে কয়েক খণ্ড জমিতে সে একটা কোদাল হাতে নিয়ে সারাদিন কাজ করত। বাগানটার সামনের দিকে ছিল নদী আর পেছনের দিকে ছিল একটা বাড়ি। বাগানটা ছিল নানারকম ফুলে ভর্তি।
পায়জামা আর জ্যাকেটপরা ওই লোকটিই ছিল ওই বাগান আর বাগান সংলগ্ন বাড়িটার বাসিন্দা। এই বাগানই ছিল তার একমাত্র সম্পত্তি। সে একা একাই থাকত। সেখানে। তার আত্মীয়-বন্ধু বলতে কেউ ছিল না। শুধু ঘর-সংসারের কাজ করার জন্য এক মধ্যবয়সী মহিলা থাকত বাড়িতে।
মহিলাটিকে দেখে যুবতী না বৃদ্ধা, সুন্দরী না কুৎসিত তা কেউ বুঝতে পারত না। তবে বাগানটার ফুলের ঐশ্বর্যের জন্য শহরের সবাই প্রশংসা করত।
