১৮১৪ সালে যখন রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় তখন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের বয়স হয়েছিল চুয়াত্তর এবং তিনি ফবুর্গ সেন্ট জার্মেনে থাকতেন। আশি বছর বয়সে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে আসেন মেরিয়াসের বাড়িতে। তখন তিনি সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন একেবারে।
মেরিয়াসের বাড়িতে আসার পর কতকগুলি নিয়ম করেন গিলেনৰ্মাদ। তিনি সন্ধ্যার আগে বাড়িতে কোনও অতিথি বা আগন্তুকের সঙ্গে দেখা করতেন না। তিনি ঠিক বিকাল পাঁচটার সময় নৈশভোজন শেষ করতেন। তার পর লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। যে কোনও কাজই থাক, দিনের বেলায় কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেত না। এটাই ছিল সেই শতকের ভদ্রলোকদের রীতি এবং এই রীতিটাই তিনি মেনে চলতেন। তিনি বলতেন, যারা শ্রেষ্ঠ এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি তারা দিনের বেলায় ঘরে আবদ্ধ করে রাখেন নিজেদের। রাত্রিকালে আকাশে নক্ষত্রের আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধির আলোয় দেদীপ্যমান হয়ে ওঠেন তাঁরা। তিনি জনসমাজ থেকে দূরে থাকতেন। কারও সঙ্গে মেলামেশা করতেন না। রাজারও খাতির করতেন না। এটাই ছিল তাদের যুগের রীতি।
.
৮.
আমরা মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের মেয়েদের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এই দুটি মেয়ের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল দশ বছরের। যৌবনে তাদের দু জনের চেহারা ও চরিত্রের মধ্যে কোনও মিল ছিল না। ছোট মেয়ে ছিল বরাবরই খুব আনন্দোচ্ছল। তার সব দিকেই ঝোঁক ছিল –ফুল, কবিতা, গান-বাজনা সবই ভালোবাসত সে। একটি অতৃপ্ত অত্যুৎসাহী আত্মা ছোট থেকে অনন্ত আকাশে যেন উড়ে বেড়াত। বীরত্ব সম্পর্কে একটা রোমান্টিক ধারণা ছিল তার।
বড় মেয়েরও একটা দিবাস্বপ্ন ছিল। সে শুধু এক ধনী কন্ট্রাকটারকে স্বামী হিসেবে পাবার স্বপ্ন দেখত। সে হবে লক্ষপতি। অথবা তার স্বামী হবে এক বড় অফিসার। সে হবে সম্মানিত অফিসার পত্নী –কত দাসদাসী, বলনাচের আসর, কত সভা-সমিতি। দুই বোনের এইখানেই ছিল মিল।
দু জনেরই একটা করে স্বপ্ন ছিল। দু জনেরই দুটো পাখনা ছিল। কিন্তু একজনের পাখনা ছিল দেবদূতের আর অন্যজনের পাখনা ছিল রাজহাঁসের।
পৃথিবীতে কোনও উচ্চাশাই সম্পূর্ণরূপে পূরণ হয় না। আমাদের এ যুগে মর্ত্য কখনও স্বর্গ হয়ে ওঠে না। ছোট বোন তার আকাঙ্ক্ষিত পুরুষকে বিয়ে করেছিল, এবং বিয়ের কিছুকাল পরে মারা যায়। কিন্তু বড় বোন বিয়ে করেনি জীবনে।
আমাদের কাহিনীর প্রয়োজনে যখন এই মেয়েটি প্রথম আসে তখন তার বুদ্ধি না থাকলেও এক অটল দৃঢ়তার ভাব দেখায়। তার নাকটা ছিল তীক্ষ্ণ। সে বাড়ির বাইরে কোথাও যেত না। বাড়ির বাইরের কেউ তার আসল নাম জানত না। সবাই জানত, তার নাম ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ। সে তার সতীত্ব সম্বন্ধে খুব বেশি পরিমাণে সজাগ ও সতর্ক ছিল।
তার এই অস্বাভাবিক সতীত্ববোধ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়। সে পোশাকটা এমনভাবে পরত যাতে তার দেহের কোনও অংশ দেখা না যায়। সতীত্ববোধ এমনই এক আশ্চর্য দুর্গ যে দুর্গে যত কম আক্রমণের ভয় থাকে তত বেশি তা সুরক্ষিত করা হয়। এই সতী মেয়ে জীবনে শুধু একবার এক সামরিক অফিসারের চুম্বন গ্রহণ করেছিল। থিওদুল নামে এই অফিসার সম্পর্কে তার এক ভাইপো ছিল। সতীত্ব বস্তুটা অর্ধেক গুণ আর অর্ধেক দোষ।
ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদের এই সতীত্ববোধের সঙ্গে ছিল এক গোঁড়া ধর্মচেতনা। সে ছিল কনফ্রেরি দ্য লা তার্জ সম্প্রদায়ভুক্ত। কোনও ধর্মীয় উৎসব বা তিথির দিনে সে সাদা ঘোমটা দিত মাথায়। মাঝে মাঝে সে বিশেষভাবে প্রার্থনা করত। গির্জায় জেসুরের বেদির সামনে বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকত। মাঝে মাঝে তার আত্মাটা যেন মেঘেদের রাজ্য ও নীল বনরাশির মাথায় উড়ে যেত।
তার শুধু একজন বান্ধবী ছিল। তার নাম ছিল ম্যাদময়জেল ভবয়। সে-ও ছিল তারই মতো শুচিশুদ্ধ সতী কুমারী এবং ধর্মপ্রাণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ অনেক বেশি গুণশীলা হয়ে ওঠে। তার হিংসা বলে কোনও জিনিস ছিল না। এক দুর্বোধ্য বিষাদের ভারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত তার মুখখানা। বিষাদের অর্থ সে নিজেই জানত না। তার চেহারাটা দেখে মনে হত তার জীবনটা শেষ হয়ে আসছে যে জীবন শুরুই হয়নি কখনও।
বিশপ বিয়েনভেনু’র বোন যেমন তার দাদার সংসার চালাত তেমনি ম্যাদময়জেল গিলেনৰ্মাদ তার বাবার সংসারের সব কাজকর্ম দেখাশোনা করত। দু জনে দু জনকে অবলম্বন করে থাকত।
বাপ আর মেয়ে আর একজন থাকত সে সংসারে। সে হল একটি ছোট ছেলে যে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের কাছে আসত। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ সব সময় দাঁত খিঁচিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলতেন তার সঙ্গে। বলতেন, এদিকে এস স্যার।
কখনও আবার তার ছড়িটা তুলে ডাকতেন। বলতেন, এস, অপদার্থ কোথাকার! আসল কথা, ছেলেটাকে তিনি ভালোবাসতেন। ছেলেটা ছিল সম্পর্কে তাঁর নাতি।
৩.৩ কয়েকজন বিশিষ্ট লোকের বাড়িতে
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ যখন র্যু সার্ভাদোনিতে থাকতেন তখন তিনি প্রায়ই কয়েকজন বিশিষ্ট লোকের বাড়িতে যেতেন। তাঁকে অনেকে খাতির করত।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ যেতেন রাজতন্ত্রী অভিজাতদের বাড়িতে যেখানে তাঁর আত্মসম্মানে কোনও আঘাত লাগত না। তিনি বিশেষ করে যেতেন মঁসিয়ে দ্য রোনাল্ড আর মঁসিয়ে বেদি-পু-ভ্যালির কাছে। সেখানে গিয়ে রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করতেন।
