আমরা আগেই বলেছি র্যু দ্য ফিলের বাড়িটা তাঁর নিজের। তাঁর দু জন ভৃত্যের মধ্যে একজন পুরুষ আর একজন নারী। পুরুষ ভৃত্যটি যখন তাঁর বাড়িতে আসে তখন তিনি তার নতুন নতুন নাম দেন। যেমন নিয়ম, কোতয়, পিকার্দ প্রভৃতি। তার বয়স ছিল প্রায় পঞ্চান্ন। সে বেশি জোরে হাঁটতে বা চলাফেরা করতে পারত না। সে বলত, তার নাম বাস্ক। রান্না করার জন্য নারীভৃত্যটি যখন প্রথম তার বাড়িতে কাজের জন্য আসে তখন তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কত মাইনে নেবে?
মেয়েটি তখন বলে, মাসে তিরিশ ফ্রাঁ।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তখন বলেন, আমি তোমাকে পঞ্চাশ ফ্রাঁ করে দেব। কিন্তু তোমার নাম হবে নিকোলেত্তে।
.
৬.
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের দুঃখ মানেই রাগ। মনে কোনও কারণে দুঃখ পেলেই প্রচণ্ডভাবে রেগে যেতেন তিনি। তাঁর কতকগুলি কুসংস্কার ছিল এবং ইচ্ছামতো অবাধে সেগুলো মেনে চলেছেন। প্রতিটি চালচলনে তিনি যে ভাব প্রকাশ করে যেতেন তা হল চিরযুবক এক প্রেমিকের। তিনি বলতেন, এই ভাব দেখিয়ে প্রচুর নাম-যশ পাওয়া যায় এবং এর থেকে অনেক উপহারও জুটে যায় তার।
একবার একটা বড় ঝুড়িতে করে একটা জিনিস পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার বাড়িতে। ঝুড়িটা খুলে দেখা যায় একটি নবজাত শিশুপুত্র তার মধ্যে শোয়ানো আছে। এ নিয়ে হৈ-চৈ পড়ে যায় তার বাড়িতে। পরে খোঁজ-খবর করে জানা যায় মাস ছয়েক আগে তার বাড়ির যে ঝিকে তিনি বরখাস্ত করেন এই ছেলেটি তার এবং সে নাকি বলে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদই হলেন এ শিশুর জনক। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের বয়স তখন আশি। তিনি এতে দারুণ রেগে যান। রেগে গিয়ে বলেন, কুলটা মেয়েটার কী দুঃসাহস! একথা কেউ বিশ্বাস করবে?
কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি ঠাণ্ডা হয়ে আর সবাইকে বোঝাতে থাকেন, তোমরা এতে ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? তোমরা জান না তাই। নবম চার্লস–এর অবৈধ সন্তান ডিউক অ্যাঙ্গুলিমের বয়স যখন পঁচাশি তখন পনেরো বছরের একটি মেয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বোর্দোর আর্কবিশপের ভাই মার্কুই দ্য আলুয়ে তিরাশি বছর বয়সে এক পরিচারিকার গর্ভে পুত্রসন্তান উৎপাদন করেন। সেই অবৈধ সন্তান পরবর্তী জীবনে নাইট উপাধি লাভ করে এবং কাউন্সেলার হয়। এ যুগের বিশিষ্ট বিখ্যাত লোক আব্বে তারারদ ছিলেন সাতাশি বছরের এক বৃদ্ধের ঔরসজাত সন্তান। বাইবেল পড়লেই জানতে পারবে এসব ব্যাপার এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়।
এত সব বলার পর তিনি ঘোষণা করেন, অবশ্য এই শিশুটি আমার সন্তান নয়। যাই হোক, দোষটা তো তার নয় এবং তার দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। এইভাবে অবস্থার সঙ্গে মোকাবিলা করেন তিনি। কিন্তু লা ম্যাগনন নামে যে কুলটা ঝি তার এই অবৈধ সন্তানকে পাঠিয়েছিল সে আবার এক বছর পর আর একটি নবজাত শিশুপুত্রকে এইভাবে ঝুড়িতে করে পাঠিয়ে দেয় মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের বাড়িতে। এটা কিন্তু খুবই বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ তখন দুটি শিশুকেই তাদের মা লা ম্যাগননের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই সঙ্গে তিনি তাকে বলে আসেন এদের ভরণপোষণের জন্য তিনি প্রতি মাসে আট ফ্র করে পাঠিয়ে দেবেন। তবে একটা শর্তে সে যেন এ কাজ আর না করে। তিনি আরও বলেন, ছেলেদের যেন ঠিকমতো দেখাশোনা করা হয় এবং তিনি মাঝে মাঝে এসে তাদের দেখে যাবেন।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের এক ভাই ছিল। তিনি যাজক ছিলেন। অ্যাকাডেমি দ্য পয়তিয়েরে রেক্টার বা প্রধান হবার পর তিনি মারা যান ঊনআশি বছর বয়সে। তাতে মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বলেন, আমার ভাই খুবই অল্প বয়সে মারা গেছে। তাঁর এই ভাই খুবই কৃপণ প্রকৃতির লোক ছিলেন। যাজক থাকাকালে ভিক্ষা দেওয়াটা তিনি এক ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করতেন। কিন্তু যত সব অচল মুদ্রা ভিক্ষা হিসেবে দিয়ে স্বর্গে যেতে গিয়ে নরকের পথ পরিষ্কার করেন। অথচ তাদের বাবা ভালোভাবে সম্মানের সঙ্গে ভিক্ষা দিতেন। তিনি সত্যিই উদার প্রকৃতির ও পরোপকারী লোক ছিলেন। তিনি ধনী হলে তার জীবনযাত্রা সত্যিই আরও অনেক ভালো হত। তিনি সব সময় কোনও কাজের পদ্ধতির ওপর জোর দিতেন। পদ্ধতিটা যেন ভালো হয়। একবার একজন ব্যবসাদার তার সঙ্গে প্রতারণা করে এক সম্পত্তির অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে। তখন তিনি মন্তব্য করেন, এভাবে আমাকে ঠকানো তার উচিত হয়নি। পদ্ধতিটা আরও ভালো ও দ্র হওয়া উচিত। বনপথের কোনও দস্যুর মতো ওরা আমার এ সম্পত্তি কেড়ে নিল।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের দু বার বিয়ে হয়। দুটি স্ত্রীর গর্ভে দুটি কন্যাসন্তান হয়। বড় মেয়েটি বেঁচে আছে আর ছোট মেয়েটি তিরিশ বছর বয়সে মারা যায়। বড় মেয়েটি অবিবাহিত রয়ে যায়, কিন্তু ছোট মেয়েটি মৃত্যুর আগে এক সামরিক অফিসারকে বিয়ে করে মারা যায়। অফিসারটি ওয়াটারলু যুদ্ধের সময় কর্নেল হয়েছিল। গিলেনৰ্মাদ এই বিয়েটা সমর্থন করতে পারেননি। তিনি বলেন, এটা আমাদের পরিবারের পক্ষে অপমানজনক। একটিপ নস্যি নিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কথাটা বলেন তিনি। ঈশ্বরে তাঁর কোনও বিশ্বাসই ছিল না।
.
৭.
এই হল মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের জীবনযাত্রা প্রণালী। তার মাথার চুল একেবারেই ওঠেনি। সে চুল ছিল একেবারে সাদা এবং ভালোভাবে আঁচড়ানো। তিনি ছিলেন সত্যিই একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর মহত্ত্ব এবং চপলতা দুই-ই ছিল তার মধ্যে।
