তিনি নিচের তলায় একটা বড় ঘরে থাকতেন। সে ঘরের পর্দা আর কার্পেটে পল্লিপ্রকৃতির অনেক সুন্দর দৃশ্য আঁকা ছিল। তার ঘরের জানালার নিচেই বাগান ছিল। বাড়ি থেকে বাগানে যেতে হলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে হত। গিলেনৰ্মাদ যুবকের মতো তরতর করে ওঠা-নামা করতেন সে সিঁড়িতে। তাঁর মায়ের পিতামহের কাছ থেকে এই স্বভাবটা পেয়েছিলেন। তাঁর মা’র সেই পিতামহ নাকি একশো বছর বেঁচেছিলেন এবং তার দুটি স্ত্রী ছিল। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের ব্যবহারটা ছিল একজন সভাসদ আর একজন আইনজীবীর মাঝামাঝি। সভাসদ তিনি হতে পারেননি আর আইনজীবী বা উকিল হবার শখ ছিল তার। যৌবনে তিনি ছিলেন এমনই একজন যারা তাদের স্ত্রীদের দ্বারা প্রতারিত হয়, কিন্তু তাদের প্রেমিকারা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে না কোনও ভাবে। এইসব লোক প্রেমিক হিসেবে যত ভালো হয়, স্বামী হিসেবে তত ভালো হতে পারে না। মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ চিত্রশিল্পের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর শোবার ঘরে নামকরা শিল্পীদের আঁকা কিছু ছবি ছিল। এই বয়সেও তিনি নিজেকে যুবক ভাবতেন এবং পোশাক-আশাকের ধরন বদলাতেন। তিনি সব সময় কোটের পকেটের ভেতরে হাত রেখে চলতেন। তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ফরাসি বিপ্লব জনকতক কাপুরুষ লোকের পাপকর্মের ফল।
.
৩.
কোনও এক রাতে একটা নাটক দেখতে গিয়ে ভলতেয়ার, লা কামারগো আর স্যানির পাশে দু জন সুন্দরীকে গিলেনৰ্মাদ দেখতে পান। তখন তিনি তাদের দিকে না গিয়ে নাহেনরি নামে এক নাচিয়ে মেয়ের কাছে চলে যান। মেয়েটি ছিল প্রায় তার সমবয়সী এবং তার সঙ্গে তার ভালোবাসা ছিল। তিনি তখন তাকে দেখেই আপন মনে মন্তব্য করেছিলেন, এর আগে যখন তাকে দেখেছিলাম তখন তাকে কত সুন্দর দেখাচ্ছিল। তার মুখে ছিল খুশির হাসি, মনে আশার সম্পদ, চোখে ছিল মোহপ্রসারী আবেদন। তিনি যৌবনে যে ওয়েস্টকোট পরতেন তার কথা আজও ভুলতে পারেননি তিনি। তাঁর বয়স যখন কুড়ি ছিল তখন মার্কুই দ্য বুফার্স তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি রোজ খবরের কাগজ পড়তেন। তখন যারা মন্ত্রী বা দেশের শাসনকর্তা ছিল তাদের তিনি দেখতে পারতেন না। তিনি হাসতে হাসতে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে প্রায়ই বলতেন, কবিয়ের, হুমাল, কাসিমির–এরা হল কিনা মন্ত্রী? মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ কেন মন্ত্রী হলেন না? কথাটা হাস্যাস্পদ হলেও যারা নির্বোধ তারা সে কথাকে বিশ্বাস করে। পাঁচজনের সঙ্গে তিনি যখন থাকতেন তখন কারও নামে কোনও শক্ত কথা বলতে কোনও কুণ্ঠাবোধ করতেন না তিনি। এক আভিজাত্যসুলভ ঔদাসীন্যের সঙ্গে তিনি অম্লান বদনে। নোংরা গালাগালি দিয়ে যেতেন। তাদের যুগে ধনী সমাজে এই ধরনের গালাগালি চলত। সে যুগের কাব্যে যেমন আবেগাতিশয্য ও অতিশয়োক্তির প্রাধান্য দেখা যেত, গদ্যসাহিত্য ছিল তেমনি স্কুল প্রকৃতির। তাঁর প্রথম জীবনে তার গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে তার ধর্মপিতা বলতেন, তিনি ভবিষ্যতে একজন প্রতিভাশালী ব্যক্তি হবেন। তাই তাঁকে বলতেন, ভাগ্যবান।
.
৪.
তার জন্মস্থান মৌলিন শহরের কলেজে তিনি পুরস্কার লাভ করেন এবং ডিউক দ্য নিভার্নে তার গলায় লরেন্সের মালা পরিয়ে দেন। কনভেনশন বা শীর্ষ সম্মেলন, যোড়শ লুই ও নেপোলিয়নের মৃত্যু, বুর্বনদের পুনরাগমন, প্রভৃতি এত সব ঘটনার মাঝে সে কথাটা ভোলেননি গিলেনৰ্মাদ। তাঁর মতে নিভার্নে ছিলেন সেই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লোক। তিনি আরও বলতেন রাশিয়ার ক্যাথারিন পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিন হাজার রুবল দিয়ে বেস্তুসেফের কাছে গোপন সোনা কি নেবেন?
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বুর্বনদের শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং ১৭৮৯ সালকে ভয় করতেন। তিনি প্রায়ই গল্প করতেন কিভাবে শুধু তার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে তিনি বেঁচে যান। তা না হলে তাঁর মাথা কাটা যেত। যদি কোনও যুবক প্রজাতন্ত্রের গুণগান করত তার সামনে তা হলে তার মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে যেত। মাঝে মাঝে তিনি বলতেন, আমার বয়স নব্বই, আমার মনে হয় তিরানব্বই সাল আর দেখতে পাব না। আবার অন্য সময় তিনি বলতেন, তিনি একশো বছর বাঁচতে চাইছেন।
.
৫.
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বিবাহিত লোকদের প্রেম সম্বন্ধে একটা নিজস্ব তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন। তিনি বলতেন, কোনও লোক যদি তার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে ভালোবাসতে না পেরে অন্য মেয়েকে ভালোবাসে তা হলে তার মনের শান্তি বজায় রেখে অবস্থার মোকাবিলা করার জন্য একটামাত্র উপায় অবলম্বন করতে হবে। তার টাকার থলেটা তার স্ত্রীর হাতে দিয়ে দিতে হবে। তার স্ত্রীকে সব সময় ব্যস্ত রাখতে হবে হিসাবপত্রের কাজে। ব্যাংকের নোট গুনতে গুনতে তার যেন হাতে কড়া পড়ে যায়। তার স্ত্রীকে তখন চাষের কাজ দেখাশোনা, বাড়ি মেরামত, করদান, মামলাপত্র দেখা প্রভৃতি সব কাজ করতে হবে। স্ত্রী তখন এই ভেবে মনে মনে সান্ত্বনা পাবে যে তার স্বামী তাকে ভালো না বাসলেও সে ইচ্ছা করলে স্বামীর সব কিছু ধ্বংস করে দিতে পারবে, স্বামীর সব কিছু এখন তারই হাতে। গিলেনৰ্মাদও তার জীবনে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেন। তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর অব্যবস্থার জন্য তাঁর বহু ক্ষতি হয়ে যায়। সেই স্ত্রীর মৃত্যুর পর অভাব দেখা যায়। তিনি দেখেন তাঁর আয় বলতে শুধু আছে বছরে পনেরো হাজার ফ্রাঁ। তিনি যে টাকা লগ্নি করেন তার মাত্র তিনের চার অংশ অবশিষ্ট আছে। তিনি ঠিক করেন যা আছে জীবনে সব খরচ করে যাবেন তিনি। কিছুই রেখে যাবেন না। তাছাড়া কোনও সম্পত্তি রেখে গেলে তা তাঁর মৃত্যুর পর জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে।
