একমাত্র দুর্দশা ছাড়া ওই পরিবারের উল্লেখযোগ্য আর কিছুই ছিল না। এই পরিবারের কর্তা যখন এ বাড়িতে আসে তখন সে বলে তার নাম জনদ্ৰেত্তে। এই পরিবারেরই হল সেই নগ্নপদ ভবঘুরে ছেলেটা। সে যেন সেখানে গিয়েছিল শুধু দারিদ্র্য আর দুরবস্থার দ্বারা সম্ভাষিত হবার জন্য। প্রায়ান্ধকার হিমশীতল ঘরখানার মতোই তার বাবা-মা’র মুখগুলো ছিল ম্লান আর হিমশীতল। সে মুখে কোনও হাসি ছিল না।
ছেলেটা বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার বাবা-মা তাকে জিজ্ঞাসা করে, কোথা থেকে এলি?
ছেলেটা উত্তর করে, পথ থেকে। আবার ছেলেটা যখন বাড়ি থেকে রওনা হয় তখন আবার প্রশ্ন করে, কোথায় যাবি?’ ছেলেটা তখন উত্তর করে, ‘পথেই ফিরে যাচ্ছি। সব শেষে তার মা বলে, কেন এসেছিলি?’
এ কথার উত্তর দেয়নি ছেলেটা। এই ধরনের স্নেহহীন, মমতাহীন পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠে ছেলেটা। কিন্তু তার প্রতি তার বাবা-মা’র এই ঔদাসীন্য এবং নির্মমতা তাকে নতুন করে বিচলিত করতে পারেনি কিছুমাত্র। সে কারও ওপর কোনও দোষারোপ করত না
এর জন্য। সন্তানের প্রতি পিতামাতার কী রকম ব্যবহার করা উচিত সে সম্বন্ধে তার কোনও ধারণাই ছিল না।
বুলভার্দ অঞ্চলে ছেলেটাকে গ্রাম্ৰোশে বলে ডাকত।
তবে ছেলেটার মা তার মেয়েদের ভালোবাসত। তার বাবা জনত্রেত্তে যে ঘরটাতে থাকত তার পাশের ঘরেই একটা কপর্দকহীন গরিব যুবক থাকত। তার নাম ছিল মঁসিয়ে মেরিয়াস।
এখন এই মঁসিয়ে মেরিয়াস সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে।
৩.২ এমন কিছু অধিবাসী আছে
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১.
রু বুশোরাত, র্যু দ্য নরমাভি আর র্যু দ্য সেতোনে অঞ্চলে এখনও এমন কিছু অধিবাসী আছে যারা মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ নামে এক ভদ্রলোককে আজও মনে রেখেছে এবং তার কথা মনে করে আজও আনন্দ পায় তারা। এইসব অধিবাসী যখন বয়সে যুবক ছিল তখন মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন।
১৮৩১ সালে গিলেনৰ্মাদ শুধু তাঁর বার্ধক্যের খাতিরে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। তিনি ছিলেন বাতিকগ্রস্ত এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, যিনি ছিলেন প্রাচীন যুগের এক প্রতিভূ। তিনি উনিশ শতকের এক মধ্যবিত্ত হয়েও অষ্টাদশ শতকের সম্ভ্রমশালী এক বুর্জোয়ার ভাব দেখাতেন। তাঁর বয়স নব্বই-এর উপরে হলেও তিনি খাড়া হয়ে হাঁটতে পারতেন, জোরে কথা বলতেন, স্পষ্ট দেখতে পেতেন, মদপান করতেন এবং নাক ডাকিয়ে ঘুমোতেন। তার দু পাটির বত্রিশটি দাঁতই ছিল এবং পড়ার সময় ছাড়া চমশা ব্যবহার করতেন না। প্রেমিক প্রকৃতির লোক হলেও তিনি বলতেন, গত দশ বছর ধরে কোনও নারীর সঙ্গে কোনওরূপ সংস্পর্শ নেই তার। তিনি সম্পূর্ণরূপে নারীসংসর্গ ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর বার্ধক্যের জন্য নারীদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন না, একথা
বলে বলতেন, তিনি খুব গরিব বলেই দারিদ্র্যবশত তাদের খুশি করতে পারেন না। তিনি বলতেন, আমার সর্বস্ব খোয়া না গেলে… বস্তুত তার আয় বলতে ছিল পনেরো হাজার ফ্রা’র এক বার্ষিক আয় এবং তিনি আশা করতেন তাঁর আয় এক লক্ষ ফ্র হলে তিনি একজন নারীকে রাখতে পারতেন। তিনি মঁসিয়ে দ্য ভলতেয়ারের মতো উন্মার্গগামী ছিলেন না যিনি জীবন্মুত অবস্থায় ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে জীবনযাপন করতেন। তাঁর স্বাস্থ্য ভালোই ছিল। তিনি ছিলেন চঞ্চল ও চপল প্রকৃতির এবং সামান্য কারণে অযৌক্তিকভাবে রেগে যেতেন। কেউ তার কোনও কথার প্রতিবাদ করলে লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। তাঁর এক অবিবাহিতা কন্যা ছিল যার বয়স পঞ্চাশ পার হয়ে গিয়েছিল। রেগে গেলে তার মেয়ের সঙ্গে চেঁচামেচি করতেন, গালাগালি করতেন এবং তাকে চাবুক মারতেন, যেন সে সাত-আট বছরের এক বাচ্চা মেয়ে। তিনি তাঁর ভৃত্যদেরও পুরনো কায়দায় গালাগালি করতেন।
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদের অদ্ভুত কতকগুলি খেয়াল ছিল। তিনি এমন এক নাপিতের কাছে বরাবর চুলদাড়ি কামাতেন যে একবার পাগল হয়ে গিয়েছিল এবং যে তার সুন্দরী ও চপল প্রকৃতির স্ত্রীর জন্য ঈর্ষাবশত তার সঙ্গে সব সংস্রব ত্যাগ করে। সব বিষয়েই নিজের মতামত ও বিচার-বুদ্ধির ওপর উচ্চ ধারণা ছিল তার এবং নিজেকে খুবই বিচক্ষণ ভাবতেন। তিনি বলতেন, তাঁর এমন এক সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি আছে যার দ্বারা কোনও একটা মাছি তাঁকে কামড়ালে তিনি বলে দিতেন সেই মাছিটা কোন মহিলার গাঁ থেকে উড়ে এসেছে। মার্জিত প্রকৃতির লোক এই কথাটা প্রায়ই তিনি বলতেন। কিন্তু মার্জিত প্রকৃতির লোকের মতো তিনি কখনই ব্যবহার করতেন না। তাঁর মতে আমাদের সভ্যতার মধ্যে বৈচিত্রসাধন ও সভ্যতাকে পূর্ণতা দানের জন্য প্রকৃতি আমাদের স্বভাবের মধ্যে বর্বরতার উপাদান রেখে দিয়েছে। তথাকথিত সভ্য ইউরোপীয়দের মধ্যে এশিয়া-আফ্রিকার অধিবাসীদের অনেক গুণাগুণ আছে। বিড়াল হচ্ছে বাঘের এবং টিকটিকি গিরগিটি হচ্ছে কুমিরের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। রঙ্গশালার নাচিয়েরা এক একটা রং-মাখা নরখাদক। তারা মানুষ না খেলেও তাদের রক্ত সব শোষণ করে নেয়। এই হচ্ছে আমাদের জীবন। আমরা কাউকে গিলে খাই না, আমরা কামড়ে কামড়ে একটু একটু করে খাই। আমরা কাউকে হত্যা করি না, তার গা-টাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিই।
.
২.
মঁসিয়ে গিলেনৰ্মাদ মেরিয়াস অঞ্চলে র্যু দ্য ফিরে দ্য কাভেয়ারে বাস করতেন। বাড়িটা ছিল তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি। অনেক দিনের পৈতৃক পুরনো বাড়িটাকে অবশ্য নতুন করে আবার নির্মাণ করা হয় এবং আগের নম্বর পাল্টে নতুন নম্বরও দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে প্যারিসের অনেক রাস্তারও এইভাবে নম্বর পরিবর্তন করা হয়। তাঁর বাড়িটার একদিকে ছিল রাস্তা এবং আর একদিকে ছিল বাগান।
