প্রমিথিয়াসের মশাল এবং কাম্বোনের কর্কশ কণ্ঠ থেকে একই বিদ্যুৎ নির্গত হয়।
.
১২.
প্যারিসের জনগণ সম্বন্ধে কোনও কথা বলতে গেলে বলতে হয় সেখানকার পূর্ণবয়স্ক যে কোনও ব্যক্তি আসলে যেন এক একটা ভবঘুরে ছেলে। সেখানকার ভবঘুরে ছেলেদের কথা বলা মানে শহরের কথা বলা। এই কারণেই আমরা একটা চড়ুইপাখির ছদ্মবেশে একটা ঈগলকে চিহ্নিত করেছি।
প্যারিসের আসল অধিবাসীদের পাওয়া যাবে রাজপথের পেছন দিকে সেইসব গলির অন্ধকারে যেখানে মানুষ কাজ করে আর নীরবে দুঃখভোগ করে। কাজ আর কষ্টভোগই হল মানুষের জীবনের দুটো দিক। সামান্য সাধারণ মানুষের উইঢিবির মধ্যেই থাকে কত অদ্ভুত মানুষ। সিসারো এইসব মানুষদের বলতেন জনতা। বার্ক বলতেন, জনতা, গণশক্তি, জনসাধারণ… কথা সহজেই বলা যায়। কথায় কী যায়-আসে? যদি এই জনগণ খালি পায়ে হাঁটে বা তারা পড়তে শিখতে না পারে তা হলে তাতে কীই-বা যায়-আসে? তা হলে কি সেই অজুহাতে তাদের ত্যাগ করবে এবং তাদের দুর্দশাকে কি অভিশাপ বলবে? কিন্তু আলো কি কোনওদিন জনগণের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না? আলো আরও আলো… এবং কে জানে সেই আলোর প্রভাবেই একদিন অস্বচ্ছ বস্তু স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। যে কোনও বিপ্লব কি জনগণের রূপান্তর নয়? দার্শনিকরা যদি জনগণকে ঠিকমতো শিক্ষাদান করেন, যদি তারা মার্শাই গাইতে গাইতে জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে সূর্যোদয়ের দিকে এগিয়ে যান, তাদের মধ্যে প্রভূত উদ্যম আর উদ্দীপনার ধারাকে উদ্গত করাতে পারেন তা হলে এই জনগণই একদিন এক মহতী শক্তিতে পরিণত হয়ে উঠবে। তাদের নবজাগ্রত নীতিবোধ এবং গুণানুশীলনের জ্বলন্ত চুল্লি থেকে বেরিয়ে আসবে এক উজ্জ্বল অগ্নিশিখা। তা হলে তখন এই জনগণের অনাবৃত হাত-পা, ছেঁড়া ময়লা পোশাক, অজ্ঞতা, দারিদ্র এবং তাদের জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে আদর্শ পূরণের কাজে লাগানো যাবে সফলভাবে। জনগণের অন্তরের দিকে তাকালেই এই সত্য বোঝা যাবে। যে বালুকারাশির উপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাই সেই বালুকারাশি চুল্লির মধ্যে ফেলে তাকে গলিয়ে স্বচ্ছ কাঁচে পরিণত করা যেতে পারে, যে কাঁচের স্বচ্ছতার সহায়তায় গ্যালিলিও, নিউটন একদিন দূর আকাশে তাকিয়ে নক্ষত্রমণ্ডলকে নিরীক্ষণ করতেন।
.
১৩.
দ্বিতীয় খণ্ডে আমরা যে কাহিনী বর্ণনা করেছি সে কাহিনী ঘটার সাত-আট বছর পর ভুলভার্দ দ্য তেম্পল ও শ্যাতো দ্য ইয়তে এগারো-বারো বছরের এক ভবঘুরে ছেলেকে ঘঘারাফেরা করতে দেখা যায়। এই ধরনের ভবঘুরে ছেলের কথা আমরা এর আগেই বলেছি। তফাৎ শুধু এই যে, হাসির আলোয় মুখখানা তার উজ্জ্বল হয়ে থাকলেও অন্তরটা ছিল তার শূন্যতা আর অন্ধকারে ভরা। এই ছেলেটা যে পায়জামা পরত সেটা তার বাবার কাছে থেকে পায়নি সে, আবার মেয়েদের মতো যে ব্লাউজটা সে পরত সে ব্লাউজটাও তার মায়ের নয়। এইসব পোশাক লোকে তাকে দান করেছে। তবু তার বাবা-মা দু জনই আছে। কিন্তু তার বাবা তাকে কখনও ভাবতে শেখায়নি এবং তার মা তাকে কখনও ভালোবাসেনি! এইসব ছেলেদের সকরুণ অবস্থা দেখলে সত্যিই মায়া লাগে, কারণ তাদের বাবা-মা থাকলেও তারা অনাথ শিশুর মতোই অসহায়। বাড়ি থেকে পথেই সে বেশি সুখে থাকে। পথের পাথর তাদের মা’র অন্তরের থেকে বেশি কঠিন নয়।
যে ছেলেটার কথা আমরা বলছি সে ছেলেটার বয়স কম, তার মুখখানা স্নান, সদাসতর্ক, নতুন, আবার একই সঙ্গে প্রাণচঞ্চল ও অবসাদগ্রস্ত। সে যেখানে-সেখানে ছুটে বেড়ায়, খেলা করে, পথের ধারের খালে সে দাপাদাপি করে। কেউ তাকে ভবঘুরে ছেলে বললে সে হেসে ওঠে। তার কোনও চালচুলো বা নির্দিষ্ট বাসস্থান নেই। তবু সে সুখী, কারণ সে স্বাধীন। বালক যখন পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত হয় তখন তারা সমাজব্যবস্থার চক্রের সঙ্গে বিঘূর্ণিত হতে থাকে, সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তাকে। কিন্তু যতদিন তারা ছোট থাকে, তারা সব দিক দিয়ে অব্যাহতি পায়।
বাবা-মা’র দ্বারা অবহেলিত ও পরিত্যক্তপ্রায় হলেও মাসের মধ্যে দু তিনবার ছেলেটা আপন মনে বলে ওঠে, আমি মাকে দেখতে যাব।’ এই বলে ছেলেটি বুলভার্দ অঞ্চল ছেড়ে পোর্তে সেন্ট মার্তিন পার হয়ে নদীর বাঁধের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তার পর নদী পার হয়ে শ্রমিকবস্তির পাশ দিয়ে সালপেত্রিয়ের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু কোথায়? আর কোথাও নয়, ৫০-৫২ নম্বর সেই গর্বোর সেই ব্যারাক বাড়িটায় যায়। সেই সময় বাড়িটাতে কয়েকটা ঘর খালি ছিল এবং তার উপর বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে এই মর্মে একটি নোটিশ লাগানো ছিল। বাড়িটাতে তখন এমন কতকগুলি পরিবার বাস করত যারা পরস্পরকে চিনত না।
ভলজাঁ যখন সেই বাড়িতে ছিল তখন প্রধান ভাড়াটে’ নামে অভিহিত যে একটা বুড়ি বাড়িটা দেখাশোনা করত সে মারা যায়। তার জায়গায় যে বুড়িটা তার কাজ করতে থাকে সে-ও ছিল ঠিক আগেকার বুড়িটার মতো। নতুন যে বুড়িটা আসে তার নাম ছিল মাদাম বুর্গন, তার জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না।
গর্বের বাড়িটাতে তখন যে সব ভাড়াটে ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে দৈন্যদশায় থাকত একটি পরিবার। সে পরিবারের ছিল চারটি প্রাণী–বাবা, মা, আর দুটি মেয়ে। মেয়ে দুটিই বড় ছিল। কিন্তু একটি মাত্র ছোট ঘরে একসঙ্গে থাকত তারা।
