প্যারিসই হল সারা জগতের এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। জগতের দেখার মতো যত সব সভ্যতা ও বর্বরতা আছে সেইসব সভ্যতা বর্বরতার দ্বৈত উপাদানে গড়া যেন এই প্যারিস। তাই তার গিলোটিন না থাকাটাই অস্বাভাবিক হত তার পক্ষে। এথেন্স, রোম, সাইবারিস, জেরুজালেম, পন্তিন প্রভৃতি সব নগরী প্যারিসের মধ্যেই আছে। প্লেস দ্য গ্রিভে যদি মাঝে মাঝে দু’একটা ফাঁসি না হত তা হলে অবিমিশ্র অবাধ একটানা আনন্দ-উৎসব ভালো লাগবে কেন? সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আবার আইন ভালো কাজই করেছে।
.
১১.
প্যারিসে কোনও কিছুরই সীমা-পরিসীমা বলে কিছু নেই। যে পরিমাণ প্রভুত্ব সে করে এসেছে দীর্ঘকাল ধরে সে পরিমাণ প্রভুত্ব আর কোনও শহর করতে পারেনি কোনও দিন। আবার এখানকার লোকেরা বিজিতদের বিদ্রূপ করার ব্যাপারেও সিদ্ধহস্ত। আলেকজান্ডার একদিন এথেন্সের অধিবাসীদের বলেছিলেন, আমি শুধু তোমাদের সন্তুষ্ট করতে চাই। প্যারিস শুধু আইন প্রণয়ন করে না; সে নিত্য নতুন অনেক ফ্যাশানও সৃষ্টি করে। আবার শুধু ফ্যাশান নয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও জন্ম দেয় সে। প্যারিস যখন নির্বোধ হয়ে থাকে তখন সারা জগৎ নির্বোধ থাকে তার সঙ্গে। আবার প্যারিস যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং স্বীকার করে, ‘আমি কত বোকা!’ তখন সারা জগতের চোখ খুলে যায়। তখন সারা জগতের পানে তাকিয়ে হাসতে থাকে প্যারিস। কী আশ্চর্য এই শহর! তার আনন্দোচ্ছলতা বিদ্যুতের চমক; তার চঞ্চলতায় রাজার রাজদণ্ড কেপে ওঠে। তার মুখে মেঘ নেমে এলে ঝড়ের সৃষ্টি হয়। আগ্নেয়গিরির অগ্নদগারের মতো তার অট্টহাসিতে সমস্ত জগৎ কাঁপতে কাঁপতে ফেটে পড়ে। তার বিস্ফোরণ, বিক্ষোভ, তার সংকট, শিল্প সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কীর্তিসমূহ, তার কাব্য-মহাকাব্য সারা জগতে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে তার অশালীনতা ও অধর্মাচরণের কথাও সারা জগৎ জানতে পারে। সব দিক দিয়ে সে সত্যিই অপূর্ব। তার ১৪ জুলাই-এর বিক্ষুব্ধ কর্মাকর্ম সারা জগৎকে মুক্ত করে। ৪ আগস্ট এই শহরে যা ঘটে তাতে হাজার বছরের সামন্তবাদ মাত্র তিন ঘণ্টায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার যুক্তিবাদ দিয়ে বৈশ্বিক ইচ্ছার হাতকে শক্ত করে। সে নিজেকে এক মহৎ ভাবাদর্শে সমুন্নত করে সেই আদর্শের আলো দিয়ে ওয়াশিংটন, কোশিউষ্ণু, বলিভার, বায়রন আর গ্যারিবল্ডির আত্মাকে আলোকিত করে। পৃথিবীর যেখানেই নতুন যুগের প্রভাত হয়েছে, সেখানেই তার আত্মিক উপস্থিতির প্রভাব প্রত্যক্ষ করা গেছে। যেমন ১৭৭৯ সালে বোল্টনে, ১৮৪৮ সালে পেস্থে, ১৮৬১ সালে পালার্মোতে। আমেরিকায় ব্রিটিশবিরোধী উচ্ছেদবাদীদের কানে কানে স্বাধীনতার মন্ত্র প্যারিসই উচ্চারণ করে। জলের ধারে গাছের ছায়াবনে সমবেত আনকোনার দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের সে-ই প্রেরণা দান করে। প্যারিস থেকে যে স্বাধীনতার হাওয়া বয় সেই হাওয়াতেই মিসসালোদিতে বায়রনের মৃত্যু ঘটায়। প্যারিসই ছিল সেই ভিত্তিভূমি যার উপর মিরাববা দাঁড়িয়েছিলেন, আবার প্যারিসই ছিল সেই গহ্বর যার করাল গ্রাসে রোবোস্পিয়ার পড়ে যান। তার বই, নাটক, এবং রঙ্গমঞ্চ, তার বিজ্ঞান, কলাবিদ্যা, দর্শন সমগ্র মানবজাতির কর্ম ও চিন্তার মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে–পাস্কেল, রেনার, কর্নেল, দেকার্তে, রুশো, ভলতেয়ার, মলিয়ের সকল যুগের মনীষী হিসেবে স্বীকৃত হন। তার ভাষা বিশ্বমানবের ভাষা হয়ে ওঠে, যে ভাষা বিশ্বের সকল জাতির মানুষের মনে স্বাধীনতা এবং প্রগতির ভাবধারা জাগায়। ১৭৮৯ সালের পর থেকে সকল দেশের বীরপুরুষেরা প্যারিসের কবি এবং চিন্তাশীলদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। এত কিছু সত্ত্বেও প্যারিসের পথে পথে ভবঘুরে ছেলেরা খেলা করে বেড়ায়। যে প্যারিসের বিরাট প্রতিভা জগৎকে পথ দেখায় সেই প্যারিসেরই ভবঘুরে ছেলেরা পোড়া কয়লা দিয়ে থিসিয়াসের মন্দিরের দেয়ালে নানারকম মূর্তি এঁকে চলে।
এই হল প্যারিস শহর। তার চিমনির ধোয়া জগতের চিন্তা জোগায়। কিছু কাঠ, কাদা মাটি আর পাথর দিয়ে গড়া সামান্য একটা শহর হলেও তার একটা নৈতিক সত্তা আছে। প্যারিস মহান থেকে মহত্ত্বর; বিরাট সমৃদ্ধির অন্ত নেই তার। কিন্তু কেন? কারণ সে সবকিছুতে সাহস করে এগিয়ে যায়।
সাহসই হচ্ছে যে কোনও অগ্রগতির মূল ও ফলশ্রুতি। যে কোনও বড় রকমের জয়ই হল সাহসের অল্পবিস্তর পুরস্কার। ফরাসি বিপ্লবের সংগঠনের জন্য মন্টেন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণীই যথেষ্ট ছিল না। দিদেরোর প্রচারের জন্য ফরাসি বিপ্লব ঘটেনি, বোমারসাই ঘোষণা করেছিলেন বলেও তা ঘটেনি, কন্দরসেতের পরিকল্পনার জন্যও তা ঘটেনি, আরুয়েৎ পথ পরিষ্কার করেছিলেন এবং রুশো তার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেও তা ঘটেনি এই ফরাসি বিপ্লব ঘটানোর জন্য দাঁতনের দরকার ছিল।
মানবজাতিকে যদি এগিয়ে যেতে হয় তা হলে তার সামনে সাহসিকতার গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকা দরকার। সাহসিকতার কাজই ইতিহাসের পাতাকে উজ্জ্বল করে তোলে, মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে। যে কোনও সূর্যোদয় বা নতুন যুগের সূচনার পেছনেই আছে সাহসিকতা। যে কোনও কাজে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া, প্রতিকূল শক্তিকে অমান্য করা, অধ্যবসায়সহকারে কাজ করা, নিজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, ভাগ্যের সঙ্গে সংগ্রাম করা, যে কোনও বিপর্যয়ে নির্ভীক থাকা, যে কোনও অন্যায় ও অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আদর্শে অবিচল থাকা–এইসব দৃষ্টান্ত এবং প্রেরণার অগ্নিস্ফুলিঙ্গই মানুষকে মহৎ কাজে অনুপ্রাণিত করে তোলে।
