কোনও এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় রাজা লুই ফিলিপ যখন পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন তখন তিনি পথের ধারে দেখেন একটি বেঁটে-খাটো ভবঘুরে ছেলে একটা স্তম্ভের উপর এক সামন্তের মূর্তি আঁকছিল। রাজা লুই ফিলিপ তাঁর পিতার মতোই অমায়িক এবং মধুর স্বভাবের ছিলেন। তিনি ছেলেটাকে তুলে ধরে ছবিটাকে শেষ করার সুযোগ করে দেন। তার পর আঁকার কাজ হয়ে গেলে তাকে একটা মুদ্রা পুরস্কারস্বরূপ দান করেন।
ভবঘুরে ছেলেরা যে কোনও বিশৃঙ্খলা আর গোলমাল ভালোবাসে। যাজকদের তারা ঘৃণা করে। একবার ৬৯ নম্বর একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ভবঘুরে ছেলে বিদ্রুপাত্মক অঙ্গভঙ্গি করে। যখন তাকে বলা হয় এ কাজ কেন সে করল তখন সে উত্তর। করেছিল ওখানে ছোট গির্জার এক যাজক থাকে। কিন্তু ভলতেয়ারের মতো ভবঘুরে ছেলেদের ধর্মে বিশ্বাস না থাকলেও তাদের কাউকে যদি কয়ের বয়’ বা প্রার্থনার স্তোত্ৰগানের কাজ দেওয়া হত তা হলে সে কাজ সে সুষ্ঠুভাবে করত। ভবঘুরে ছেলেদের জীবনে দুটো উচ্চাভিলাষ কখনও পূরণ হয় না। তাদের একটা উচ্চাভিলাষ হল সরকারের পতন ঘটানো আর একটা উচ্চাভিলাষ হল তাদের ছেঁড়া পায়জামায় তালি লাগানো।
প্রতিটি ভবঘুরে ছেলেই প্যারিসের সব পুলিশকে চেনে। তাদের সবার নামও জানে। পুলিশদের জীবনের সব কথা তারা জানে। তাদের স্মৃতিগুলোকে ভবঘুরে ছেলেরা গেঁথে রাখে মনের মধ্যে। কোনও পুলিশ সম্বন্ধে কোনও ভবঘুরে ছেলেকে যদি কোনও কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় তা হলে সে অকুণ্ঠভাবে বলবে, ওই পুলিশটা হল একটা ভণ্ড, প্রতারক,… ওই পুলিশটা হল একটা নোংরা শুয়োর… ওই পুলিশটাকে দেখলে হাসি পায়।
.
৯.
সার্কাসের ক্লাউন ভাড় পোকেলিনের মধ্যে ভবঘুরে ছেলেদের একটা ভাব দেখা যায়। পোকোলিনের জন্ম হয় লে হ্যাঁনেতে। বোমারসাই-এর মধ্যেও এই ভাব দেখা যায়।
ভবঘুরেরা সাধারণত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, পরিহাসরসিক এবং দুর্বিনীত। তাদের দাঁতগুলো খারাপ, কারণ তারা কম খায়। তাদের চোখগুলো সুন্দর, কারণ তাদের বুদ্ধি তীক্ষ্ণ। জেহোভা যদি একবার হাতছানি দিয়ে ডাকে তা হলে তারা স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাবে। তারা হাত-পা দিয়ে লড়াই করে। তারা যে কোনও দিকে যে কোনও কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারে। তারা কখনও রাস্তার ধারে খালে খেলা করে, আবার কখনও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাদের ঔদ্ধত্য বা বিদ্রোহী ভাব বন্দুকের গুলির ভয় করে না। তারা খেলা করতে করতেই বীর হয়ে উঠতে পারে। খেলার ছলেই বীরত্ব দেখায়। থিবস্-এর ছেলেদের মতো সিংহের লেজ ধরে টানাটানি করে। জয়ঢাকের বাজনা শুনেই ‘আহা বলে চিৎকার করতে থাকে। মুহূর্ত মধ্যে তারা সাধারণ ছেলে থেকে দৈত্য-দানবে পরিণত হয়।
এককথায় তারা অসুখী বলেই আমোদ-প্রমোদের দিকে বেশি নজর দেয়।
.
১০.
প্যারিসের বর্তমান ভবঘুরে ছেলেরা রোমের অধীনস্থ গ্রিক ছেলেদের মতো। তাদের ললাটে আছে প্রাচীন জগতের ছাপ। তারা একদিকে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, আবার একদিকে এক দুরারোগ্য ব্যাধি, যে ব্যাধি অবশ্যই সারিয়ে তুলঁতে হবে। কিন্তু কেমন করে? আলোর দ্বারা। যে আলো সমগ্রতা দান করে, যে আলো মনের অন্ধকার দূর করে, মনকে আলোকিত করে।
সমস্ত ফলপ্রসূ সামাজিক প্রবৃত্তিগুলো জ্ঞান, সাহিত্য, শিক্ষা প্রভৃতি থেকে জন্মলাভ করে। শিক্ষা আর প্রকৃত জ্ঞানের আলোই পূর্ণতা দান করে। আজ হোক কাল হোক, ব্যাপক লোকশিক্ষাই পূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠা করবে সারা দেশে। আজ যারা দেশের শাসনকর্তা তাদের ঠিক করতে হবে, প্যারিসের ছেলেরা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে, না পথে পথে ঘুরে বেড়াবে। আজকের এই ভবঘুরে ছেলেরাই প্যারিসের ভবিষ্যৎ, আর প্যারিস হচ্ছে সারা দুনিয়ার ভবিষ্যৎ।
প্যারিস হচ্ছে মানবজাতির মাথার ছাদ। এই বিশাল জনবহুল শহর একাধারে প্রাচীন এবং বর্তমান জীবনযাত্রার জীবন্ত এবং শ্রেষ্ঠ প্রতীক। প্যারিসকে দেখা মানেই ইতিহাসের গতিপ্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করা। জগতে কী এমন আছে যা প্যারিসে নেই? তার মধ্যে আছে ভবিষ্যদ্বক্তা এবং রাজার সৃষ্টিকর্তা, রাজনীতিবিদ আর জাদুকর। রোম একদিন একজন অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বারবণিতাকে সিংহাসনে বসিয়েছিল আর প্যারিসে তেমনি একদিন একজন সাধারণ নিম্নমানের মেয়েকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই যদি ক্লডিয়াসের সমকক্ষ হন তা হলে মাদাম দু ব্যারি অবশ্যই মেসালিনার থেকে ভালো ছিলেন। যদিও পুটার্ক বলতেন অত্যাচারীরা বেশিদিন বাঁচে না তথাপি সুন্না আর ডোমিসিয়ানের অধীনে রোমকে অত্যাচার ভোগ করতে হয়। কিন্তু রোমের মানুষ নরকের লেথি নদীর মতো টাইবার নদীতে স্নান করেই সব অত্যাচারের কথা ভুলে যেত। কিন্তু প্যারিসের লোকরা বিদ্রোহ করতে জানে।
জগতের কোথাও ভালো-মন্দ এমন কোনও দিক নেই যা প্যারিসে নেই। এখানকার হোটেলে-রেস্তোরাঁয় যেমন প্রতীক্ষমানা বারবণিতা পাওয়া যায় তেমনি এই প্যারিসেরই কোনও হোটেলে একদিন ডেভিড দ্য অ্যাঙ্গার্স, বলজাক আর শার্লকের মতো প্রতিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা একসঙ্গে বসে থাকতেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে তার প্রাধান্য সর্বাধিক। ওর প্রতিভা বিকশিত হয়ে ওঠে তার ছত্রচ্ছায়ায়। এ শহরের একদিকে যেমন অ্যাডনিস তার দ্বাদশ চক্রবিশিষ্ট বজ্রবিদ্যুতের রথে চড়ে চলে যায়, তেমনি তার অন্য দিক দিয়ে সাইলেনাস গাধার পিঠে চেপে চলে যায়।
