তবু অন্যান্য শহরের বখাটে ছেলেদের থেকে প্যারিসের গৃহহারা বখাটে ছেলেদের একটা পার্থক্য ছিল। তারা অপরাধ এবং কুকর্ম করে বেড়ালেও তাদের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন নীতিবোধ ছিল। তারা ছেঁড়া ময়লা পোশাক পরে থাকলেও তাদের মধ্যে একটা আশ্চর্য সততা ছিল। যে কোনও জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবে তারা অংশগ্রহণ করত। সমুদ্রের জলে যেমন লবণ গলে থাকে তেমনি প্যারিসের দুর্নীতিমূলক বিষাক্ত আবহাওয়ার ভেতরেও একটা বিকৃত নীতিবোধ মিশে থাকত সব সময়।
তথাপি এই ধরনের কোনও বখাটে ছেলেকে পথে দেখলেই তাদের মধ্যে একটা ভগ্ন দুঃখী পরিবারের কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের যে সভ্যতা আজও পরিণতি লাভ করতে পারেনি, সে সভ্যতায় এই ধরনের ছিন্নভিন্ন পরিবারের ঘটনা এমন কিছু আশ্চর্য নয় যে সব পরিবার থেকে তাদের ছেলেরা ছিটকে বেরিয়ে এসে পথে আশ্রয় নেয়। এক জটিল দুর্ভাগ্য তাদের যেন প্যারিসের পথের উপর আছাড় মেরে ফেলে দেয়। রাজতন্ত্রের যুগে এইসব পরিত্যক্ত ছেলেদের সহজভাবে এক স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নেওয়া হত। মিশর থেকে আসা ভবঘুরেদের নিয়ে অনেকে বই লিখত। তাদের লেখাপড়া শেখার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। সবাই বলত অল্প লেখাপড়া শেখার থেকে না শেখা ভালো।
ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই-এর আমলে এইসব ভবঘুরে ছেলেদের নৌকোর দাঁড় টানার জন্য দরকার হত। অনুকূল বাতাসের ওপর নির্ভরশীল জাহাজগুলো যখন সমুদ্রের উপর নোঙর করে থাকত তখন সেইসব জাহাজে যাওয়া-আসা করার জন্য দাঁড়-টানা কতকগুলি নৌকোকে উপকূলের সঙ্গে জাহাজগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হত। রাস্তায় পনেরো বছরের ঊর্ধ্বে কোনও ভবঘুরে ছেলে দেখলেই তাকে নৌকার দাঁড় টানার জন্য নিয়ে যাওয়া। হত। জেলখানার কয়েদিদেরও অনেক সময় এ কাজে নিযুক্ত করা হত। নাবিক দাস।
কিন্তু রাজা পঞ্চদশ লুই-এর আমলে পুলিশ এইসব ছেলেদের পথে দেখলেই ধরে নিয়ে যেত। তার কারণ জানা যায়নি। তবে অনেক পরিবারের পিতামাতারা এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য চাপ দিত। কোনও ছেলের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পথে আশ্রয় নেওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।
.
৭.
প্যারিসের ভবঘুরে ছেলেদের দলে সবাই যোগদান করতে পারে না। তাদের আবার শ্রেণিবিভাগ আছে। ফরাসি ভাষায় তাদের গামি বলত।
এই ভবঘুরে ছেলেদের মধ্যে কয়েকজন আবার এক একটা কাজের জন্য তাদের দলের ছেলেদের শ্রদ্ধা পায়। একবার একটা ভবঘুরে ছেলে নোতার দ্যাম গির্জার উপর একজনকে পড়ে যেতে দেখে। তাদের মধ্যে আবার একজন বীর একটা সেবা প্রতিষ্ঠানের পেছনের দিকে কতকগুলি পাথরের প্রতিমূর্তি থেকে অনেকটা সিসে নিয়ে যায় চুরি করে। আর একজন একবার একটা ঘোড়ার গাড়িকে উল্টে যেতে দেখে। আর একজন একসময় এক সৈনিককে একটা লোকের চোখে ঘুষি মারতে দেখে। যে গির্জার। উপর থেকে একটা লোককে পড়তে দেখে সে নিজের মনে বলতে থাকে, আমার কী দুর্ভাগ্য যে আমি পাঁচতলা থেকে একটা লোককে পড়তে দেখি।
কারও স্ত্রী যদি অসুখে মৃতপ্রায় হয়ে ওঠে তা হলে গায়ের চাষিরা তাকে বলত, অসুখ হয়েছে তো ডাক্তার ডাকার দরকার কী মঁসিয়ে? গরিবরা নিজেদের অসুখে নিজেরাই ডাক্তার। একদিন এক ভবঘুরে ছেলে একটা ফাঁসির আসামিকে বধ্যভূমিতে যাবার পথে একজন যাজকের সঙ্গে কথা বলতে দেখে যাজকের উদ্দেশে মন্তব্য করেছিল, নোংরা লোকটা যেন এক বিমানচালকের সঙ্গে কথা বলছে।
এইসব ছেলেরা গিলোটিন দেখেও নানারকম অপ্রিয় মন্তব্য করে থাকে। শুধু পথে পথে বেড়ায় না, কখনও তারা কোনও পাঁচিলে বা বাড়ির ছাদে ওঠে পাইপ বেয়ে। কখনও গাছে চড়ে। গাছ এবং চিমনির মাথাগুলো তাদের কাছে জাহাজের নাবিকদের কাছে যেমন মাস্তুল। কখনও কখনও আবার বধ্যভূমিতে গিয়ে ফাঁসির কাঠ ধরে ঝোলে।
এক একসময় তাদের কলাকৌশল দেখে তাদের প্রশংসা না করে পারা যায় না। একবার জুভা নামে একজন দণ্ডিত আসামিকে সাহসের সঙ্গে গিলোটিনে ফাঁসি বরণ করতে দেখে একটা ভবঘুরে ছেলে বলে, ওকে দেখে হিংসা হচ্ছে। কারণ গিলোটিনে যারা ফাঁসি যায় তাদের কথা সবাই মনে রাখে যুগ যুগ ধরে।
তাদের মধ্যে কেউ কোনও দুর্ঘটনায় পড়লে অন্য সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে তাকে। তারা বলে, ওর এমন কেটে গেছে যে হাড় পর্যন্ত বেরিয়ে গেছে। যে যত আহত হয় সে তত বেশি শ্রদ্ধা পায়। কারও স্বাস্থ্য বলিষ্ঠ হলে সে ঘুষি পাকিয়ে বড়াই। করে বলে, আমি খুব শক্তিমান। তাদের মধ্যে কেউ যদি নেটা হয় অর্থাৎ বাঁ হাতে সব কাজ করে অথবা কেউ যদি টেরা হয় তা হলেও সে বেশি শ্রদ্ধা পায় আর পাঁচজনের কাছ থেকে। সবাই তাকে ঈর্ষা করে।
.
৮.
গ্রীষ্মকালে তারা ব্যাঙের মতো হয়ে যায়। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা কয়লাবোঝাই জাহাজ অথবা ধোবানীদের নৌকো থেকে সেন নদীর জলে ঝাঁপ দেয়। এমনি করে নির্লজ্জভাবে তারা তাদের শালীনতাবোধ বিসর্জন দিয়ে পুলিশ আইন ভঙ্গ করে। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরে না। অনেক সময় তাদের এই কাজের ফলে এক নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় রাজপথে। অনেকে তাদের তাড়া করে।
কখনও কখনও দেখা যায় কোনও কোনও ভবঘুরে ছেলে লিখতে-পড়তে পারে। কেউ কেউ আবার ছবি আঁকতে পারে। একজন অন্যজনকে শেখায়। ১৮১৫ সাল থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যে ভবঘুরে ছেলেরা তুর্কিদের ডাক নকল করে এবং ১৮৪৫ সালের মধ্যে তারা ছবি আঁকতে শেখে।
