প্যারিসের রাস্তার যত সব বখাটে ছেলেরা সবাই যেন ছোটখাটো এক একটা রাবায়েত। তারা অল্পতেই বিস্মিত হয়, কিন্তু সে বিস্ময় রেখাপাত করে না তাদের মনে। তারা কুসংস্কারকে ঘৃণা করে, যে কোনও আতিশয্য বা অতিশয়োক্তিতে তাদের কোনও উৎসাহ নেই, কোনও অতিপ্রাকৃত বা রহস্যময় কোনও বস্তু বা ঘটনাতে তাদের বিশ্বাস নেই। মহাকাব্যসুলভ কোনও ভাবসমুন্নতিকে তারা উপহাস করে উড়িয়ে দেয়। কাব্য বা মহাকাব্য যে একেবারে মানে না তা নয়। কিন্তু কাব্যের রস সম্বন্ধে তাদের বোধ থাকলেও তাদের অসম্মানজনক উক্তির দ্বারা যে কোনও কাব্যরসকে বিকৃত করে দেয় তারা। কোনও দৈত্যদানবের অভিনয় দেখে তারা মন্তব্য করে, সার্কাসের একটা ভড়।
.
৪.
প্যারিস শহরে একই সঙ্গে কোনও পথচারী ভদ্রলোক আর রাস্তার বখাটে ছেলে দেখা যায় না। একই সঙ্গে সম্ভ্রমশীল ভদ্রতা আর নগ্ন বিশৃঙ্খলা কোনও শহরে দেখা যায় না। পাশাপাশি। ভদ্র পথচারী যেমন রাজতন্ত্রের ধারক ও বাহক, তেমনি ভবঘুরে বখাটে ছেলেগুলো অরাজকতার প্রতীক।
প্যারিস শহরের এইসব রাস্তার ছেলেরা রাজপথের আনাচ-কানাচে আর অলিগলিতে জন্মায় আর বেড়ে ওঠে। সমাজজীবনের যত সব কঠোর বাস্তবতা আর দুঃখকষ্টের মধ্যে তারা মানুষ হয়। তাকে দেখে মনে হয় সে কিছু জানে না বা বোঝে না। কিন্তু আসলে তা নয়। সে যেমন হাসতে পারে তেমনি আবার আরও অনেক কিছু করতে পারে। যারা অন্যায়, অবিচার, স্বৈরাচার প্রভৃতির প্রতীক তাদের বোঝা উচিত ওই সব ছেলেরা বেড়ে উঠছে, তারা এই সবকিছু দেখছে।
সমাজের যে কদর্য মাটি থেকে এইসব পথসন্তানের জন্ম সেই মাটি থেকেই আদিমতম মানবসন্তান আদমেরও জন্ম। নির্মম নিয়তি তাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। তারা ক্ষুদ্রকায় আর নিরহঙ্কার, অমার্জিত, অসভ্য; কিন্তু পরিণত বয়সে কী হবে আর দেশের ভাগ্যবিধাতাদের সৃষ্টি করে, সেই আত্মা তাদের জীবনটাকে কিভাবে গড়বে? কুমোরের চাকার মতো সৃষ্টির সেই নিষ্ঠুর চাকাটা কোন পথে ঘোরাবে?
.
৫.
রাস্তার ওই সব বখাটে বেয়ো বাউণ্ডুলে ছেলেরা জনবহুল শহরের পথঘাট যেমন ভালোবাসে তেমনি ভালোবাসে নির্জনতা। তারা একাধারে ফামকাসের মতো নগরপ্রেমিক, আবার ক্লাকাসের মতো পল্লিপ্রেমিক।
প্যারিস শহরের প্রান্তে মফস্বল অঞ্চলে কেউ যদি দার্শনিকের মতো ঘুরে বেড়ায় তা হলে একই সঙ্গে গ্রাম আর নগরের শোভা দেখে বিমোহিত হয়ে যাবে সে। এই মফস্বল অঞ্চল আপাত দৃষ্টিতে দেখতে কুৎসিত হলেও তার একটা নিজস্ব শোভা আছে। সেখানে দেখা যাবে লম্বা লম্বা গাছগুলোর জায়গায় কিভাবে সেখানে গড়ে উঠেছে বড় বড় বাড়ি। পথের দু ধারে সবুজ ঘাসের উপর নির্মিত হয়েছে শানবাঁধানো ফুটপাত, চষা জমিগুলোর উপর গড়ে উঠেছে কত সব বড় বড় রাজপথ আর দোকানঘর। এইসব দেখে শুনে চিন্তাশীল মানুষরা বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে ভাবতে থাকে অনেক কিছু। গ্রাম্য প্রকৃতির এই রূপান্তর দেখে তারা বিষণ্ণ না হয়ে পারে না।
এই কাহিনীর লেখকও একদিন এইসব অঞ্চলে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন।
আমাদের মতো যারা প্যারিস শহরের উপকণ্ঠে মফস্বল অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত নির্জন পরিবেশে ঘুরে বেড়িয়েছে, তারা নিশ্চয় কোনও পরিত্যক্ত জনহীন জায়গায় ছেঁড়া ময়লা পোশাকপরা নোংরা একদল ছেলেকে জটলা পাকিয়ে থাকতে দেখেছে। তারা হল যত সব গরিব ঘরের পালিয়ে আসা ছেলে। যেসব নোংরা জায়গায় কেউ থাকে না সেইসব জায়গাই তাদের বাসস্থান। তারা চিরদিনের ভবঘুরে। তারা কোনও বিধিনিষেধের ধার ধারে না কখনও, মুখে তাদের যত সব নোংরা গান লেগেই আছে। তারা কোনওদিন স্নান করে না, নোংরা গা-হাত পরিষ্কার করে না। শুধু ঝোপে-ঝাড়ে বনফুল তুলে বেড়ায়। এখানে-সেখানে মার্বেলের গুলি খেলে। একটা পয়সা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, ঝগড়া করে। তারা সমাজের অবজ্ঞাত অবহেলিত, তবু তারা সুখী। প্যারিস শহরের উপান্তবাসী এইসব গরিব হতভাগ্য ছেলেদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে একই সঙ্গে মন আনন্দে উফুল্ল হয় এবং দুঃখে হৃদয় বিদীর্ণ হয়।
মাঝে মাঝে ওই সব ছেলেদের দলের মধ্যে দু চারটে মেয়েকেও দেখা যায়। এইসব মেয়েরা হয়তো ওই সব ছেলেদেরই বোন। ওই সব মেয়েদের মধ্যে দু একটা বেশ বড় মেয়েও আছে। তাদের চেহারাগুলো রোগা, রোদেপোড়া তামাটে রঙ, মাথায় ঘাস বা লতাপাতার টুপি, খালি পা। প্রায়ই দেখা যায় তারা ঘাসে ঢাকা বনপথে দাঁড়িয়ে চেরিফল খাচ্ছে। সন্ধের সময় তাদের হাসির শব্দ শোনা যায়। দুপুরের রোদে বা রাত্রির অন্ধকারে যখনি তারা কোনও পথিকের চোখে পড়ে তখনি তাদের কথা না ভেবে পারে না সে। পথিক। সে পথিকের মনে অনেকদিন বেঁচে থাকে তারা।
ওই সব ছেলেমেয়েদের কাছে প্যারিস শহরই হল সারা জগতের কেন্দ্রস্থল। এই শহরের চারপাশই হল সে জগতের পরিধি। মাছ যেমন জল ছেড়ে কোথাও যায় না। তেমনি তারা এই প্যারিস শহর ছেড়ে কোথাও যায় না। তাদের মতে এই শহরের সীমানার বাইরে আর কোনও জগতের অস্তিত্ব নেই।
.
৬.
এই কাহিনী যখন লেখা হয় তখন প্যারিসে ভবঘুরে ছেলেদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তখন প্রতিবছর ২৬০ জন করে নিরাশ্রয় ছেলেকে ধরা হত। যে সব নতুন বাড়ি নির্মাণ হত সেইসব জায়গায় অথবা কোনও পুলের তলায় তারা থাকত। যে কোনও অপরাধ ও কুকর্ম এদের থেকেই শুরু হয়।
