একবার সমস্ত সমাজ যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করে, ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করে দূরে ঠেলে দেয় তখন ঈশ্বরের বাড়িস্বরূপ একটি কারাগারই স্থান দেয় তাকে। আবার উন্মুক্ত হয়েছে তার জন্য। প্রথম কারাগারে যদি সে তখন প্রবেশ না করত তা হলে সে একের পর এক করে অপরাধমূলক কাজ করে যেত। আবার এখন যদি এ কারাগারে সে প্রবেশ না করত তা হলে আরও অনেক দুঃককষ্ট ভোগ করে যেতে হত তাকে।
এই সব ভাবতে গিয়ে তার সমস্ত অন্তর এক অপরিসীম কৃতজ্ঞতা আর এক মধুর ঈশ্বরপ্রেমে বিগলিত হয়ে উঠত।
এইভাবে বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল এবং শৈশব পার হয়ে বাল্যজীবনে প্রবেশ করল কসেত্তে।
৩.১ প্যারিসের রাস্তায়
তৃতীয় খণ্ড – প্রথম পরিচ্ছেদ
প্যারিসের রাস্তায় একটা দুষ্টু ছেলেকে প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। সব সময়ই তাকে প্রাণচঞ্চল দেখায়। তার মধ্যে আছে জ্বলন্ত চুল্লির উত্তাপ আর নতুন প্রভাতের আলোর উজ্জ্বলতা।
ছোট্ট এক সুখী মানুষ। রোজ তার খাওয়া হয় না। কিন্তু রোজ সন্ধ্যায় সে খেলতে যায়। তার গায়ে জামা নেই, পায়ে জুতো নেই, মাথার উপর ছাদ বা কোনও আচ্ছাদন। নেই। মাছির মতো সে যেন শুধু উড়ে বেড়ায়। তার বয়স হবে সাত থেকে তেরো’র মধ্যে। সব সময় দল বেঁধে থাকার চেষ্টা করে, পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, ফাঁকা জায়গায় শোয়, তার বাবার একজোড়া পুরনো পায়জামা পরে। সেই ঢিলে পায়জামাটা তার গোড়ালি পর্যন্ত নেমে আসে। তার মাথার টুপিটাও অন্য একটা বুড়ো লোকের কাছ থেকে পাওয়া এবং সেটা কানের উপর ঝুলে পড়ে। সে প্রায়ই খুব হইচই করে বেড়ায়, চারদিকে চোখ চেয়ে তাকায়, সব জায়গায় যায়, প্রচুর সময় নষ্ট করে বাজে কাজে, কাফেগুলোর আনাচ-কানাচে ঘুরঘুর করে, শহরের প্রতিটি চোরকে চেনে এবং বাজে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে, নোংরা গান গায়। তবু তার মনের ভেতরে খারাপ কিছু নেই। তার অন্তরের মধ্যে আছে এক সরল নির্দোষিতার মুক্তো। মুক্তো কখনও জলে-কাদায় গলে যায় না। মানুষ যতদিন শিশু থাকে, ঈশ্বর তাকে নির্দোষ নিষ্পাপ রাখেন।
প্যারিস শহরটাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে, কে এই খুদে মানুষটা, কে এই বখাটে ছেলেটা? তা হলে শহরটা উত্তর দেবে, ও হচ্ছে আমার ছেলে।
.
২.
এই দুষ্টু বখাটে ছেলেটা হল এক দানবীর গর্ভে জাত এক ক্ষুদ্রকায় বামন।
ছেলেটার কপালে মাঝে মাঝে এক-আধটা জামা জোটে। কিন্তু সে জামার মোট সংখ্যা একটাই। কখনও বা সে হয়তো একজোড়া বুট জুতো পেয়ে যায়, কিন্তু সে জুতোর তলায় চামড়া থাকে না। তার হয়তো একটা বাসা আছে। সে বাড়ির দিকে তেমন মন নেই তার। সে বাড়ির দরজার উপর তার মা তার পথপানে চেয়ে বসে থাকে। বলেই সে মাঝে মাঝে বাড়ি যায়। কিন্তু পথটাই সে বেশি পছন্দ করে, কারণ সেখানেই সে বেশি স্বাধীনতা পায়। তার কতকগুলি নিজস্ব খেলাধুলা আছে। বুর্জোয়াদের ঘৃণাই তার একমাত্র শত্রু। তার কতকগুলি নিজস্ব কাজ আছে। সে পরের জন্য গাড়ি ভাড়া করে দেয়। সে বৃষ্টিতে কাদার মধ্য দিয়ে হেঁটে যায়। জনসাধারণের সুবিধার জন্য সে সরকার ঘোষিত আইন-কানুনগুলো ঘোষণা করে। ফুটপাথের উপর গজিয়ে ওঠা আগাছাগুলো তুলে ফেলে পথ পরিষ্কার করে। বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা লোহার টুকরোগুলো কুড়িয়ে এনে বিক্রি করে যে পয়সা পায় সেটাই তার একমাত্র আয়।
প্যারিসের বিভিন্ন জায়গায় পোকামাকড় ধরে সে আমোদ পায়। আরশোলা, বিছে, ব্যাঙ, প্রভৃতি কত সব পোকামাকড়। এক একসময় হঠাৎ তামাশা করে মানুষকে তাক লাগিয়ে দেবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা ছিল ছেলেটার। হঠাৎ হাসি-পরিহাসের তুফান তুলে চমকে দিত সে আশপাশের দোকানদারদের। এদিক দিয়ে তালিবাদের মতোই তার প্রতিভা ছিল।
রাস্তা দিয়ে যখন কোনও শবযাত্রা যেত তখন সেই দুষ্টু ছেলেটা অমনি শববাহকদের লক্ষ করে বলে উঠত, কী হে, ডাক্তার, সমাধি ভূমিতে কখনও কি কাজ করবে?
এমন সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা চশমাপরা কোনও ভদ্রলোক হয়তো সেই দুষ্টু ছেলেটার দিকে ঘুরে প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে বলে ওঠে, পাজি বদমাশ কোথাকার! তুই আমার স্ত্রীকে চিমটি কেটেছিস।
আমি মঁসিয়ে! দেখুন, এই তো আমি রয়েছি।
.
৩.
যেদিন কিছু পয়সা পায় ছেলেটা সেদিন সন্ধ্যায় সে থিয়েটার দেখতে যায় এবং থিয়েটারের হলের মাঝে পা দিয়েই সে যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। শুককীটের কাছে যেমন প্রজাপতি তেমনি তার কাছ থিয়েটার। থিয়েটার হলটা যেন আমোদ-প্রমোদে ভর্তি একটা জাহাজ। সে সেখানে গেলেই আনন্দের জোয়ার এসে যায় তার জীবনে। আনন্দের। আবেগে সে বারবার হাততালি দেয়, যেন কোনও পাখি ডানা ঝাঁপটাচ্ছে। থিয়েটার তার কাছে স্বর্গ হয়ে ওঠে।
শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার যে কোনও আগ্রহ থাকে না, তা নয়। কিন্তু চিরায়ত শিল্প-সাহিত্যের দিকে তার কোনও ঝোঁক থাকে না। তার কোনও উন্নত রুচিবোধ থাকে না। উদারহণস্বরূপ বলা যেতে পারে ম্যাদময়জেল মাবস্ নামে কোনও অভিনেত্রীর নাম করলে সে তাকে ম্যাদময়সেল হিউশ বলে ডাকে।
কখনও আনন্দে ফেটে পড়ে সে, কখনও উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে, হৈ-হুল্লোড় করে হাততালি দেয়, ঝগড়া করে, সবজান্তা হয়ে ওঠে, ছেলের পোশাক পরে এক খুদে দার্শনিক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সে হয়ে ওঠে এক স্পার্টান আর পকেটমার। জ্ঞানে পাগল, গানে গল্পে আনন্দে উচ্ছল হয়ে সে কাদা মেখে অলিম্পাসে ঘুরে বেড়ায় যেন।
