জেলখানার কয়েদিরা ছিল পুরুষমানুষ, এরা হল মহিলা। জেলখানার কয়েদিরা অপরাধী, চোর, ডাকাত, খুনি, প্রতারক, দুবৃত্ত। কিন্তু এই সব ধর্মপ্রতিষ্ঠানের মেয়েরা কি অপরাধ করেছে? তারা তো কোনও অপরাধ করেনি!
একদিকে যত রকমের পাপ মানুষ তার জীবনে করতে পারে আর একদিকে যত রকমের পুণ্য, পবিত্রতা আর ধর্মের কাজ থাকতে পারে যে কাজ মর্তলোককে পবিত্র করে তুলে স্বর্গলোকের দিকে মানুষের মনকে নিয়ে যায়। একদিকে কৃত অপরাধের অস্বীকৃতি আর তা গোপন করার চেষ্টা আর একদিকে সব দোষ, সব অপরাধের অকুণ্ঠ স্বীকারোক্তি। একদিকে যত দুর্গন্ধ আর একদিকে পবিত্র সুগন্ধ। একদিকে নৈতিক অধঃপতনের মধ্য দিয়ে সেই আইনের বলি হয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়ে কারাজীবনযাপন করা, আর একদিকে নির্জনবাসের মধ্যে থেকে আত্মার পরিশুদ্ধি সাধনের চেষ্টা করে যাওয়া। একদিকে নিবিড় অন্ধকার, আর একদিকে ছায়া। কিন্তু ছায়া হলেও সে ছায়ার মধ্যে আলো আছে, সে আলোর মধ্যে আছে আবার সূর্যকিরণের উজ্জ্বলতা।
দুটোই দাসত্বের জায়গা। একটাতে অবশ্য দাসত্বের শেষ আছে, মেয়াদ ফুরোলেই মুক্তি। কিন্তু অন্য স্থানটিতে আছে শুধু যাবজ্জীবন দাসত্বের অক্ষয় বন্ধন। ধর্মপ্রতিষ্ঠানের সন্ন্যাসিনীদের মুক্তির একমাত্র আশা হল মৃত্যু। জেলখানার কয়েদিরা ধাতব শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে আর কনভেন্টের কয়েদিরা আবদ্ধ থাকে ধর্মবিশ্বাসের শৃঙ্খলে।
এই দুটি জায়গায় থেকে পরিণামে কী পায় তারা একদিকে অর্থাৎ জেলখানায় কয়েদিরা লাভ করে শুধু অন্তহীন নিবিড় হতাশা আর সমগ্র মানবজাতির প্রতি অদম্য এক ঘৃণা আর ক্রোধ আর ঈশ্বরের প্রতি অবজ্ঞা আর বিদ্রূপ। অন্যদিকে এই ধর্মপ্রতিষ্ঠানের সন্ন্যাসিনীরা লাভ করে ঈশ্বরের আশীর্বাদ আর প্রেম। দুটো দু রকমের জায়গাতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ একই উদ্দেশ্যে কাজ করে চলেছে। সে উদ্দেশ্য হল প্রায়শ্চিত্ত এবং আত্মার মুক্তি।
জেলখানার কয়েদিদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যাপারটা ভলজাঁ বোঝে। ব্যক্তিগত পাপের প্রায়শ্চিত্ত। কিন্তু এখানে সন্ন্যাসিনীরা কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে কোনও দোষ বা পাপ তো করেনি তারা। তবে কিসের প্রায়শ্চিত্ত? এ প্রশ্নের উত্তরে তার বিবেক উত্তর করল, ধর্মপ্রাণ মানুষেরা যত সব পাপী-তাপীদের পাপস্খলনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করে যায় সারা জীবন।
এতক্ষণে ধরে ভলজাঁ’র মনে যে সব চিন্তা-ভাবনার ঢেউ খেলে যাচ্ছিল সেই সব চিন্তাগুলোকেই প্রকাশ করলাম আমরা। ভলজাঁ এখানে এসে দেখেছে মানুষ কিভাবে চরম দুঃখভোগ ও আত্মনিগৃহের মধ্য দিয়ে পুণ্যের সর্বাধিক শিখরে উঠে যেতে পারে, কিভাবে মানুষ মানুষের সব অপরাধ ক্ষমা করে সে অপরাধ স্খলনের জন্য, সে পাপ থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য নিজে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে প্রায়শ্চিত্ত করে যেতে পারে। নিজে কোনও পাপ না করেও মানুষ কী করে পাপীদের সব শাস্তির বোঝা নিজে বহন করে চলে তা সে নিজে দেখেছে।
এই সবকিছু এখন ভাবে ভলজাঁ। প্রায় দিনই রাত্রিতে ঘুম ভেঙে যায় তার। কত বাধা অতিক্রম করে, কত শাস্তি কত কষ্ট ভোগ করে অবশেষে সে এখানে এল সে কথাও ভাবে সে। তার মনে হল এক কারাগার থেকে আর এক কারাগারে এসে পড়েছে সে। কিন্তু সে কারাগারের দেয়ালগুলো কতকগুলি হিংস্র সিংহকে ঘিরে রেখেছে আর এখানে সে দেয়ালগুলোর মাঝে ভরা আছে কতকগুলি শান্ত মেষশাবক। এটা হল প্রায়শ্চিত্তের এক পবিত্র স্থান, শাস্তি বা দণ্ডভোগের স্থান নয়। তবু তার মনে হল এ স্থান, এ কারাগার আগের কারাগারের থেকে আরও নির্মম, আরও ভয়ঙ্কর। শীতের যে হিমশীতল বাতাস তার যৌবনের রক্তকে জমিয়ে দিয়েছে, যে বাতাস শকুনিদের বাসাগুলোর মধ্য দিয়ে বয়ে যায়, সেই বাতাস এখানে এসে যেন আরও তীক্ষ্ণ, আরও কনকনে আর দুঃসহ হয়ে ওঠে।
কিন্তু কেন?
সে যখন এই সব কথা ভাবে তখন তার সমগ্র সত্তা ঈশ্বরের রহস্যময় বিধানের কাছে এক নিবিড় আত্মসমর্পণে ঢলে পড়ে। তার সব অহঙ্কার নিঃশেষে উধাও হয়ে যায়। তার নিজের দুর্বলতার কথা সে বুঝতে পারে। সে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে। দু মাস ধরে সে যত কষ্টই ভোগ করুক আজ সে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে কসেত্তেকে কাছে পেয়েছে, আর তার বিনয় ও নম্রতার দ্বারা কনভেন্টের মধ্যে প্রবেশাধিকার পেয়েছে।
কোনও কোনও দিন সন্ধ্যার অন্ধকারে গির্জার বাইরে পথের উপর একটা জানালার তলায় নতজানু হয়ে সে প্রার্থনা করতে থাকে। গির্জার ভেতর ওই জানালার বেদির সামনে নতজানু হয়ে বসে এক সিস্টার প্রায়শ্চিত্ত ব্ৰত সাধন করতে থাকে আর ও যেন সিস্টারের কাছেই নতজানু হয়ে তার নির্দেশে প্রার্থনা করতে থাকে। সরাসরি ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করার সাহস যেন তার নেই।
এখন তার চারদিকে আছে শুধু বাগানের স্তব্ধ প্রশান্তি, ফুলের সুগন্ধ, শিশুদের আনন্দোচ্ছল হাসি, সন্ন্যাসিনীদের নিষ্পাপ গাম্ভীর্য আর সরলতা। এই সব জিনিসগুলো ধীরে ধীরে তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করে তার জীবনের মধ্যেও এনে দিয়েছে যেন এক অনির্বচনীয় সুখ, সরলতা, আর স্তব্ধ নীরব এক গাম্ভীর্যমণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। ভলজাঁ’র মনে হল দুটো কারাগারই যেন ঈশ্বরের দুটো বাড়ি। তার জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে এই দুটো বাড়ি স্থান দেয় তাকে।
