এদিকে জাঁ ভলজাঁকে খোঁজার জন্য সারা জেলাটায় কড়া নজর রেখেছিল জেভার্ত। তাকে তন্ন তন্ন খুঁজে চলছিল। ভলজাঁ সেটা জানত বলেই সে ইচ্ছা করে নিজেকে আবদ্ধ রাখে কনভেন্টের মধ্যে। ভলজাঁ’র কাছে কনভেন্টটা ছিল যেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্র দ্বারা পরিবৃত একটা ছোট দ্বীপ। এই দ্বীপে থেকে প্রাণভরে মাথার উপরে আকাশ দেখে আর কসেত্তেকে দেখে মনে যথেষ্ট শান্তি পায়। শান্তিপূর্ণ এক নতুন জীবন তার শুরু হল এখানে।
ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের সঙ্গে বাগানের এক প্রান্তে তিনটে ঘরওয়ালা রঙচটা চুনখসা একটা ছোট একতলা বাড়িতে থাকত। সে না চাইলেও তিনটে ঘরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘরখানা তাকে দেয়া হয়েছিল। ফশেলেভেন্তই জোর করে ঘরটা করায়। ঘরখানার মধ্যে আসবাবপত্র বলতে কিছুই ছিল না। শুধু দেয়ালে গাঁথা দুটো পেরেকের উপর একটা ঝুড়ি আর একটা হাঁটু বাধার ফিতে ঝোলানো ছিল। এ ছাড়া ১৭৯৩ সালে রাজার নামে দশ লিভারের যে ব্যাংকনোট বার হয় সেই নোট একটা দেয়ালে গাঁথা ছিল। ফশেলেভেন্তের আগে কনভেন্টের বাগানে যে মালী কাজ করত সে-ই এই নোটটা রেখে দেয় এইভাবে।
মালীর কাজে বেশই পারদর্শিতা দেখাতে লাগল ভলজাঁ। প্রথম জীবনে সে গাছ কাটার কাজ করত, তাই মালীর কাজ করতে কোনও অসুবিধাই হল না তার। এ দেশের সব গাছপালাই তার চেনা। এ বাগানে বিভিন্ন রকমের গাছ ছিল। সেই সব গাছ সময়মতো হেঁটে ও তাদের যত্ন করে তাদের উন্নতি সাধন করল।
প্রতিদিন কসেত্তে এক ঘণ্টা করে ভলজাঁর কাছে থাকার অনুমতি পেয়েছিল। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে ছুটে আসত ভলজাঁ’র কাছে। ভলজাঁ’র সাহচর্য সবচেয়ে ভালো লাগত তার। আবার তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভলজাঁ’র মুখখানাও আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। যে কোনও সুখের বৈশিষ্ট্য হল এই যে, যে সুখ আমরা কোনওভাবে কাউকে দান করি সেই সুখ প্রতিফলনের মতো না কমে গিয়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসে বর্ধিত আকারে। কসেত্তে যখন অন্য মেয়েদের সঙ্গে খেলা করত তখন তাকে একটু দূর থেকে দেখত ভলজাঁ। তার হাসির শব্দ শুনে অন্য মেয়েদের থেকে তাকে চিনে নিতে পারত সে।
কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মুখে হাসি ফুটে ওঠে কসেত্তের। কসেত্তে যখন হাসত তখন তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠত। হাসির আলো মানুষের মুখ থেকে সব অন্ধকার দূর করে দেয়। কসেত্তেকে খুব একটা সুন্দরী না দেখালেও তার মুখটাকে হাসিখুশিতে উজ্জ্বল দেখাত। শিশুসুলভ মিষ্টি নরম গলায় অনেক কথা বলত সে। খেলার পর যখন তার নিজের ঘরে চলে যেত তখন ভলজাঁ তার ঘরের জানালাগুলোর পানে তাকিয়ে থাকত। রাত্রিতে মাঝে মাঝে উঠে সে কসেত্তে’র ঘরের জানালার পানে তাকাত।
কসেত্তেকে নিয়ে কনভেন্টে বাস করতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে এক বিরাট পরিবর্তন আসে ভলজাঁ’র জীবনে। তবে একথাও ঠিক যে ধর্মের পথ অনেক সময় মানুষকে অহঙ্কাররূপ পাপের পথেও নিয়ে যায়। শয়তানই সেতুবন্ধ করে এই দুটো পথের মাঝখানে। ভলজাঁ যখন আপন মনে এই অহঙ্কাররূপ পাপের পথে এসেছিল তখন পেতিত পিকপাসে এসে পড়ে সে। প্রথম প্রথম সে বিশপের সঙ্গে নিজের তুলঁনা করে অযোগ্য আর ছোট ভাবত নিজেকে। কিন্তু কালক্রমে আর পাঁচজনের সঙ্গে তুলঁনা করতে লাগল এবং গর্ববোধ করতে লাগল। সে যদি এই কনভেন্টে না আসত তা হলে গর্বের সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণা জাগত তার মনে।
কনভেন্টে আসার ফলে সে ঘৃণা আর জাগেনি। এটাও এক ধরনের কারাগার। কিন্তু জেল বা আসল কারাগারের মতো এ কারাগারের বিকৃত রূপ নেই, কয়েদিদের ওপর আইনের তরফ থেকে অনুষ্ঠিত কোনও অপরাধের নামগন্ধ নেই এখানে। কারখানা থেকে কনভেন্ট। দুটো জীবনের সঙ্গে তুলঁনা করে দেখত সে।
জমিতে কাজ করার সময় মাঝে মাঝে চিন্তার অবরুদ্ধ স্রোতগুলোকে মুক্ত করে দিত সে। তার অতীতে কাটানো কারাজীবন আর সেখানকার সঙ্গীসাথিদের কথা ভাবত সে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কী পরিমাণ পরিশ্রম তাকে করতে হত, কী পোশাক তাকে পরতে হত, কী নামে তাদের ডাকা হত সেই সব কথা মনে পড়ল একে একে। তাদের শুধু এক-একটা নম্বর ধরে ডাকা হত। তারা মদ খেতে পেত না। খুব বেশি পরিশ্রম করার সময়েই তাদের মাংস খেতে দেওয়া হত। তাদের চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা থাকত।
এখানে আসার পর থেকে ভলজাঁ কনভেন্টের সন্ন্যাসিনীদের দেখে তাদের কথা প্রায়ই ভাবত। তার মনে হত এটাও যেন একটা কারাগার। এখানে যেসব মেয়ে থাকে তাদেরও চুলগুলো ছোট করে ছাটা। কয়েদিরা অপমানের বোঝাভারে মুখচোখ নামিয়ে থাকত, এরাও ধর্মজগতের নিষ্ঠুর অনুশাসনে নিপীড়িত। এদের কাঁধে ও গাঁয়ে কোনও বেত্রাঘাতের চিহ্ন না থাকলেও কঠোর আত্মনিগ্রহের ছাপ তাদের চোখে-মুখে। তারাও ধর্মের খাতিরে তাদের নিজেদের নাম ত্যাগ করে অন্য নাম ধারণ করেছে। তারাও মদ-মাংস খায় না এবং প্রায়ই সারাদিন উপবাস করে সন্ধের সময় খায়। তারা পরে কালো পশমের পোশাক যা শীতের পক্ষে মোটেই যথেষ্ট নয় এবং গ্রীষ্মকালে পীড়াদায়ক। তারা গ্রীষ্মকালে লিনেনের কোনও জামা বা শীতকালে পশমের পোশাক পরে না। আর ছমাস ধরে যে চুলের জামা পরতে হয় তাদের, সে জামা পরে তাদের জ্বর আসে। তারা যে সব ঘরে বাস করে সেখানে কোনও আগুন জ্বলে না। তাদের শীতে কষ্ট পেতে হয়। তাদের শোবার কোনও তোষক নেই, খড়ের চাটাই বা মাদুরের উপর শুতে হয়। সারাদিনের খাটুনির পর তারা রাত্রিতে শান্তিতে ঘুমোতে পায় না। এক ঘুমের পরেই সব সন্ন্যাসিনীকে বিছানা থেকে উঠে শীতে কাঁপতে কাঁপতে প্রার্থনা করতে হয়। তার উপর এক সপ্তাহ অন্তর পালাক্রমে প্রত্যেক সন্ন্যাসিনীকে একবার করে প্রায়শ্চিত্ত ব্রত সাধন করতে হয়। এই সময় বারো ঘণ্টা ধরে একটানা বেদির সামনে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে যেতে হয়। আবার কখনও-বা বুকের উপর হাত দুটো আড়াআড়ি করে রেখে উপুড় হয়ে সটান শুয়ে থাকতে হয়।
