এইভাবে দুটো সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ভলজাঁকে কনভেন্ট থেকে বার করে আবার তার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। ফশেলেভেন্তের কথায় দারোয়ান দরজা খুলে দিল। ফশেলেভেন্ত আর ভলজাঁ কসেত্তেকে নিয়ে বাগানে ঢুকে বাগান পার হয়ে সেই বৈঠকখানা ঘরটায় ঢুকল যেখানে গতকাল ফশেলেভেন্ত কনভেন্টের প্রধানার সঙ্গে কথা বলেছিল।
প্রধানা তখন জপের মালা হাতে বসে ছিলেন সেই ঘরে। তার পাশে একজন মাদার দাঁড়িয়ে ছিল। একটা বাতি জ্বলছিল ঘরের মধ্যে।
প্রধানা তাঁর নত চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ভলজাঁকে পরীক্ষা করলেন। তার পর প্রশ্ন করলেন, তুমি ওর ভাই?
ফশেলেভেন্ত উত্তর দিল, হ্যাঁ শ্রদ্ধেয়া মাতা।
তোমার নাম কী?
এবারও ফশেলেভেন্তই উত্তর দিল, আলতিমে ফশেলেভেন্ত। এই নামে তার এক ভাই ছিল। সে মারা গেছে।
তোমার বাড়ি কোথায়?
ফশেলেভেন্ত উত্তর করল, অ্যামিয়েন্সের কাছে পিকিগনেতে।
তোমার বয়স কত?
পঞ্চাশ।
তোমার পেশা কী?
আমি মালীর কাজ করি।
তুমি কি একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান?
আমাদের বাড়ির সবাই নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান।
এই বাচ্চাটা তোমার?
হ্যাঁ শ্রদ্ধেয় মাতা।
তুমি তার বাবা?
তার পিতামহ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাদার প্রধানকে চুপি চুপি বলল, ও ভালোই কথা বলে।
আসলে ভলজাঁ একটা কথাও বলেনি। তার হয়ে ফশেলেভেন্তই সব উত্তর দিয়েছে।
প্রধানা মনোযোগের সঙ্গে কসেত্তে’র দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েটাকে দেখে বেশ সাদামাটা মনে হচ্ছে।
প্রধানা আর মাদার দু জনে কিছুক্ষণ ধরে আলোচনা করল। তার পর প্রধান ফশেলেভেন্তকে বলল, পিয়ের ফভেন্তু, এবার থেকে তোমাকে আর একটা ঘণ্টা বাঁধতে হবে।
পরদিন সকাল থেকে বাগানে দু জন মালীর পায়ে দুটো ঘন্টার ধ্বনি শোনা যেতে লাগল। সে ঘণ্টার ধ্বনি শুনে সন্ন্যাসিনী ও সিস্টারেরা তাদের অবগুণ্ঠনের কিছুটা না তুলে পারত না। তারা ভলজাঁকে বাগানে গাছের তলায় ফশেলেভেন্তের পাশে কাজ করতে দেখে চুপি চুপি বলাবলি করত নিজেদের মধ্যে, একজন সহকারী মালী এসেছে। এ হচ্ছে পিয়ের ফভেন্তের ভাই।
জাঁ ভলজাঁ’র পায়েতে ঘণ্টা বাধা হল। আলতিমে ফশেলেভেন্তও একজন কনভেন্টের লোক হয়ে গেল।
প্রধানা কসেত্তেকে দেখে সরল এবং সাদামাটা বলায় ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। মেয়েটাকে তার ভালো লেগে যায়। তিনি এক অনাথা ছাত্রী হিসেবে স্কুলে তার একটা স্থান করে দেন। সাদামাটা’ কথাটার মধ্যে একটা তাৎপর্য ছিল। যেসব মেয়ে সুন্দরী তারা কখনও ধার্মিক হতে চায় না। সৌন্দর্যের অহঙ্কার আর সন্ন্যাসিনীর কাজ পরস্পরবিরুদ্ধ ব্যাপার। তাই যারা দেখতে খুব সাদামাটা এই ধরনের ধর্মপ্রতিষ্ঠানে তাদের দাম বেশি।
এই ঘটনায় তিন দিক থেকে সাফল্য লাভ করল ফশেলেভেন্ত। সে জাঁ ভলজাঁকে উদ্ধার করে আশ্রয় দান করেছে: গ্রিবারকে জরিমানার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে আর তারই সহায়তায় কনভেন্ট ধর্মের সেবায় সরকারি আইন ও শাসনকে অমান্য করতে পেরেছে। এখন পেতিত পিকপাসের বেদির তলায় মৃতদেহভরা একটা কফিন আছে। আর ভগিয়ার্দের কবরখানায় একটা খালি কফিন পোঁতা আছে। তাতে হয়তো সরকার ক্ষুণ্ণ। হবে। কিন্তু ফশেলেভেন্তের প্রতি কনভেন্টের কৃতজ্ঞতা বেড়ে যায়। সে কনভেন্টের সবচেয়ে সেরা ভূত্যরূপে পরিগণিত হয় এবং তার খাতির বেড়ে যায়। পরে আর্কবিশপ কনভেন্ট পরিদর্শন করতে এলে তার কাছে তার কথা তোলা হয়। ফশেলেভেন্তের খ্যাতি রোমে পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। একদিন তৎকালীন পোপ তার এক আত্মীয়ের কাছে বলেন, প্যারিসের এক কনভেন্টে ফভা নামে চমৎকার এক মালী আছে। সে সাধু প্রকৃতির লোক।
.
৯.
কনভেন্টে আসার পরেও মুখ খুলল না কসেত্তে। সে ভাবত সে জাঁ ভলজাঁ’র সন্তান। এর থেকে সে বেশি কিছু জানত না। তাই বলারও কিছু ছিল না তার। ক্রমাগত দুঃখভোগ তাকে ভীরু স্বভাবের করে তোলে। সে সব কিছুকেই ভয় করতে থাকে। এমনকি কথা বলতে এবং নিশ্বাস ফেলতেও ভয় করত তার। ভলজাঁ’র সঙ্গে থাকাকালে সে যে নিরাপত্তাবোধ লাভ করেছিল সে নিরাপত্তাবোধ স্থায়ী। কনভেন্টে আসার পর সে কনভেন্টের জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে। তার শুধু একটা দুঃখ, সে তার পুতুলটাকে আনতে পারেনি। কিন্তু সে কথা কাউকে বলেনি। শুধু ভলজাঁকে একবার বলেছিল, আমি যদি জানতাম এখানে আসব তা হলে ক্যাথারিনকে নিয়ে আসতাম আমার সঙ্গে।
ছাত্রী হিসেবে কসেত্তেকে স্কুলের পোশাক পরতে হত। যে সব পোশাক সে ছেড়ে দেয়, সেই সব কালো পোশাক, থেনার্দিয়েরদের দেওয়া পোশাক, ভলজাঁ একটা ছোট বাক্স জোগাড় করে রেখে দেয় তার মধ্যে। বাক্সটা সে তার বিছানার পাশে একটা চেয়ারের উপর রেখে দেয়। বাক্সের চাবিটা সে সব সময় তার নিজের কাছে রেখে দেয়।
ফশেলেভেন্ত এই ঘটনায় তিন দিক থেকে লাভবান হয়। সে যে ভালো ভালো কাজ করেছে তার পুরস্কার সে পায় তিন দিক থেকে। প্রথমত সে এ কাজ সুসম্পন্ন করতে পেরে মনের দিক থেকে তৃপ্তি পায়। দ্বিতীয়ত এখন থেকে বাগানের কাজ তাকে কম করতে হয়। তৃতীয়ত সে তিনবার করে ধূমপান করতে পায় এবং ভলজাঁ-ই তার দাম দেয়। ভলজাঁকে ডাকার সময় সন্ন্যাসিনীরা আলতিমে কথাটা ব্যবহার করত না, বলত আর এক ফভেন্ত।
জেভার্তের মতো তীক্ষ্ণ ও সন্ধানী দৃষ্টি যদি সন্ন্যাসিনীদের থাকত তা হলে তারা একটা জিনিস লক্ষ করত, কনভেন্টের কোনও ফাইফরমাস খাটার সময় কোনও কাজে বাইরে যেতে হলে বা কোনও জিনিস বাইরে থেকে আনতে হলেও ফশেলেভেন্তই যেত, ভুলজা কোনও সময় কোনও কারণেই বাইরে যেত না। যাদের মনপ্রাণ ঈশুরে সমর্পিত থাকে তারা বোধ হয় জাগতিক ছোট-বড় কোনও ব্যাপারে লক্ষ রাখে না। কোনও কিছু খেয়াল করে না।
