এবার সে তার মাথার চুল ছিঁড়তে লাগল। তার পর আবার ভলজাঁ’র উপর ঝুঁকে দেখতে লাগল। হঠাৎ চমকে উঠল সে। দেখল ভলজাঁ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।
স্তম্ভিত হয়ে গেল ফশেলেভেন্ত। ভলজাঁ বলল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ফশেলেভেন্ত আনন্দে চিৎকার করে উঠল, হে স্বর্গের মাতা, তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
ভলজাঁর মতোই নিজেকে আবেগের কবল থেকে সামলে নিতে দেরি হল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলতে লাগল, তা হলে তুমি মরনি! তোমার মনের জোর আছে তা হলে! আমি অনেক ডেকেছি তোমায়। তবে তোমার জ্ঞান ফিরেছে। যখন দেখলাম তোমার চোখদুটো বন্ধ, তখন ভাবলাম তোমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেছে। আমি পাগল হয়ে যেতে বসেছিলাম। তুমি মারা গেলে কী হত? কী করতাম আমি। বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়েই-বা আমরা কী করতাম? তুমি তা হলে এতক্ষণ বেঁচে ছিলে?
ভলজাঁ বলল, আমার খুব শীত লাগছে।
কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব অবস্থার প্রতি সচেতন হয়ে উঠল ফশেলেভেন্ত। দু জনের মন তখন ঠিক হয়ে উঠলেও কবরখানার সান্ধ্য নির্জন পরিবেশ তাদের ভালো লাগছিল না।
ফশেলেভেন্ত বলল, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে। তার আগে একফোঁটা করে মদ গলায় ঢালতে হবে।
এই বলে তার পকেট থেকে মদের একটা ফ্লাস্ক বার করল। কিছুটা মদ পান করায় দেহে শক্তি ফিরে পেল ভলজাঁ। সে কফিন থেকে বেরিয়ে এল। ফশেলেভেন্তু পেরেক এঁটে দিল কফিনের ঢাকনাটাতে।
এতক্ষণে মনে মনে শান্ত এবং নিশ্চিন্ত হয়ে উঠল ফশেলেভেন্ত। এখন কবরখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রিবারও তার কার্ড খুঁজতে বাড়ি চলে গেছে। কার্ড সে পাবে না, সুতরাং আর এখন ফিরে আসবে না। তার কার্ড এখন ফশেলেভেন্তের পকেটে। তাকে ভয়ের আর কিছু নেই এখন। ফশেলেভেন্ত কোদাল হাতে নিল এবং ভলজাঁ নিল গাইতিটা। মাটি দিয়ে কবরের খালটা বুজিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল। সে পথে শবযাত্রা কবরখানায় ঢুকেছিল সেই পথ দিয়েই বেরিয়ে পড়ল ওরা। ভলজাঁর পাগুলো শক্ত কাঠ হয়ে ছিল। সে ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না। সে বলল, অল্প সময়ের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
গেট দিয়ে বার হবার সময় ফশেলেভেন্ত কার্ডটা চিঠির বাক্সে ফেলে দিতেই দারোয়ান দরজা খুলে দিল এবং ওরা তখন বেরিয়ে গেল।
ফশেলেভেন্ত বলল, সবকিছু কত ভালোভাবে হয়ে গেল। তোমার পরিকল্পনাটা চমঙ্কার পিয়ের ম্যাদলেন।
ভগিয়ার্দে ব্যারিয়ার অঞ্চলের মধ্য দিয়ে নিরাপদে ওরা চলে গেল। সমাধিভূমি অঞ্চলে কারও হাতে কোদাল গাঁইতি থাকলে সেটা তার ছাড়পত্রের কাজ করে। র্যু দ্য ভগিয়ার্দ অঞ্চলটা সন্ধ্যার সময় খুব নির্জন থাকে।
সামনের দিকের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ফশেলেভেন্ত বলল, আমার থেকে তোমার চোখের দৃষ্টি ভালো আছে। দেখ তো ৮৭ নম্বর বাড়ি কোনটা।
ভলজাঁ বলল, আমরা তো এসে গেছি।
ফশেলেভেন্তু বলল, আমার হাতের গাঁইতি-কোদালটা নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর।
এরপর সে ৮৭ নম্বর বাড়িটার উপরতলায় চলে গিয়ে একটা রুদ্ধ দরজায় করাঘাত করল।
গ্রিবার ভেতর থেকে তাকে যেতে বলল।
গ্রিবারের বাসাটা একটা ঘরের মধ্যে। ছোট ঘরখানা কফিনের মতোই অন্ধকার আর বুকচাপা। মেঝের উপর পাতা একটা মাদুর বিছানার কাজ করে। ঘরটার এককোণে একটা ছেঁড়া কার্পেটের উপর একটি রোগা মহিলা বসে আছে, তার চারপাশে একদল ছেলেমেয়ে। গোটা ঘরটা কে যেন ওলট-পালট করেছে। ঘরময় জিনিসপত্র সব ছড়ানো। মহিলাটি বসে বসে কাঁদছে। ছেলেগুলোও বোধ হয় মার খেয়েছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কবরখননকারী গ্রিবার তার কার্ড না পেয়ে তার বাড়ির সবাইকে কার্ডটা হারানোর জন্য দায়ী করেছে। তার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যায় সে হতাশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ফশেলেভেন্তু প্রথমে গ্রিবারকে কার্ড না দিয়ে কার্য সম্পাদনের খবর আগে দিতে চাইল। সে তার কোদাল-গাঁইতিটা তাকে দিয়ে বলল, তোমার কাজ আমি করে দিয়েছি।
গ্রিবার আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সব করে দিয়েছ?
ফশেলেভেন্ত বলল, গেটের দারোয়ানের কাছে তোমার কার্ড পাবে।
গ্রিবার বলল, ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না আমি।
ব্যাপারটা খুবই সোজা। কার্ডটা হয়তো তোমার পকেট থেকে পড়ে যায়। তুমি চলে আসার পর আমি সেটা কুড়িয়ে পাই। তার পর আমি কবরের গর্তটা বুজিয়ে দিই। তোমার কাজ সব করে দিই। দারোয়ান তোমার কার্ড দিয়ে দেবে। তোমাকে আর পনেরো ফ্র দিতে হবে না।
গ্রিবার ফশেলেভেন্তের একটা হাত ধরে আনন্দের সঙ্গে বলল, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ বন্ধু। এরপরের বার আমি মদের দাম দেব।
.
৮.
এক ঘণ্টার পর সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে উঠলে দু জন লোক কসেত্তেকে নিয়ে পেতিত র্যু পিকপাসের ৬২ নম্বর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
র্যু দু শেমিন ভার্তের যে ফলের দোকানটায় গতকাল সন্ধ্যার সময় ফশেলেভেন্ত কসেত্তেকে নিয়ে গিয়ে রেখে এসেছিল সেখান থেকে তারা নিয়ে এল তাকে। নিদারুণ এক ভীতিবিহ্বল অবস্থার মধ্য দিয়ে সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা কাটায় কসেত্তে। সে ভয়ে একবারও কাঁদেনি। কিছু খায়নি বা ঘুমোয়নি। ফলের দোকানের মালিক সেই মহিলাটি তাকে অনেক প্রশ্ন করে, তার কাছ থেকে অনেক কথা বার করবার চেষ্টা করে। কিন্তু কসেতে তার একটা কথারও জবাব দেয়নি। সে শুধু নীরবে তাকিয়ে থেকেছে তার পানে নিদারুণ দৃষ্টিতে। গত দু দিনের মধ্যে সে যা দেখেছে বা শুনেছে সে তার কিছুই বলেনি। সে বুঝতে পেরেছে গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। তাই শান্ত হয়ে থাকার একটা প্রয়োজনীয়তার প্রতি গভীরভাবে সচেতন হয়ে উঠল সে। তাছাড়া তার কানে কানে একটা কথা বলে দেওয়া হয়েছিল, একটা কথাও বলবে না। চব্বিশ ঘণ্টা কাটাবার পর জাঁ ভলজাঁকে দেখতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আকুল হয়ে এমনভাবে চিৎকার করে ওঠে কসেত্তে, যাতে কেউ তাকে দেখলেই বুঝতে পারত তার মনের অবস্থা তখন কী ছিল।
