ভলজাঁ ভাবল, এরপর ওরা চলে যাবে আর ফশেলেভেন্ত মেস্তিয়েনকে মদ খেতে পাঠিয়ে দিয়ে তাকে মুক্ত করবে। সে বেরিয়ে আসবে। সে সমাধির উপর কতকগুলি পদশব্দ শুনতে পেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার কফিনের উপর মাটি পড়তে লাগল। একটা একটা করে মাটির চাপ পড়তে লাগল। ভলজাঁ আশ্চর্য হয়ে গেল। সমাধির গর্তটা বুজে যাচ্ছে ক্রমশ।
আর সহ্য করতে পারল না ভলজাঁ। তার শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার পথ বন্ধ হয়ে গেল। সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল।
.
৭.
এরপর সমাধিভূমিতে যা ঘটেছিল তা হল এই।
শববাহকরা পুরোহিতকে নিয়ে চলে গেলে গ্রিবার কোদাল নিয়ে সমাধির গর্তটা বোজাতে গেল। ফশেলৈভেন্তে তখন কবর আর গ্রিবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চরম ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে হাতজোড় করে বলল, আমি দাম দেব।
তার পানে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে গ্রিবার বলল, কিসের দাম দেবে?
আমি বলছি, আমি দাম দেব।
কিসের দাম?
মদের দাম। আর্জেন্টিনার ভালো মদ।
কোথায় পাওয়া যায় সেই মদ?
বন ফোয়িং-এ।
জাহান্নামে যাও।
এই বলে এককোদাল মাটি সমাধির ভেতর কফিনের উপর ফেলে দিল গ্রিবার।
ফশেলেভেন্তের পা দুটো জোর কাঁপতে লাগল। মনে হল সে যেন নিজেই কবরের ভেতরে পড়ে যাবে। সে আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু বন্ধু, দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
সে কথা গ্রাহ্য না করে আবার মাটি কাটায় মন দিল গ্রিবার।
ফশেলেভেন্ত তার একটা হাত ধরে বলল, আমি দাম দেব। শোন বন্ধু, আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। এ কাজ সন্ধের পর করলেও চলবে। মদপান করার পর আমরা এ কাজ শেষ করব।
গ্রিবারকে সে ধরে রইল মরিয়া হয়ে। তার তখন শুধু এই ভাবনা হতে লাগল তাকে মদ খাওয়ালেও সে মাতাল হবে কি?
গ্রিবার বলল, ঠিক আছে, আমি তোমার সঙ্গে মদ খেতে পারি। কিন্তু কাজটা শেষ করার পর।
আবার কোদালের উপর ঝুঁকে পড়ল। ফশেলেভেন্ত তাকে বাধা দেবার চেষ্টা করল। বলল, ছয় স্যুতে ভালো মদ।
গ্রিবার বলল, তুমি শুধু ঘণ্টার মতো একটানা বেজে চলেছ। এখন যাও।
এই বলে আবার এককোদাল মাটি ফেলে দিল গ্রিবার। ফশেলেভেন্তের মনের অবস্থাটা তখন এমনই হয়ে উঠল যে সে কী বলছে তা সে নিজেই জানে না। সে বলল, একটুখানি মদ খাব, আমি দাম দেব।
গ্রিবার আপন মনে বলে চলতে লাগল, আজ রাতে বড় ঠাণ্ডা পড়বে। বুড়িটা মরে পড়ে আছে, আগে মাটি ঢাকা দিতে হবে। তা না হলে আমাদের তাড়া করবে।
গ্রিবার যখন চতুর্থবার এককোদাল মাটি দিতে যাচ্ছিল তখন তার পকেটে একটা জিনিস লক্ষ করল ফশেলেভেন্ত। গ্রিবারকে একমনে কাজ করতে দেখে সে তার একটা হাত দিয়ে পকেট থেকে সেই জিনিসটা তুলে নিল।
গ্রিবার এককোদাল মাটি ফেলে দিতেই ফশেলেভেন্ত বলল, আচ্ছা তোমার বেরিয়ে যাবার জন্য কার্ড আছে তো?
গ্রিবার তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, কী কার্ডঃ
এখন সন্ধে হয়ে আসছে। গেট বন্ধ হয়ে যাবে।
তা হলে?
তোমার কার্ড আছে তো?
গ্রিবার তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল। না পেয়ে তার পোশাকগুলোতে তন্ন তন্ন করে। খুঁজল। কিন্তু পেল না কার্ডটা। তখন বলল, তা হলে আমি ভুলে গেছি।
ফশেলেভেন্ত বলল, তা হলে পনেরো ফ্ৰাঁ জরিমানা লাগবে।
গ্রিবারের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পনেরো ফ্ৰাঁ জরিমানা!
তার মানে তিনশো স্যু গুনে দিতে হবে।
গ্রিবার কোদালটা নামিয়ে রাখল।
এবার সুযোগ বুঝে ফশেলেভেন্ত বলল, হতাশ হবার কারণ নেই। আত্মহত্যা করে কবর ভরিয়ে কাজ নেই। পনেরো ফ্ৰাঁ তুমি দিতে পারবে না। আমার বয়স হয়েছে। কিসে কী হয় আমার সব জানা আছে। কী করতে হবে না হবে পরে বলে দেব। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গেট বন্ধ হয়ে যাবে।
তা ঠিক। এ কবরের খালটা বেশি। গেট বন্ধ হবার আগে কবর বোজাতে পারব না।
তা ঠিক। তবে এখনও সময় আছে, তুমি কোথায় থাক?
আমি থাকি ব্যারিয়ারের কাছে, ৮৭ নম্বর র্যু দ্য ভগিয়ার্দে। পনেরো মিনিটের পথ।
তুমি এখনি ছুটে চলে যাও। বাড়িতে কার্ডটা খুঁজে দেখগে। পেলে ফিরে আসবে। জরিমানা দিতে হবে না তোমাকে। আমি ততক্ষণ এখানে বসে পাহারা দেব।
খুব ভালো কথা।
তা হলে চলে যাও।
গ্রিবার ছুটতে শুরু করে দিল। সাইপ্রেস গাছের আড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
ফশেলেভেন্ত কবরের উপর ঝুঁকে ডাকল, পিয়ের ম্যাদলেন! কোনও উত্তর নেই।
ভয়ে কাঁপতে লাগল ফশেলেভেন্ত। সে কবরের তলায় নেমে গিয়ে কফিনের কাছে। মুখটা নিয়ে গিয়ে বলল, আপনি আছেন?
কোনও কথা নেই।
কাঁপতে কাঁপতে ফশেলেভেন্ত কফিনের উপর হতে মাটিগুলো সরিয়ে কফিনের ঢাকনাটা তুলঁল। তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। দেখল ম্যালেনের চোখ দুটো বন্ধ, মুখখানা অন্ধকারেও সাদা দেখাচ্ছে।
ফশেলেভেন্তের মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। সে কফিনের উপর পড়ে যাচ্ছিল কাঁপতে কাঁপতে। ভলজাঁ’র নীরব নিস্তব্ধ শায়িত মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল, সে হয়তো মারা গেছে। সে তার বুক চাপড়ে বলল, এইভাবে তাকে আমি উদ্ধার করলাম বিপদ থেকে!’ সে কাঁদতে লাগল।
কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে লাগল, এই সবকিছু হল শুধু পিয়ের মেস্তিয়েনের জন্য। যখন তার দরকার তখনি সে মারা গেল। পিয়ের ম্যাদলেন কবরেই মারা গেল। সে মারা গেল। এখন মেয়েটার কী হবে, তাকে নিয়ে কী করব সেই কথাই ভাবছি। ফলের দোকানের মেয়েটাই-বা কী বলবে। এরপর ঈশ্বরে আর বিশ্বাস রাখা যায় না। পিয়ের ম্যাদলেন আমাকে গাড়ির ভেতর থেকে কত কষ্টে উদ্ধার করেছিলেন। বোধহয় শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ চলে গেল। এ হল ভাগ্যের চক্রান্ত। এরপর আর আমি কনভেন্টে ফিরে যাব না। আমরা দু জন বুড়ো লোক কত ভালো থাকতাম একসঙ্গে। পিয়ের ম্যাদলেন। মঁসিয়ে লা মেয়র। আর তিনি শুনতে পাবেন না।
