ফশেলেভেন্ত বলল, বন্ধু, আমি হচ্ছি কনভেন্টের কবরখননকারী।
গ্রিবার বলল, তা হলে আমরা সহকর্মী।
লেখাপড়া না শিখলেও ফশেলেভেন্ত কূট বুদ্ধিসম্পন্ন। সে বুঝতে পারল, তাকে ভয়ঙ্কর ধরনের এমন এক লোককে নিয়ে চলতে হবে যে ভালো কথা বলতে পারে, যার যুক্তিবোধ আছে। সে আপন মনে বলে উঠল, তা হলে মেস্তিয়েন মারা গেল।
গ্রিবার বলল, হ্যাঁ, ঈশ্বর তার খাতা খুলে দেখল তার দিন ফুরিয়ে গেছে। তার মৃত্যুর। পালা এসে গেছে। তাই মারা গেল।
ফশেলেভেন্ত বলল, হা ভগবান!
গ্রিবার বলল, হা ভগবান! দার্শনিকরা বলে, চিরন্তন পরম পিতা। জ্যাকবিয়ানরা বলে, পরম সত্তা।
ফশেলেভেন্ত বলল, আমরা পরস্পরের পরিচিত।
গ্রিবার বলল, আমরা পরস্পরকে চিনি। তুমি একজন গ্রাম্য লোক আর আমি প্যারিস শহরের লোক।
ফশেলৈভেন্তু বলল, একসঙ্গে দু জনে মদপান না করলে পরস্পরকে চেনা যায় না। মদের গ্লাস পান করার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ মনের কথা সব বলে। দু জনে বসে আগে মদ খেতে হবে। এটা তুমি অস্বীকার করতে পার না।
আগে আমাদের কাজ সারতে হবে।
ফশৈলেভেন্ত ভাবল, আমার দফা শেষ হয়ে গেল।
তারা সেই জায়গাটায় পৌঁছল যেখানে সন্ন্যাসিনীরা দাঁড়ায়। গ্রিবার ফশেলেভেন্তুকে বলল, বন্ধু, সাতটা ছেলেকে আমার খাওয়াতে হয়। মদ খাব কী করে? তাদের ক্ষুধাই আমার মদের পিপাসার শত্রু।
শবযাত্রাটা এবার একটা সরু পথ ধরল। বৃষ্টির জলে পথটায় কাদা হয়ে গিয়েছিল। ফশেলেভেন্ত গ্রিবারের কাছে সরে এল। সে বলল, আর্জেন্টিনার একটু ভালো মদ আছে।
গ্রিবার বলল, তুমি ব্যাপারটা বোঝ, কবরখননকারী হবার আমার কোনও অধিকারই নেই। আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো করি। কিন্তু তিনি দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েন। কারবারে তার সব টাকা খোয়া যায়। আমি পড়াশোনা ত্যাগ করতে বাধ্য হই। এখনও বাজারের বই লিখি।
ফশেলেভেন্তু তার জামার আস্তিনটা ধরে বলল, তার মানে তুমি একজন কবরখননকারী নও।
অবশ্য আমার কাছে সব কাজই সমান। আমি একজন বহুত্ববাদী।
গ্রিবারের শেষের কথাটা ফশেলেভেন্তের বোধগম্য হল না কিছুতে। সে বলল, তোমাকে এখন কিছু মদ খেতে হবে।
এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। সে মদ খাবার কথা বলেছে। এ বিষয়ে তার প্রচুর আগ্রহ ও উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সে মদের দামটা কে দেবে সে বিষয়ে সে কিছুই বলেনি। এ ব্যাপারে মেস্তিয়েনের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল। সে তাকে মদ খাবার কথাটা বললেও মদের দামটা মেস্তিয়েই দিত। কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থায় মদের দাম দেবার প্রস্তাবটা তারই করা উচিত ছিল। এ বিষয়ে তার ভয় থাকা সত্ত্বেও সে দাম দিতে চায়নি।
গ্রিবার হাসতে লাগল। সে বলল, পেটে খেতে হবে সবাইকে। আমি পিয়ের মেস্তিয়েনের কাজের ভারটা নিতে নিজেই রাজি হয়েছিলাম। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলেই যে কোনও লোক একদিক দিয়ে দার্শনিক হয়ে ওঠে। কলম দিয়ে লেখার কাজ শেষ করে। আমি হাতের কাজ শুরু করেছি। বাজারে র্যু দ্য বেভারেতে এখনও আমার একটা বই-এর দোকান আছে। তুমি জান কি না তা জানি না। ক্রয় রোগ অঞ্চলের যেসব মেয়ে রান্নাঘরে ঝি-এর কাজ করে, তারা আমার কাছে চিঠি লেখাতে আসে। আমি সারাদিন ধরে প্রেমের চিঠি লিখি আর বিকালবেলায় কবর খোঁড়ার কাজ করি। এই হচ্ছে আমার জীবন।
শবযাত্রা কবরখানার ভেতরে আসল জায়গার দিকে এগিয়ে চলল। দুশ্চিন্তায় ফশেলেভেন্তের কপালে ঘাম দেখা দিল।
গ্রিবার বলল, কিন্তু দুটো কাজ একসঙ্গে চলতে পারে না। হয় কলম–না হয় কোদাল, দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতেই হবে আমাকে। কোদাল ধরে ধরে আমার হাতে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে।
একটা মুখখোলা কবরের সামনে এসে শবযাত্রাটা থেমে গেল।
.
৬.
ভলজাঁ তার কফিনের মধ্যে এমন একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছিল যাতে সে প্রয়োজনমতো নিশ্বাস নিতে পারে। দেহমনের স্বস্তি থেকে একটা আশ্চর্য নিরাপত্তাবোধ জেগেছিল তার মধ্যে। তার পরিকল্পনা প্রথম থেকেই কার্যকরী হয়ে আসছিল। ফশেলেভেন্তের মতো সে-ও মেস্তিয়েনের ওপর নির্ভর করেছিল অনেকখানি এবং পূর্বকল্পিত পরিণাম সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ ছিল না তার মনে। এতখানি সংকটজনক মূহূর্তে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এতখানি মানসিক প্রশান্তি কেউ কখনও দেখাতে পারেনি তার মতো।
কফিনের চার-দেয়ালের মধ্যে সেই প্রশান্তি বিরাজ করছিল। সে তার ভেতর থেকে সেই নাটকের গতিবিধি বুঝতে পারছিল যে নাটকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মৃত্যু। কফিনটাতে ফশেলেভেন্তে পেরেক এঁটে দেবার পরই সে অনুভব করে কফিনটাকে তোলা হয় একটা চাকাওয়ালা গাড়ির উপর। কফিনের গাড়িটা প্রথমে পাথরভরা এবড়ো খেবড়ো পথের উপর দিয়ে যেতে থাকে এবং তার ফলে খুব ঝাঁকুনি হতে থাকে। তার পর বুলভার্দের মসৃণ পথের উপর দিয়ে চলতে থাকে। গাড়িটা যখন প্রথম থামে তখন ভলজাঁ বুঝতে পারে এরা কবরখানায় এসে গেছে। তার পর চলতে শুরু করে আবার যখন থেমে যায় তখন সে বুঝতে পারে এবার সমাধির জায়গায় এসে গেছে। এরপর কফিনটা একবার ঝাঁকুনি খেল। তাতে দড়ি বেঁধে সেটাকে কবরের মধ্যে নামানো হল।
হঠাৎ ভলজাঁ’র মনে হল সে মাথার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পর কফিনটাকে শুইয়ে দেওয়া হল। সে বুঝতে পারল সে কবরের তলায় শুয়ে আছে। একটা শিরশিরে অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল তার মধ্যে। সে শুনতে পেল উপরে শান্ত ও গুরুগম্ভীর কণ্ঠে লাতিন ভাষায় কে মন্ত্রপাঠ করছে। একটা বালককণ্ঠ বলে উঠল, “দে পোফান্দিস। যে যাজক মন্ত্র পড়ছিলেন তিনি বললেন, হে প্রভু, চিরশান্তি দান কর তার আত্মাকে। এরপর কফিনের উপর পবিত্র জল ছিটানো হতে লাগল।
