জাঁ ভলজাঁ তার একটা হাত বাড়িয়ে দিল এবং ফশেলেভেন্তু তার কৃষকসুলভ নিষ্ঠার সঙ্গে সে হাতটা জড়িয়ে ধরল।
ভলজাঁ বলল, তা হলে সব ঠিক হয়ে গেল ফশেলেভেন্ত। আমাদের কোনও বেগ পেতে হবে না।
ফশেলেভেন্ত চিন্তান্বিতভাবে বলল, যদি কোনও প্রতিকূল ঘটনা না ঘটে। হে ভগবান, ঠিকভাবে যেন সবকিছু ঘটে।
.
৫.
পরদিন বিকালবেলায় বুলভার্দ দু মইন অঞ্চলের পথচারীরা এক পুরনো ধরনের শবযাত্রা রাস্তা দিয়ে চলে যেতে দেখে তাদের টুপি খুলে শ্রদ্ধা জানায় মৃতের প্রতি। এক সাদা শবাচ্ছাদন দিয়ে কফিনটা ঢাকা ছিল। সেই চাদরটার উপর একটা কালো ক্রস আঁকা ছিল। শববাহকদের পেছনে একটা গাড়ি ছিল। সেই গাড়িতে একজন যাজক আর লাল টুপি মাথায় একজন প্রার্থনার গান গাওয়ার জন্য একটা ছেলে ছিল। কালো পোশাকপরা দু জন শববাহক শবের দু পাশে যাচ্ছিল। সকলের পেছনে একজন খোঁড়া বুড়ো লোক হাঁটছিল। তার কাছে ছিল একটা হাতুড়ি, একটা বাটালি আর একটা সাঁড়াশি।
শবযাত্রাটি ভগিয়ার্দের কবরখানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেকালে প্যারিসের অন্যান্য কবরখানা থেকে ভগিয়ার্দের কবরখানার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, কারণ তার কতকগুলি নিজস্ব রীতিনীতি ছিল। প্যারিসের সব কবরখানা সন্ধ্যার সময় বন্ধ হয়ে গেলেও ভগিয়ার্দের কবরখানাটা পেতিত পিকপাসের বার্নার্দ ও বেনেডিক্ট সম্প্রদায়ের অধিকারে ছিল বলে তাদের সম্প্রদায়ের লোকরা মৃত ব্যক্তিদের সন্ধ্যার পরেও সমাহিত করার এক বিশেষ অনুমতি পায়। ভগিয়ার্দের কবরখানায় দু দিকে দুটো লোহার গেট ছিল। সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে গেট দুটোয় তালা পড়ে যেত। তখনও যদি পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের কোনও মৃত সন্ন্যাসিনীকে সমাহিত করার কাজ শেষ না হত, যদি কোনও কবরখননকারী রয়ে যেত ভেতরে তা হলে তার কাজ শেষ হলে সে দারোয়ানের কাছে গিয়ে তার বিশেষ ছাড়পত্র দেখিয়ে তবে বার হতে পারত। অথবা ছাড়পত্র না থাকলে তার নাম বলত দারোয়ানকে। তখন দারোয়ান গেটের চাবি খুলে দিত।
আমরা যে সময়ের কথা লিখছি তখন ভগিয়ার্দের কবরখানার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। এখানে-সেখানে শ্যাওলা পড়ে। তার মাঝে কোথাও কোনও ফুল ফুটত না। সমাধিস্তম্ভগুলোর উপর ইউগাছ আর লম্বা লম্বা ঘাস গজিয়ে উঠেছিল।
ভগিয়ার্দের কবরখানার গেটের কাছে এসে সেদিন যখন শবযাত্রাটা থামল তখন সূর্য অস্ত যায়নি। তাদের পেছনে ছিল ফশেলেভেন্ত। তাকে বেশ উফুল্ল দেখাচ্ছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পূর্বপরিকল্পনা মতোই সবকিছু ঘটেছে। মেরে কুসিফিকসিয়নকে বেদির তলায় সেই গোপন সমাধিগহ্বরে যথাসময়ে সমাহিত করা হয়েছে। কসেত্তেকে সেইখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যাদলেনকে খালি কফিনে শুইয়ে পেরেক এঁটে দিয়ে সেই কফিনটাকে এখানে আনা হয়েছে। একদিকে কনভেন্টের প্রধান অন্যদিকে মঁসিয়ে ম্যাদলেন–দু দিকে দুটি চক্রান্তের সঙ্গেই লিপ্ত হয়ে পড়েছে সে। যে চক্রান্ত এতক্ষণ পর্যন্ত বিনা বাধায় সম্পন্ন হয়েছে। ভলজাঁ শান্তভাবে কফিনের মধ্যে আছে দেখে তাদের চূড়ান্ত সাফল্য সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ রইল না ফশেলেভেন্তের মনে। আর যা কিছু তার করার আছে তা অতি তুচ্ছ ব্যাপার। এর আগে প্রায় একডজনবার কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েনকে মদ খাইয়ে মাতাল করে তুলেছে। সে তার পকেটে। সে তাকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারবে। এ বিষয়ে তার কোনও চিন্তা-ভাবনা নেই।
গেটে এসে সমাধি দেবার ছাড়পত্র দেখাতে হল দারোয়ানকে। আসার পথে একজন অপরিচিত লোক অংশগ্রহণ করে শবযাত্রায়। সে ফশেলেভেন্তের পাশে পাশে পথ হাঁটছিল।
ফশেলেভেন্ত একসময় লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে?
লোকটা উত্তর করল, কবরখননকারী।
ফশেলেভেন্ত আশ্চর্য হয়ে বলল, পিয়ের মেস্তিয়েন তো কবরখননকারী।
লোকটা বলল, আগে তাই ছিল।
তার মানে কী বলতে চাইছ তুমি?
সে মারা গেছে।
এই দুঃসংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিল না ফশেলেভেন্ত।
সে এটা কোনওক্রমেই আশা করতে পারেনি। সে ভাবতেই পারেনি যে লোক সব মৃতদেহের জন্য কবর খোড়ে, সে মারা যাবে। তবু তার মৃত্যু ঘটেছে।
ফশেলেভেন্তু হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার যেন কথা বলার শক্তি নেই। তার মুখ থেকে শুধু বেরিয়ে এল, অসম্ভব।
কিন্তু এটা সত্যি।
ফশেলেভেন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, কিন্তু পিয়ের মেস্তিয়েন চিরকাল কবর খুঁড়ে আসছে। লোকটা বলল, আর খুঁড়বে না। নেপোলিয়নের পর যেমন অষ্টাদশ লুই, মেস্তিয়েনের পর তেমনি গ্রিবার। আমার নাম গ্রিবার।
ফশেলেভেন্ত গ্রিবারের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রিবারের চেহারাটা লম্বা আর রোগা। তার মুখটা গম্ভীর ধরনের। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন ডাক্তার হতে না পেরে কবরখননকারী হয়েছে। ফশেলেভেন্ত হাসতে লাগল। সে বলল, তা হলে বেচারা মেস্তিয়েন মারা গেল। কিন্তু পিয়ের লেনয়ের বেঁচে আছে। তাকে চেন? এক জগ ভালো লাল মদ নিয়ে সব সময় বসে আছে। পিয়ের মেস্তিয়েনের জন্য দুঃখ হয়। সে জীবনটাকে ভোগ করেছে। তুমিও বন্ধু জীবনকে ভোগ কর। চল, দু জনে কিছুক্ষণ মদ খাওয়া যাক।
লোকটা বলল, আমি লেখাপড়া শিখেছি, আমি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। আমি মদ খাই না।
শবযাত্রা আবার এগিয়ে চলতে লাগল। কবরখানার বড় রাস্তাটা ধরল। ফশেলেভেন্ত পিছিয়ে পড়ল। দুর্বলতার সঙ্গে মানসিক উত্তেজনার জন্য হাঁটতে পারছিল না ঠিকমতো। সে আবার গ্রিবারের দিকে তাকাল। গ্রিবার লোকটা বয়সে যুবক হলেও তাকে বুড়োর মতো দেখাচ্ছে। তার চেহারাটা রোগা হলেও বেশ শক্ত।
