তা হলে তাতে তোমাকে কিছু ভরতে হবে।
অন্য কোনও মৃতদেহ? পাব কোথায়?
একটা জীবন্ত দেহ।
কী বলতে চাইছ তুমি?
ভলজাঁ বলল, কেন, আমাকে।
ফশেলেভেন্ত তার চেয়ার থেকে এমনভাবে লাফ দিয়ে উঠল যেন তার তলায় একটা বোমা ফেটেছে। আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি!
শীতের মেঘলা আকাশ থেকে মেঘ ভেঙে বেরিয়ে আসা একফালি বিরল সূর্যালোকের মতো একটুখানি হাসি ফুটে উঠল ভলজাঁ’র মুখে। সে বলল, তুমি যখন বলেছিলে মেরে কুসিফিকসিয়ন মারা গেছে তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম পিয়ের ম্যাদলেন জীবন্ত সমাহিত হবে। তাই হবে।
আপনি আসলে ঠাট্টা করছেন। এটা আপনার মনের কথা নয়।
হ্যাঁ, আমার মনের কথাই বলছি। এ বিষয়ে আমরা দু জনেই একমত হয়েছিলাম যে আমাকে এখান থেকে অদৃশ্য অবস্থায় বেরিয়ে যেতে হবে। তার জন্য তোমাকে একটা ঝুড়ি আর দড়ির খোঁজ করতে বলেছিলাম। এখন তা পেয়ে গেলাম। ঝুড়ির বদলে কফিন পেলাম আর দড়ির বদলে কালো শবাচ্ছাদন।
কালো নয়, সেটা সাদা।
ঠিক আছে, সাদা।
আপনি একজন সাধারণ লোক নন পিয়ের ম্যাদলেন।
ফশেলেভেন্ত জানত জেলের কয়েদিরা মরিয়া হয়ে এইভাবে কৌশলে পালায়; কিন্তু জেলখানার শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশের মধ্যে থেকে কিভাবে এ কাজ সম্ভব হবে তা সে বুঝে উঠতে পারল না। তার মনে হল যে র্যু সেন্ট ভেনিসের রাস্তার ধারে খালে একটা বককে মাছ ধরতে দেখেছে।
জাঁ ভলজাঁ বলল, আমাকে যেমন করে তোক অদৃশ্যভাবে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে এবং এটাই হল একমাত্র উপায়। কিন্তু খালি কফিনটাকে কোথায় পাওয়া যাবে? কোথায় সেটা থাকবে?
গির্জায় মৃতদেহ রাখার ঘরে যেটাকে মচুয়ারি চেম্বার বলা হয় তার উপর একটা শবাচ্ছাদন থাকবে।
সেটা কতটা লম্বা?
ছয় ফুট।
ঘরটা কোথায় তা বল।
বাগানের ধারে একটা বাড়ির একতলায় হল ঘরটা। লোহার রড দিয়ে ঘেরা একটা জানালা আছে বাগানের দিকে আর দু দিকে দুটো দরজা আছে–একটা রাস্তার দিকে, আর একটা গির্জার দিকে।
এই দুটো দরজার চাবি তোমার কাছে আছে?
না, শুধু গির্জার দিকের দরজার চাবি আমার কাছে আছে। অন্য দরজার চাবি আছে দারোয়ানের কাছে।
সে চাবি কখন খোলে সে?
শুধু শববাহকরা বাইরে থেকে কফিন নিয়ে যাবার জন্য এলে দরজার তালা খোলে। তারা কফিন নিয়ে চলে যেতে আবার বন্ধ করে দেয় দরজাটা।
কে পেরেক আঁটে কফিনে?
আমি।
আর তুমিই শবাচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দাও কফিনটাকে?
হ্যাঁ।
তুমি একা থাকবে?
হ্যাঁ, পুলিশের লোক, ডাক্তার আর শববাহকরা ছাড়া বাইরের কোনও লোক ঢুকতে পারে না। দরজার উপর তা লেখা আছে।
রাত্রিতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তুমি ঘরটার মধ্যে একজনকে লুকিয়ে রাখতে পারবে?
ঘরটায় নয়, তার পাশে ছোট্ট একটা ঘর আছে যেখানে আমি আমার যন্ত্রপাতি রাখি। সে ঘরের চাবি আমার কাছে আছে।
আগামীকাল শববাহকরা বাতিদান নিয়ে কখন আসবে?
কাল বিকাল তিনটেয়। ভগিয়ার্দের কবরখানায় কফিনটা সমাহিত হবে সন্ধ্যার আগে। এখান থেকে কিছুদূরে জায়গাটা।
আমাকে তা হলে সারারাত এবং অর্ধেক দিন সেই ছোট্ট ঘরটার মাঝে থাকতে হবে। তা হলে আমার খাবার চাই।
আমি তোমাকে কিছু খাবার দেব।
তুমি কাল বেলা দুটোর সময় আমার কফিনে পেরেক এঁটে দেবে।
ফশেলেভেন্ত আবার চেয়ারে বসে পড়ে বলল, অসম্ভব। বাজে।
একটা কফিনে কতকগুলি পেরেক আঁটা কী এমন কঠিন কাজ? ফশেলেভেন্তের কাছে যেটা অসম্ভব ও অকল্পনীয় ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল, ভলজাঁ’র কাছে সেটা একসঙ্গে সরল এবং সহজ ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল। এর থেকে আরও অনেক খারাপ ঘটনার কথা জানে সে। যারা দীর্ঘদিন জেলে থাকে তারা পালাতে গিয়ে যে কোনও বস্তুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে। কয়েদিদের কাছে পালানোর ব্যাপারটা এক গুরুতর অসুখের মতো, যা হয় সেরে যায় অথবা মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এই রোগ সারাবার জন্যই কয়েক ঘণ্টা পেরেক আঁটা কফিনের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হবে। সে ক্ষমতা আছে ভলজাঁর। যাজক অস্টিন কাস্তিলেদো বলতেন সিংহাসনচ্যুতির পর পঞ্চম চার্লস লা প্পন্বেকে শেষবারের মতো দেখতে যান কফিনের মধ্যে শুয়ে। তাঁকে সেন্ট জন চার্চে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন।
ফশেলেভেন্তের এতক্ষণে হুঁশ হল। বলল, কিন্তু কী করে তুমি নিশ্বাস নেবে? ভাবতেও ভয় লাগছে আমার।
আমার মুখের কাছে ঢাকনার উপর কয়েকটা ছিদ্র করে দেবে। আর ঢাকনাটা খুব বেশি আঁট করে বন্ধ করবে না।
ঠিক আছে। কিন্তু তুমি যদি হাঁচ বা কাশ?
পলাতক কয়েদি কখনও হাঁচে-কাশে না। এসব ক্ষেত্রে আমাদের শক্ত হয়ে থাকতে হয়। হয় আমাকে এখানে ধরা পড়তে হবে অথবা ওখানে কফিনের ভেতর ঢুকে যেতে হবে।
কোনও বিড়াল যেমন খোলা দরজার ভেতর দিয়ে ঘরে ঢোকার আগে ইতস্তত করতে থাকে তেমনি অনেক সদাসতর্ক ব্যক্তি আছে যারা কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মুহূর্তে ভাবতে থাকে। এই সব ব্যক্তি সাহসী লোকদের থেকে বেশি বিপদের ঝুঁকি নেয়। ফশেলেভেন্ত ছিল এই ধরনের এক ব্যক্তি। কিন্তু ভলজাঁ’র অবিচলিতচিত্ততা তাকে বেশি ভাবিয়ে তুলঁল। সে বলল, আমিও তাই মনে করি। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
ভলজাঁ বলল, আমি শুধু ভাবছি কবরখানায় কী হবে?
ফশেলেভেন্ত বলল, সেটা কোনও সমস্যা নয়। তুমি যদি কফিনের মধ্যে টিকে থাকতে পার তা হলে আমি তোমাকে কবর থেকে ঠিক বার করব। কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েন একজন বৃদ্ধ মাতাল লোক, সে আমার পরিচিত। তাকে সহজেই বশে আনা যাবে। সেখানে কী হবে আমি তোমাকে আগেই বলে দিতে পারি। আমরা সেখানে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছব অর্থাৎ কবরখানা বন্ধ হবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। শববাহকেরা তোমার কফিনটা বয়ে নিয়ে যাবে যখন, তখন আমি তাদের পিছু পিছু যাব। আমার পকেটে কিছু যন্ত্রপাতি থাকবে। কফিনে দড়ি বেঁধে ওরা কফিনটাকে কবরের মধ্যে নামাবে। তার পর প্রার্থনা হবে, যাজক পবিত্র শান্তিজল ছিটোবে, ক্রস আঁকবে। তার পর ওরা সবাই চলে যাবে, থাকবে শুধু পিয়ের মেস্তিয়েন আর আমি। সে আমার বন্ধু, সে কথা আগেই বলেছি। সে হয় আগে থেকেই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকবে আর যদি তা না হয় তা হলে তাকে বলব, একগ্লাস মদ পান করে নাও দোকান খোলা থাকতে। তাকে আমি ঠিক মাতাল করে তুলঁব, কারণ সে সব সময়ই অর্ধমাতাল হয়ে থাকে। তাকে আমি কবরখানার প্রতীক্ষাগারে টেবিলের তলায় শুইয়ে একা কবরে চলে যাব। সে মাতাল হয়ে উঠলে আমি তখন তাকে বলব, তুমি বাড়ি যাও। আমি তোমার সব কাজ করে দেব। তা হলে আমি কবরখানায় একা থাকব এবং তোমাকে কবর থেকে সহজেই বার করব।
