খোঁড়া হওয়াটা পাপ নয়। সম্রাট দ্বিতীয় হেনরি খোঁড়া ছিলেন। কেউ প্রতিবাদ করেনি। অষ্টম বেনেডিক্টকেও লোকে একই সঙ্গে সেন্ট আর খোঁড়া বলত।
একই সঙ্গে খোঁড়া আর সেন্ট হওয়া ভালো। আমি আবার কানেও কম শুনি।
তোমাকে পুরো এক ঘণ্টা সময় দেওয়া উচিত। এগারোটা বাজলেই তুমি শাবল নিয়ে চলে আসবে। দুপুররাতে প্রার্থনা শুরু হবে। তার আগেই কাজ সারতে হবে। পুরো এক ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে।
আপনাদের ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতি আমার ভক্তি কতখানি তা প্রমাণ করার জন্য আমি যথাশক্তি চেষ্টা করব। আমি সবকিছু বুঝে নিয়েছি এবং এগারোটা বাজলেই গির্জায় চলে আসব। মেরে অ্যাসেনশান এবং মাদাররা থাকবেন। দু জন পুরুষই যথেষ্ট এ ব্যাপারে। তবে আমি অবশ্যই একটা শাবল আনব। কফিনে পেরেক এটে আমি সমাধির মুখটা খুলব। তার পর কফিনটা সমাধিগহ্বরে নামিয়ে মুখটা আবার বন্ধ করে দেব। এমনভাবে মুখটা বন্ধ করে দেব যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। সরকার কোনও সন্দেহ করতে পারবে না। তা হলে সব কিছু ঠিক হয়ে গেল মাদার।
না, সবকিছু ঠিক হয়নি।
আবার কী বাকি আছে?
আর একটা খালি কফিন বাইরে থেকে আনা হবে। সেটা নিয়ে আমরা কী করব পিয়ের ফভেন্ত?
এবার দু জনেই চুপচাপ ভাবতে লাগল।
তার পর ফশেলেভেন্ত বলল, সে কফিনটা বাইরের সমাধিভূমিতে নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়া হবে।
কিন্তু খালি অবস্থায়?
আমি কফিনটাতে পেরেক এঁটে দিয়ে তার উপর চাদর ঢাকা দিয়ে দেব।
কিন্তু শববাহকরা সেটা বয়ে নিয়ে যাবার সময় এবং সমাধির ভেতর সেটা নামাবার সময় কফিনটা হালকা দেখে বুঝতে পারবে তার মধ্যে কিছু নেই।
ফশেলেভেন্ত কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা বলা ঠিক হবে না ভেবে তা বলল না। কী বলা ঠিক হবে তা খুঁজতে লাগল মনে মনে।
অবশেষে বলল, আমি কফিনটার মধ্যে মাটি ভরে দেব। এমনভাবে মাটি ভরে দেব যাতে মনে হবে একটা মৃতদেহ আছে তার মধ্যে।
হ্যাঁ, এটা করলে ঠিক হবে। মাটি আর মানুষের দেহের মাংস একই জিনিস। কাজটা ঠিকমতো করবে কিন্তু ফভেন্ত।
নিশ্চয়, অবশ্যই তা করব।
প্রধানা এবার গম্ভীর মুখে ফশেলেভেন্তের দিকে তাকিয়ে ইশারায় চলে যেতে বলল, ফশেলেভেন্তু যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল। ঘর থেকে সে বার হতেই প্রধানা বললেন, আমি তোমার কাজে সন্তুষ্ট পিয়ের ফভেন্ত। সমাধির কাজ শেষ হয়ে গেলে আগামীকাল তোমার ভাইকে নিয়ে আসবে এবং তার নাতনিকে নিয়ে আসতে বলবে।
.
৪.
খোঁড়া লোক কানা লোকের মতো সাবধানে পা ফেলে ধীরগতিতে যায়। কনভেন্টের অফিসঘর থেকে তার বাসায় ফিরে আসতে পনেরো মিনিট সময় লেগে গেল। বাসায় ফিরে সে দেখল কসেত্তে তখন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে এবং জাঁ ভলজাঁ আগুনের ধারে বসে আছে। আরও দেখল, দেয়ালের উপর টাঙানো মালীর ঝুড়িটা দেখিয়ে ভুল কসেত্তেকে বলছিল, আমার কথা শোন বাছা। এখন আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। তবে আবার আমরা এখানেই ফিরে আসব এবং সুখেই থাকব। মালী ওই ঝুড়িতে তোমাকে চাপিয়ে পিঠে করে বাইরে বয়ে নিয়ে যাবে। একজন মহিলার কাছে সে নিয়ে যাবে তোমাকে। সে তোমার দেখাশোনা করবে। তার পর আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব। তুমি খুব শান্তভাবে থাকবে। কিন্তু কথা বলবে না। তা হলে মাদাম থেনার্দিয়ের তোমাকে ধরে ফেলবে।
কসেত্তে গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়ল।
এবার ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর ভালো তো?
সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে গেল, আবার কিছুই হয়নি। আমাদের প্রধানা কত্রীর কাছে তোমাদের নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি পেয়েছি। কিন্তু সেখানে তোমাদের নিয়ে যাবার আগে তোমাদের বেরিয়ে যেতে হবে যাতে বাইরে থেকে তোমাদের ডেকে আনতে পারি। বাচ্চা মেয়েটা অবশ্য যদি চুপ করে থাকে তা হলে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়াটা কঠিন হবে না।
ভলজাঁ বলল, সেটা আমি দেখব।
ফশেলেভেন্ত বলল, কিন্তু পিয়ের ম্যাদলেন, আপনি যে পথে যেমন করে এখানে এসেছেন সেই পথে তেমনি করে বাইরে যেতে পারবেন না?
সে ভাবল এবার ম্যালেনের কাছ থেকে একটা সদুত্তর পাবে।
কিন্তু এবারেও ভলজাঁ আগের মতোই শুধু একটা কথা বলল ‘অসম্ভব’।
ফশেলেভেন্ত তখন বলল, কিন্তু তা হলে তোমাকে বার করব কী করে এখান থেকে?
এরপর সে বিড়বিড় করে আপন মনে কী বলতে লাগল। এর ওপর আবার একটা সমস্যা এসে দেখা দিল। কফিনটার গোটাটাতে যদি মাটি ভরে দিই তা হলে সেটা খুবই ভারী হবে। আবার যদি তাতে কম করে মাটি ভরা হয় তা হলে সেটাতে মাটিগুলো নড়বে। তা হলে তারা বুঝবে ভেতরে মানুষ নেই। তারা সন্দেহ করবে।
ভলজাঁ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ফশেলেভেন্ত আপন মনে বিড়বিড় করে যা বলে যাচ্ছিল তার কিছুই সে বুঝতে পারছিল না। ফশেলেভেন্তু তখন ব্যাপারটা সব বুঝিয়ে বলল ভলজাঁকে। মৃত মাদারকে কোথায় কবর দিতে চায় তারা, খালি কফিনটা মিউনিসিপ্যালিটি থেকে সেটা পাঠানো হবে তাতে কি ভরা হবে, কিভাবে সে ভলজাঁকে তার ভাই বলে প্রধানার কাছে নিয়ে যাবার অনুমতি লাভ করেছে–এই সব কথা ভলকে খুলে বলল প্রথম থেকে। এখন খালি কফিনটা ভর্তি করাই হল প্রধান সমস্যা।
ভলজাঁ বলল, কোন কফিনের কথা বলছ তুমি?
মিউনিসিপ্যালিটির কফিন। ডাক্তার একজন সন্ন্যাসিনী মারা গেছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে। তাই শুনে মিউনিসিপ্যালিটি একটা কফিন পাঠিয়েছে এবং আগামীকাল শববাহকরা এসে কফিনটা সমাধিভূমিতে নিয়ে যাবে। কিন্তু খালি কফিনটা তুলঁলেই তারা বুঝবে তাতে কোনও মৃতদেহ নেই।
