অস্বস্তিবোধ করতে লাগল ফশেলেভেন্ত।
প্রধানা আবার বলে যেতে লাগলেন, ধর্মপ্রতিষ্ঠানের লোকদের ইচ্ছামতো সমাহিত হবার অধিকার একমাত্র কুপথে চালিত নিরীশ্বর ও নাস্তিক লোকরাই মানতে চায় না। আমরা এখন দারুণ গোলমালের মধ্যে জীবনযাপন করছি। এখানকার লোকেরা যেটা তাদের জানা উচিত তা জানে না আর যেটা জানা উচিত নয় সেইটা জানে। এখনকার সমাজের মানুষগুলো বড় স্কুল প্রকৃতির। তারা সবাই অসাধু। তারা এতদূর অধার্মিক যে তারা মোড়শ লুই-এর বধ্যভূমিটাকে যিশু খ্রিস্টের ক্রসের সঙ্গে তুলঁনা করে। কিন্তু লুই ছিলেন শুধু একজন রাজা। আমাদের এখন ঈশ্বরের কথা ভাবতে হবে। ভলতেয়ারের কথা এখন সবাই জানে, কিন্তু সিজার দ্য বুসের কথা কেউ জানে না। অথচ সিজার দ্য বুস হলেন একজন ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য পুরুষ, আর ভলতেয়ার একজন অভিশপ্ত মানুষ। ভূতপূর্ব আর্কবিশপ কার্ডিনাল দ্য পেরিগর্দ জানতেন না যে শার্লস দ্য কলজেন বেরুলের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি আবার ফ্রাসোয়া বুর্গয়েন কনট্রেনের স্থলাভিষিক্ত হন। আবার সেন্ট মার্থের ফাদার বুর্গায়েনের স্থলাভিষিক্ত হন। এরা সবাই ভালো বাগী। হুগোনত রাজা চতুর্থ হেনরি পিয়ের কটনের ওপর এক নোংরা মন্তব্য করেন বলে তাঁর কথা সবাই জানে, কিন্তু তিনি যে এক ধর্মপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তা কেউ জানে না। দু-একজন যাজক কখনও কোনও ভুল করে বসলেই সব যাজককে খারাপ ভাবতে হবে। মার্তিন দ্য তুর্গ ছিলেন এমনই এক সেন্ট যিনি তার পোশাকের আধখানা অনেক সময় গরিবদের দান করতেন। সেন্টরা কত সহ্য করেন তা কেউ দেখতে পায় না। সত্যের প্রতি মানুষ চিরকালই অন্ধ। কেউ একবার স্বর্গ ও নরকের কথা ভাবে না। মানুষ কত দুষ্ট প্রকৃতির হয়ে গেছে! রাজার নামে কোনও কথা বলা মানেই বিপ্লবের নামে কোনও কিছু বলা। রাজার কোথায় কী কর্তব্য, মৃতদের প্রতিই-বা রাজার কর্তব্য কী, তা কেউ জানে না। ধর্মপূতঃ পরিবেশে মরাটাও যেন নিষিদ্ধ, মৃতকে সমাহিত করার ব্যাপারটাও যেন একটা নাগরিক এবং রাজনৈতিক ব্যাপার। এটা ঈশ্বরের প্রতি, ধর্মের প্রতি একটা বিদ্রোহ। দ্বিতীয় সেন লি পিয়ের নোতেয়ার আর ভিসিগথের রাজার কাছে দুটি চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি মৃতকে সমাহিত করার ব্যাপারে সম্রাটের কর্তৃত্ব এবং অধিকারকে অস্বীকার করেন। তাঁর আদেশ অমান্য করেন। এবং এই একই ব্যাপারে শ্যালনের বিশপ গতিরের বার্গান্ডি ডিউক ওটোর আদেশ অমান্য করেন। অতীতে রাজনীতির ওপর ধর্ম ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানের একটা প্রভাব ছিল। আব্বে দ্য সিতো বার্গান্ডির পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। আমরা বরাবর আমাদের বিবেচনা এবং ইচ্ছামতো মৃতদেহ সমাহিত করে এসেছি। সেন্ট বেনেডিক্ট নিজে ৫৪৩ সালে ইতালির মন্টি ক্যাসিনোতে মরদেহ ত্যাগ করলেও তাকে ফ্লাক্সের আব্বায়ে দ্য ফুরি-তে সমাহিত করা হয়। যারা নাস্তিক, যারা অধার্মিক তাদের অবশ্যই আমি ঘৃণা করি ঠিক, কিন্তু যারা সমাধির ব্যাপারে চার্চের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চায়, চার্চের অধিকারকে অস্বীকার বা খর্ব করতে চায় তাদের আমি আরও বেশি ঘৃণা করি।
কথা বলা শেষ করে প্রধানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফশেলেভেন্তের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তা হলে রাজি আছে তো পিয়ের ফভেন্ত?
হ্যাঁ, রাজি আছি শ্রদ্ধেয়া মাতা।
আমরা তা হলে নির্ভর করতে পারি তোমার ওপর?
আমি আপনাদের আদেশ পালন করে চলব, কারণ আমি কনভেন্টের সেবক।
ঠিক আছে। তুমি কফিনটাকে বন্ধ করে এঁটে দেবে আর সিস্টাররা সেটাকে গির্জায় বয়ে নিয়ে যাবে। তার পর মৃতের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন হবে। প্রার্থনা শেষ হলে রাত্রি এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে তুমি লোহার শাবল নিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হবে। সবকিছুই বিশেষ গোপনে সম্পন্ন করতে হবে। শুধু চারজন মাদার আর তুমি থাকবে গির্জায়।
ফশেলেভেন্ত বলল, গির্জায় আর একজন থাকবেন। তিনি হলেন একজন সিস্টার যিনি প্রায়শ্চিত্তের জন্য প্রার্থনা করতে থাকবেন।
সে তার ঘাড় ঘোরাবে না।
কিন্তু তিনি সেকথা শুনতে পাবেন।
সে শুনবে না। তাছাড়া সে তো কনভেন্টের লোক। কনভেন্টের কথা যেন বাইরে না যায়।
একটু চুপ করে থাকার পর প্রধানা আবার বললেন, আজ তোমাকে আর ঘণ্টা পরতে হবে না। প্রায়শ্চিত্তকারিণী সিস্টারকে তোমার উপস্থিতির কথা আর জানাতে হবে না।
আপনি যা বলছেন তাই হবে মাদার।
হ্যাঁ।
ডাক্তার এসেছিলেন?
তাঁকে ডাকার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল। তিনি চারটের মধ্যেই এসে পড়বেন। কিন্তু তুমি আমার ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাওনি?
আমি শুধু আমাকে ডাকার ঘণ্টা শুনতে পাই।
তা ভালো।
একটা ছ ফুট লম্বা শাবল আমার দরকার মাদার।
কোথায় সেটা পাবে তুমি?
বাগানে অনেক লোহার রড় পড়ে থাকে। তার থেকে একটা শাবল বেছে নেওয়া কষ্টকর হবে না।
রাত্রি বারোটা বাজার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে তোমাকে আসতে হবে। ভুলো না যেন।
আর একটা কথা শ্রদ্ধেয়া মাদার।
বলে ফেল।
যদি এই ধরনের কাজ আপনার থাকে তা হলে বলতে পারেন। আমার ভাই খুবই বলিষ্ঠ।
কাজটা তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।
কিন্তু আমি তো তাড়াতাড়ি কোনও কাজ করতে পারি না। আমার বয়স হয়েছে। তার ওপর আমি খোঁড়া।
