তা হলে সে কফিনেই আমাকে পেরেক আঁটতে হবে।
হ্যাঁ।
আর কে কে থাকবে?
চারজন মাদার তোমাকে সাহায্য করবেন।
কিন্তু কফিনে পেরেক আঁটতে তাদের দরকার হবে না আমার।
কিন্তু কফিনটাকে নামাতে দরকার হবে।
নামাতে হবে? কোথায়?
সেই গহ্বরটার ভেতরে।
ফশেলেভেন্ত চমকে উঠল। তার পর বলল, বেদির তলায় সেই গহ্বরটায়? কিন্তু—
তোমাকে একটা শাবল দেওয়া হবে।
তা অবশ্য বটে! কিন্তু—
মৃতের ইচ্ছাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে অবশ্যই পালন করতে হবে। এটাই ছিল মেরে কুসিফিকসিয়নের অন্তিম কামনা। তিনি বলেছিলেন যে সমাধিভূমি অধর্মাচারীদের দ্বারা কলুষিত সেখানে যেন তাঁকে সমাহিত করা না হয়। তাঁকে যেন সমাহিত করা হয় সেই বেদির তলদেশে যেখানে কুড়ি বছর ধরে প্রার্থনা আর উপাসনা করে এসেছেন তিনি। তিনি আমাদের কাছে এই কামনাই প্রকাশ করেছিলেন এবং এ কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
কিন্তু এ কাজ তো নিষিদ্ধ মাদার।
মানুষের দ্বারা নিষিদ্ধ, কিন্তু ঈশ্বরের অনুমতিসিদ্ধ।
কিন্তু কথাটা যদি জানাজানি হয়ে যায়?
আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি।
আমাকে? আমি দেয়ালের একটা পাথরের মতো। কিন্ত–
আমি প্রার্থনাসভায় সমবেত মাদারদের সঙ্গে আলোচনা করেছি এ নিয়ে। আমরা সকলে মিলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে মেরে কুসিফিকসিয়নকে তাঁর শেষ ইচ্ছানুসারেই সমাহিত করা হবে। একবার ভেবে দেখ ফভেন্ত, এর থেকে কত রহস্যময় সুফল লাভ করা যেতে পারে। এর দ্বারা আমাদের ধর্মসম্প্রদায় কত গৌরব অর্জন করতে পারে। যতসব ঐন্দ্রজালিক অতিপ্রাকৃত ঘটনা সমাধিস্তম্ভতেই ঘটে।
কিন্তু মাদার, স্বাস্থ্যদপ্তরের কমিশনার যদি
এই সমাধির ব্যাপারে সেন্ট দ্বিতীয় বেনেডিক্ট কনস্তান্তিন পোগোলাতের আদেশ অমান্য করেছিলেন।
যদি পুলিশ কমিশনার–
কলোদেমেয়ার নামে একজন জার্মান রাজা যিনি কনস্তান্তিনের রাজত্বকালে গলদের পক্ষে যোগদান করেন তিনি একথা স্বীকার করেছিলেন যে ধর্মসম্প্রদায়ের লোকদের ধর্মস্থানেই সমাহিত হবার অধিকার আছে। তার মানেই বেদির তলায়।
পুলিশ বিভাগের যদি কোনও ইন্সপেক্টর—
ধর্মের কাছে পৃথিবীর কোনও দাম নেই। কার্থেজদের একাদশতম সেনাপতি মার্টিন একবার লাতিন ভাষায় বলেছিলেন, পৃথিবী চিরকাল ঘুরতে থাকবে, কিন্তু ক্রস এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে।
ফশেলেভেন্ত বলল, আমেন, লাতিন ভাষায় বলা কথা যখন, তখন তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই। আমার মনের সব সংশয় দূর হয়ে গেল।
কোনও মানুষ দীর্ঘকাল কথা না বলার পর যদি কোনও শ্রোতা পায় তা হলে কথা বলতে বলতে আর থামতে চায় না। জিমনাসততারাস নামে একজন বাগ্মী কারাগার থেকে দীর্ঘদিন পর মুক্তি পেয়ে যেসব যুক্তি ও চিন্তা সঞ্চিত ছিল তা প্রকাশ করার কোনও লোক না পেয়ে একটা গাছকেই উদ্দেশ্য করে বোঝাতে থাকেন। কনভেন্টের প্রধানা কত্রী তেমনি দীর্ঘদিন ধরে মনের মধ্যে স্থূপীকৃত কথার রাশি প্রকাশ করতে না পেরে এখন সুযোগ পেয়ে সে সব কথা ঢেলে দিতে লাগলেন। বাঁধভাঙা অবরুদ্ধ জলরাশি যেন হঠাৎ ছাড়া পেয়ে ঝরে পড়তে লাগল অবাধে।
আমার ডান হাতে আছে বেনেডিক্ট আর বাঁ হাতে আছে বার্নার্দ। কে এই বার্নার্দ?
এই বার্নার্দ? তিনি ছিলেন ক্লেয়ারভয়ের চার্চের প্রথম অধ্যক্ষ। বার্গান্ডির ফতেনে ছিল তাঁর জন্মভূমি। তাঁর জন্মস্থান হিসেবে সে জায়গা ধন্য হয়ে আছে আজও। তাঁর পিতার নাম তেয়সলিন এবং মার নাম অ্যাশিথিয়া। তিনি তাঁর ধর্মজীবন শুরু করেন সিটোতে আর সে জীবন শেষ করেন ক্লেয়ারভয়ে। তিনি সাতশো শিক্ষানবিশকে শিক্ষাদান করেন। এবং একশো ষাটটি গির্জা ও ধর্মপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। শ্যালনের বিশপ গিলমদ্য শ্যাম্পো তাঁকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৪০ সালে রেইম-এর ধর্মসভায় তিনি সব ছদ্মবেশী কপট শয়তানদের পরাজিত করেন। তিনি রাজাদের মধ্যে সব মতভেদ দূর করেন। যুবক রাজা লুইকে সৎপথে চালিত করেন। পোপ তৃতীয় ইউসেনকে পরামর্শ দান করে। এইভাবে তিনি একই সঙ্গে ধর্ম ও রাজনৈতিক জগতের মধ্যে তার প্রভাব বিস্তার করেন। ক্রুসেডের সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে ধর্মপ্রচার করেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আড়াইশো অলৌকিক ক্রিয়া প্রদর্শন করেন। একবার একদিনের মধ্যে এই ক্রিয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ঊনচল্লিশটি।
বেনেডিক্ট কে ছিলেন? তিনি ছিলেন মন্তি ক্যাসিনোর ফাদার। তিনি যে ধর্মসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর সেই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং নির্দেশাবলি মান্য করে চল্লিশটি পোপের সৃষ্টি হয়েছে। তার থেকে বেরিয়ে এসেছে দুলোজন কার্ডিনাল, পঞ্চাশজন ফাদার, মোলোশশা আর্কবিশপ, সাড়ে চার হাজার বিশপ, চারজন সম্রাট, বারোজন সম্রাজ্ঞী, ছেচল্লিশজন রাজা, একচল্লিশজন রানি, তিন হাজার ছোেজন সেন্ট এবং তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ও নিয়মাবলি চৌদ্দশো বছর ধরে চলে আসছে। একদিকে আছেন। বেনেডিক্ট আর একদিকে বার্নার্দ। আমাদের অন্য কোনও শাসকের প্রয়োজন নেই। আমাদের কথা রাজ্যের মানুষরা একবার ভেবে দেখে না। আমাদের দেহের মাটি ঈশ্বরকে দান করার অধিকারও আমাদের নেই। স্বাস্থ্যের কথাটা তুলেছে বিপ্লবীরা। এটা তাদের আবিষ্কার। ঈশ্বরকে এখন পুলিশ কমিশনারের অধীন করে তোলা হয়েছে। এই হল আমাদের দেশ। কোনও কথা কাউকে বলবে না ফশেলেভেন্ত।
