তা হলে তখন বাতাসটা আমার দিকে বইছিল না।
যিনি মারা গেছেন তিনি হলেন মাদার কুসিফিকসিয়ন। স্মরণীয় মহিলা।
প্রধানা কত্রী আবার নীরব হয়ে গেলেন। তার পর আবার বলতে লাগলেন, তিন বছর আগে জেসসেনীয়পন্থী মাদাম দ্য বেথুন মেরে কুসিফিকসিয়নের ভক্তি আর উপাসনার নিবিড়তা দেখে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন।
এবার আমি বুঝতে পেরেছি মাদার। আমি ঘণ্টাধ্বনিও শুনতে পাচ্ছি।
তাঁর মৃতদেহ চ্যাপেলসন্নিহিত মৃতদেহ রাখার ঘরের মধ্যে রাখা হয়েছে।
আমি তা জানি।
তুমি ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সে-ঘরে প্রবেশাধিকার নেই। কাউকে সে অধিকার দেওয়াও হবে না। সে ঘরে অন্য কোনও পুরুষ ঢুকলে কী হবে জান?
যদি প্রায়ই ঢোকে।
তার মানে?
তার মানে যদি প্রায়ই তাকে এ অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু আমি তো বলিনি।
আমি আপনাদের কথা সমর্থন করতেই চাই। শুধু বোঝাতে পারছি না।
আমিও বুঝতে পারছি না।
এমন সময় নটার ঘণ্টা বাজল।
প্রধানা কর্জী তা শুনে বললেন, এই বেলা নটায় এবং প্রতিটি প্রহরে আমাদের ভক্তি এবং উপাসনা চলবে অব্যাহত গতিতে।
ফশেলেভেন্ত বলল, ‘আমেন’ অর্থাৎ তথাস্তু।
ঘণ্টাধ্বনিটা এক অপ্রীতিকর জটিল অবস্থার জাল থেকে তাদের দু জনকেই উদ্ধার করল। তাদের চিন্তা অন্যদিকে চলে গেল। ফশেলেভেন্তু তার কপালে হাত দিল।
প্রধানা কত্রী বললেন, মেরে কুসিফিকসান তার জীবদ্দশায় অনেককে ধর্মান্তরিত করেছেন। এখন মৃত্যুর পর তিনি অনেক ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া দেখাবেন।
এ কথার পুনরাবৃত্তি করে ফশেলেভেন্ত বলল, তিনি অনেক ঐন্দ্রজালিক কাজ দেখাবেন।
প্রধান কী বলতে লাগলেন, মেরে কুসিফিকসানকে পেয়ে আমাদের সম্প্রদায় অনেক ধন্য হয়েছে। কার্ডিনাল দ্য বেরুল যেমন প্রার্থনা করতে করতে মারা যান, তেমন ভাগ্য অবশ্য সবার হয় না। ক্রুসিফিকসানেরও এই সৌভাগ্য হয়নি। তবু কিন্তু তাঁর মৃত্যুটাও খুব সুন্দরভাবে হয়। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার জ্ঞান ছিল। তিনি আমাদের সঙ্গে ও দেবদূতদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি তাঁর শেষ উপদেশের কথাগুলো বলে যান আমাদের। পিয়ের ফভেন্ত, তোমার যদি একটু বিশ্বাস থাকে এবং তুমি যদি মৃত্যুকালে তাঁর পাশে থাকতে তা হলে তিনি তোমার খোঁড়া পা-টাকে স্পর্শ করে সারিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। আমরা বেশ বুঝতে পারলাম, তিনি ঈশ্বরের মধ্যে নবজীবন লাভ করেছেন। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গলাভ করেছেন তিনি।
ফশেলেভেন্ত বলল, আমেন।
এরপর সে নীরবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রধানা মালা জপ করতে লাগলেন। তার পর একসময় বললেন, শোন পিয়ের ফভেন্ত, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুকালীন ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। এ বিষয়ে আমি অনেক ধর্মযাজকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি এমন সব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি যারা ধর্মের কাজে জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং তাতে পরম আধ্যাত্মিক সম্পদ লাভ করেছেন।
ফশেলেভেন্ত বোকার মতো বলল, আপনি জানেন মাদার এখান থেকে চার্চের ঘণ্টা যেমন শোনা যায়, বাগান থেকে তেমন যায় না।
প্রধানা তার আগেকার কথাটার জের টেনে বললেন, তাছাড়া তিনি সাধারণ মহিলা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সেন্ট। ঠিক আপনার মতো শ্রদ্ধেয়া মাদার।
আমাদের পরম ধর্মীয় পিতা পোপ সপ্তম পায়াসের অনুমতি নিয়ে তিনি কুড়ি বছর কফিনের মধ্যে নিদ্রাভিভূত অবস্থায় ছিলেন।
যে পোপ বোনাপার্টের রাজ্যাভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
ফশেলেভেন্তের মতো একজন বোকা লোকের পক্ষে একথাটা বলা সত্যিই আশ্চর্যজনক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে প্রধানা কী তখন অন্য চিন্তায় মগ্ন ছিলেন বলে তার কথাটাই শুনতে পাননি।
প্রধানা কর্তী আবার বলতে লাগলেন, কাঁপাদোসিয়ার আর্কবিশপ সেন্ট দিওদোর তার সমাধিস্তম্ভের উপর শুধু একটা কথাই খোদাই করে রাখতে বলেছিলেন। সে কথা হল ‘আকারাস’ অর্থাৎ মাটির পোকা এবং তাই করা হয়েছিল। এটা কি ঠিক নয়?
হ্যাঁ, শ্রদ্ধেয়া মাদার।
অ্যাকুইনা গির্জার অধ্যক্ষ মোজাকে ফাঁসিকাঠের তলায় সমাহিত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন এবং তার তা-ই করা হয়েছিল।
হ্যাঁ, সত্যি কথা।
টাইবার নদীর মুখের কাছে যিনি বাস করতেন সেই অস্তিয়ার বিশপ সেন্ট তেরেন্স। মৃত্যুর আগে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভের উপর পিতৃহত্যার একটা প্রতীক খোদাই করা থাকবে, যাতে পথিকরা তাঁর স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় থুতু ফেলে তাঁর আত্মার উদ্দেশে। তাই করা হয়েছিল। মৃতের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত।
তা বটে।
ফ্রান্সে রোশে আবেলের কাছে বানৰ্দি গিদোলিস জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্পেনের অন্তর্গত তু-এর বিশপ। তাঁর নির্দেশমতো এবং কাস্তিলের রাজার বিরোধিতা সত্ত্বেও মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য ডোমিনিকান চার্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একথা কেউ অস্বীকার করতে পারে? প্লানতেভিচ দ্য লা ফসি এ ঘটনার সত্যতা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন।
তা হলে একথা সত্য হবেই মাদার।
আবার মালা জপ করতে লাগলেন প্রধানা।
একসময় তিনি বললেন, পিয়ের ফভেন্তু, মেরে কুসিফিকসিয়ন যে কফিনে কুড়ি বছর ধরে নিদ্রাভিভূত ছিলেন সেই কফিনেই তাকে সমাহিত করা হবে।
ঠিক বলেছেন মাদার।
এই সমাধিই হবে তাঁর নিদ্রার প্রসারিত রূপ।
