কিন্তু অনেককিছু জানলেও কোনও কথা কখনও কারও কাছে বলেনি, কোনও কিছু প্রকাশ করেনি ফশেলেভেন্ত। এখানেই ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। কনভেন্টের সকলেই তাকে বোকা-বোকা ভাবত আর এই বোকা বোকা ভাবটা ধর্মসম্প্রদায়ের পক্ষে একটা বড় গুণ। কনভেন্টের মাদাররা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। তাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করত। তাছাড়া সে নিয়মিত কাজ করে যেত। একদিনের জন্যও কাজে সে অবহেলা করেনি, কোনওদিন অনুপস্থিত হয়নি। একমাত্র বাগানের কাজ ছাড়া সে বাইরে কোথাও যায়নি কখনও। মাত্র দুটি লোকের সঙ্গে তার একটু বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা হল কনভেন্টের দারোয়ান আর কবর-খনকারী। তাদের কাছ থেকেও অনেক কথা জানতে পারত সে। সে যেন সব সময় সন্ন্যাসিনীদের একই সঙ্গে জীবন এবং মৃত্যুর আলোকে বিচার করে দেখত। কিন্তু তাদের সম্বন্ধে যা-ই ভাবুক না কেন, তাদের কোনওদিন তুচ্ছ বা হীন ভাবত না। ফলে সে-ও শ্রদ্ধা পেত সকলের কাছ থেকে। সে ছিল পঙ্গু, সরলস্বভাব, কানে কম শুনত, চোখে কম দেখত–পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের পক্ষে সে ছিল সবচেয়ে যোগ্য পুরুষ। তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো সত্যিই এক কঠিন ব্যাপার।
প্রধানা কত্রীর কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে সে গ্রাম্য ভাষায় এবং ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করল। সে প্রথমে তার বার্ধক্য আর বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার কথা বলল। বলল, বয়সের ভারে ক্রমশই নত হয়ে উঠছে সে। বাগানটা বড়, একা তাকে অনেক কাজ করতে হয়। যেমন গতরাতে তাকে বাইরে গিয়ে বাইরে থেকে খড় এনে রাত্রিকালে চাঁদের আলোতে বরফ পড়ার ভয়ে তরমুজগুলো খড় দিয়ে বাঁধতে হয়েছে।
এই সব বলার পর এবার আসল কথায় এল ফশেলেভেন্ত। তার এক ভাই। আছে, এ কথায় প্রধানা কত্রী চমকে উঠে তার মুখপানে তাকালেন। ফশেলেভেন্ত বলল, তবে সে যুবক নয়, তার বেশ বয়স হয়েছে। এ কথা শুনে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।
ফশেলেভেন্ত আবার বলতে লাগল। সে বলল, তাকে যদি অনুমতি দেওয়া হয় তা হলে তার ভাই তার কাছে থেকে তাকে বাগানের কাজে সাহায্য করতে পারে। তার ভাই-এর এক নাতনি আছে। একটা বাচ্চা মেয়ে। তাকে যদি কনভেন্টের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় তা হলে কে বলতে পারে ভবিষ্যতে সে একদিন একই কনভেন্টেরই এক সন্ন্যাসিনী বা সিস্টার হয়ে উঠতে পারে। সবশেষে সে বলল, যদি তাকে এ অনুমতি দেওয়া না হয় তা হলে তার বয়স এবং কর্মগত যোগ্যতার অভাবের কথা ভেবে সে এ কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
তার কথা শেষ হলে প্রধানা কত্রী মালা জপ করার কাজ থামিয়ে বললেন, আজকের সন্ধ্যার মধ্যে একটা লোহার শাবল এনে দেওয়া সম্ভব তোমার পক্ষে?
ফশেলেভেন্ত বলল, হ্যাঁ, হবে শ্রদ্ধেয়া মাদার।
কথাটা বলে সে একা দাঁড়িয়ে রইল।
.
৩.
এরপর প্রায় পনেরো মিনিট কেটে গেল। প্রধানা কর্তী আবার ফিরে এলেন। দু জনেই কী যেন ভাবছিল। এরপর দু জনের মধ্যে যেসব কথা হয় তা তুলে দেওয়া হল।
প্রধানা কত্রী বললেন, পিয়ের ফশেলেভেন্ত?
শ্রদ্ধেয়া মাদার?
তুমি গির্জার কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত?
এ কাজের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ আমার কম। আমি সমবেত প্রার্থনায় যোগ দিতে সময় পাই না। দূর থেকে তা শুনতে হয়।
কখনও যোগ দিয়েছ?
মাত্র দু-তিনবার।
আমি তোমাকে দিয়ে একটা পাথর সরাতে চাই।
পাথরটা কি খুব ভারী?
বেদির পাশে মেঝের একটা পাথর।
যে পাথর দিয়ে বেদির পাশের গহ্বরটা ঢাকা আছে?
হ্যাঁ।
কিন্তু এটা তো দুটো লোকের কাজ।
মেরি অ্যাসেনশানের গাঁয়ে পুরুষের মতো জোর আছে। সে তোমাকে সাহায্য করবে এ কাজে।
কিন্তু কোনও নারীর শক্তি পুরুষের সমান নয়।
এছাড়া আমাদের আর তো কোনও উপায় নেই। ডন মেবিলন আমাদের কাছে সেন্ট বার্নাদের চারশো সাতটি চিঠি পাঠিয়েছেন আর মার্লোনাস হবসন্তাস পাঠিয়েছেন তিনশো সাতষট্টিটি চিঠি। তাই বলে তো মার্লোনাসকে তুচ্ছ ভাবতে পারি না।
এখন আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। এটা তো আর কারখানা নয়।
নারী আর পুরুষও কখনই এক হতে পারে না। আমার ভাই-এর গাঁয়ে দারুণ শক্তি আছে।
তাছাড়া তোমার হাতে একটা লোহার শাবল থাকবে।
এইভাবেই পাথরটাকে তুলঁতে হবে।
পাথরটার মধ্যে একটা কড়া আছে।
আমি তার ভেতর দিয়ে শাবলটাকে ঢুকিয়ে দেব।
পাথরটা ঢাকনা চাপা আছে।
আমি সেটা তুলে গহ্বরের মুখটা খুলে দেব মাদার।
চারজন মাদার উপস্থিত থাকবেন।
গহ্বরের মুখটা খোলার পর কী হবে?
আবার সে মুখটা বন্ধ করতে হবে।
শুধু এই কাজ? আর কিছু নয় তো?
না।
বলুন আর কী করতে হবে আমায়?
ফভেন্তু, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি।
আমি আপনার হুকুম তামিল করার জন্য প্রস্তুত।
এবং কাউকে কোনও কথা বলবে না।
না, বলব না।
গহ্বরের মুখটা খোলার পর–
আমাকে আবার তা বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু তার আগে আর একটা কথা আছে।
বলুন, শ্রদ্ধেয়া মাদার।
সেই গহ্বরের মধ্যে কিছু একটা নামাতে হবে।
হঠাৎ চুপ করে গেল ফশেলেভেন্ত। দু জনেই চুপচাপ। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর প্রধানা কর্তী নিচের ঠোঁটটা একটু কামড়ে কুণ্ঠার সঙ্গে বললেন, তুমি জান ফভেন্ত, আজ একজন মাদার মারা গেছেন?
না।
তুমি ঘণ্টাধ্বনি শোননি?
বাগানের শেষ প্রান্ত থেকে সব ঘণ্টা শোনা যায় না।
তাই নাকি?
আমি শুধু আমার জন্য বাজানো ঘণ্টাটাই শুনতে পাই।
আজ সকালেই তিনি মারা গেছেন।
