জাঁ ভলজাঁ মাথা নেড়ে বলল, শোন পিয়ের ফশেলেভেন্ত, আমাকে কেউ যেন দেখতে না পায়। সেইটাই সবচেয়ে বড় কথা। তোমাকে একটা ঝুড়ি আর কিছু দড়ির ব্যবস্থা করতেই হবে।
ফশেলেভেন্ত তার বাঁ হাতের মাঝের আঙুল দিয়ে তার কানের গর্তটা নাড়া দিতে লাগল। এর মানে সে একটা বড় রকমের সমস্যায় পড়েছে। সে চিন্তা করতে লাগল। এমন সময় আবার একটা ঘণ্টাধ্বনি হল।
সে বলল, এর মানে ডাক্তার এসে গেছে। ডাক্তার দেখেই বলবে, রোগী আগেই মারা গেছে। ডাক্তার স্বর্গে যাবার ছাড়পত্রে সই করে দিলেই কফিনের জন্য তোক পাঠানো হবে। মৃত যদি মাদার হয় তা হলে মাদারেরাই মৃতকে কফিনে শোয়াবে। আর যদি সিস্টার মারা যায় তা হলে সিস্টারেরাই তাকে শোয়াবে কফিনে। তার পর আমাকে কফিনের মুখ বন্ধ করে পেরেক সঁটতে হবে। মালী হিসেবে এটা আমার কর্তব্যের একটা অঙ্গ। মালীর কাজ অনেকটা কবর খোঁড়ার লোকের মতো। গির্জার একটা ছোট ঘরে কফিনটা রাখা হবে। ঘরের রাস্তার দিকের দরজাটা খুলে দেওয়া হবে। একমাত্র ডাক্তার ছাড়া বাইরের কোনও পুরুষ আসতে পারবে না। আমাকে তো পুরুষ বলে গণ্য করা হয় না। এরপর মৃতদেহভরা কফিনটাকে নিয়ে যাওয়া হবে সমাধিভূমিতে। শবাধার বহনের জন্য পুরুষরা আসবে। তাতে কোনও ক্ষতি নেই।
সূর্যের একটা রশ্মি কসেত্তে’র মুখের উপর পড়তে ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল তার। মনে হল সে যেন সূর্যালোক পান করছে। ভলজাঁ একদৃষ্টিতে সেইদিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনও কথা না শুনলেও ফশেলেভেস্ত নিজের মনে বলে যেতে লাগল।
কবরখানাটা হল সিমেতেয়ার ভগিয়ার্দে। কিন্তু জায়গাটা নাকি এদের পছন্দ হচ্ছে না। কবরখননকারী পিয়ের মেস্তিয়েল আমার বন্ধু। এই কনভেন্টের কোনও মৃতদেহ ওখানে রাত্রিবেলাতেও নিয়ে গিয়ে সমাহিত করা চলে। পুলিশের কর্তারা হুকুম দিয়েছে। কিন্তু গতকাল থেকে আজকের মধ্যে কত কী ঘটে গেল। মাদার ক্রুসিফিকিসান মারা গেল আর পিয়ের ম্যাদলেন—
জাঁ ভলজাঁ মুখের উপর একফালি সকরুণ হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল, পিয়ের ম্যাদলেন হল জীবন্ত সমাহিত।
হ্যাঁ, জীবন্ত সমাহিত আপনি হবেন যদি আপনি চিরদিন এখানে থাকেন।
আবার ঘণ্টা বেজে উঠল। ফশেলেভেন্ত তার নিজের ঘণ্টাটা বার করে পায়ে বেঁধে নিল। সে বলল, এটা আমার জন্য। প্রধানা কত্রী আমাকে ডাকছে। আমি না আসা পর্যন্ত আপনি এখানেই থাকবেন। কোথাও যাবেন না। রুটি, মাখন আর মদ আছে। ক্ষিদে পেলে খাবেন।
যেতে যেতে সে বলতে লাগল, আমি আসছি, এখনি আসছি।
সে যখন তার খোঁড়া পা নিয়ে বাগান পার হয়ে সবজিক্ষেতের উপর দিয়ে যেতে লাগল, ভলজাঁ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে গেটের কাছে গিয়ে দরজায় ঘা দিল। দারোয়ান দরজা খুলে বলল, চিরদিন, চিরদিন। তার মানে ভেতরে এস।
দরজা দিয়ে একটা ছোট ঘরে ঢুকল ফশেলেভেন্ত। ঘরের মধ্যে প্রধানা কত্রী তার। কাজ বুঝিয়ে দেবার জন্য অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
.
২.
সংকটের সময় একই সঙ্গে বিব্রত এবং সংযত হওয়া কতকগুলি চরিত্রের বিশেষ গুণ। বিশেষ করে যাজক ও ধর্মসম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে এই গুণটি বেশি পরিমাণে দেখা যায়। ফশেলেভেন্ত যখন কনভেন্টের বাইরের দিকের সেই ছোট ঘরটাতে গেট পার হয়ে ঢুকল তখন কনভেন্টের প্রধানা কী সুন্দরী, বিজ্ঞ ও হর্ষোৎফুল্ল ম্যাদলেন দ্য ব্লেমুর মেরে আর ইনোসেন্তের মধ্যে এই গুণ দুটি একই সঙ্গে প্রকট হয়ে উঠেছিল তার চোখেমুখে।
মালী ফশেলেভেন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে অভিবাদন জানিয়ে দাঁড়িয়ে রইল নীরবে। প্রধানা কত্রী মেরে ইনোসেন্ত তখন মালা জপ করছিলেন। মালা জপতে জপতে একসময় তিনি মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ও তুমি ফভেন্ত!
ফশেলেভেন্তকে কনভেন্টের সকলে সংক্ষেপ ফভেন্ত বলত।
ফশেলেভেন্ত তার কপালটা একবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল, আপনি আমায় ডেকেছেন শ্রদ্ধেয়া মাদার?
তোমাকে একটা কথা বলার আছে আমার।
আমারও আপনাকে একটা কথা বলার আছে।
নিজের সাহস দেখে নিজেই বিস্মিত হল ফশেলেভেন্ত।
তোমার কিছু বলার আছে?
একটা অনুরোধ।
ঠিক আছে, বলে ফেল। শুনি কী অনুরোধ।
চাষি হয়েও যে একদিন মুহুরিগিরি করত সেই ফশেলেভেন্তের বাস্তব হিসেবি বুদ্ধি বেশই ছিল। তার মুখে-চোখে সব সময় যে একটা অজ্ঞতার ভাব ফুটে থাকত তা যেমন একদিকে সকলের মন থেকে তার প্রতি সব অবিশ্বাস ও সংশয়কে দূরীভূত করে দিত তেমনি তার প্রতি সকলের এক সহজ বিশ্বাসকেও আকর্ষণ করত। তার এই অজ্ঞতার ভাবটা সরলতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হত সকলের কাছে। সে প্রায় দু বছরের বেশিদিন এই কনভেন্টে কাজ করছে। এর মধ্যে এই ধর্মসম্প্রদায়েরই একজন হয়ে উঠেছে সে যেন। সে ছিল সম্পূর্ণ একা, বাগানের কাজ নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকত। দেহটা তার কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার সমগ্র মনজুড়ে বিরাজ করত এক বিরাট কৌতূহল। আজ দু বছরের মধ্যেও কনভেন্টের অভ্যন্তরীণ জীবনের অনেক কথাই তার জানা হয়নি। সেখানকার সবকিছুই রহস্যময় তার কাছে। অবগুণ্ঠিত সন্ন্যাসিনীদের আসা-যাওয়া ও পদচারণ সে দূর থেকে দেখে। প্রথম প্রথম তাদের এক একটি ছায়ামুর্তি বলে মনে হত তার। এখন ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে তাদের সে রক্তমাংসের মানুষ বলেই ভাবে। বধির মানুষের দৃষ্টিশক্তি যেমন বেড়ে যায়, অন্ধ মানুষের যেমন শ্রবণশক্তি বেড়ে যায় তেমনি তারও বোধশক্তি থাকতে থাকতে বেড়ে যায় ক্রমে ক্রমে। সে প্রতিটি ঘণ্টাধ্বনি শুনে তাদের অর্থ বলে দিতে পারত। ক্রমে কনভেন্টের সব গোপন তথ্য ও জীবনযাত্রা প্রণালীর সব রহস্যই একে একে উদঘাটিত হয়ে ওঠে তার বোধশক্তির কাছে। স্কিঙ্কস যেন তার সব রহস্যের কথা বলে দিয়েছে তার কানে কানে।
