ফশেলেভেন্ত তার বিছানার উপর উঠে বসে বলল, এই যে আপনি উঠেছেন। এখন এখানে কিভাবে আপনার থাকার ব্যবস্থা করি বলুন তো।
এ প্রশ্নে চমক ভাঙল জাঁ ভলজাঁ’র। সে সজাগ ও সচেতন হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করতে লাগল ফশেলেভেন্তের সঙ্গে।
ফশেলেভেন্ত বলল, কথাটা হল এই যে, আপনারা কেউ যেন এই কুঁড়েটার বাইরে এক পা-ও কোথাও যাবেন না। আপনাদের দু জনের কাউকে একবার দেখে ফেললে আর রক্ষা থাকবে না। আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে।
ভলজাঁ বলল, তা বটে। কথাটা সত্যি।
ফশেলেভেন্ত বলল, বুঝলেন মঁসিয়ে ম্যাদলেন, আপনি যে সময়ে এখানে এসে পড়েছেন সেটা হয় খুব সুসময় অথবা খুব দুঃসময়। কনভেন্টের এক মহিলা এখন মৃত্যুশয্যায়, এখন অন্তিমকালীন যতসব আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম হচ্ছে। চল্লিশ ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা চলছে। তাই এখানকার সবাই এখন এত ব্যস্ত আছে যে এদিকে কেউ তাকাবে না। একজন সেন্ট বিদায় নিচ্ছে পৃথিবী থেকে। একদিক দিয়ে আমরা সবাই সেন্ট। পার্থক্য এই যে আমরা থাকি সামান্য কুঁড়েঘরে। মৃত্যুর আগে ও পরে অনেক প্রার্থনা করতে হয়। এইভাবে আজকের দিনটা কেটে যাবে। কিন্তু কাল কী হবে বলতে পারি না।
জাঁ ভলজাঁ বলল, যাই হোক, এই ঘরটা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে রয়েছে। তাছাড়া ঘরটা গাছে ঘেরা আছে। কনভেন্ট থেকে এ ঘরটা দেখতে পাওয়া যায় না নিশ্চয়।
সন্ন্যাসিনী বা সিস্টাররা এদিকে আসে না ঠিক, কিন্তু স্কুলের মেয়েরা আসে।
এমন সময় চার্চে একটা ঘণ্টাধ্বনি হতে তার কথাটা বাধা পেল। সে নিজের চুপ করে গিয়ে ভলজাঁকে ইশারায় চুপ করতে বলল। আবার একবার ঘণ্টা বাজল।
ফশেলেভেন্ত বলল, মহিলাটি মারা গেছে। এটা হচ্ছে মৃত্যুকালীন ঘণ্টাধ্বনি। গির্জা থেকে মৃতদেহ বার করে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে এক মিনিট পর
পর এইভাবে ঘণ্টা বেজে চলবে। স্কুলের মেয়েরা বাগানে খেলা করে। একটা বল। কোনও রকমে এদিকে আসার অপেক্ষা। তা হলে ওরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসবে এদিকে। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখবে। এদিকে ওদের আসা নিষিদ্ধ হলেও ওরা তা মানে না। ওরা তো শিশু।
ভলজাঁ প্রশ্ন করল, কোন শিশুরা?
ফশেলেভেন্ত বলে যেতে লাগল, ওরা অল্প সময়ের মধ্যে আপনাকে দেখে ফেলবে। তার পর সব মেয়েগুলো একবাক্যে চিৎকার করে উঠবে, একটা লোক রয়েছে, লোক রয়েছে। তবে আজ আর সে বিপদ নেই। কারণ আজ সব খেলাধুলা নিষিদ্ধ। আজ শুধু সারাদিন প্রার্থনা। ওই দেখুন। আবার ঘণ্টা বাজছে। আমি যা বলেছিলাম অর্থাৎ মিনিটে মিনিটে ঘণ্টা বেজে চলেছে।
ভলজাঁ বলল, এবার বুঝেছি। এখানে একটা বোর্ডিং স্কুল আছে।
হঠাৎ একটা কথা মনে এসে গেল তার। এখানকার স্কুলে কসেত্তে লেখাপড়া শিখতে পারে তো।
ফশেলেভেন্ত বলল, প্রায় একডজন বাচ্চা মেয়ে আছে। তারা শুধু চেঁচামেচি করতে করতে ছুটে বেড়ায়। এখানে কোনও পুরুষমানুষ যেন প্লেগ রোগের জীবাণু। এই কারণেই আমার পায়ে একটা ঘন্টা বাধা আছে। যেন আমি একটা বন্য জন্তু।
জাঁ ভলজাঁ আবার চিন্তার গভীরে ডুবে গেল। সে ভাবল হয়তো কনভেন্টই তাদের মুক্তির উপায় হয়ে উঠবে।
সে বলল, এখন এখানে থাকাটাই হল সমস্যা।
ফশেলেভেন্ত বলল, না, সমস্যাটা হল বেরিয়ে যাওয়াটা।
চমকে উঠল ভলজাঁ, বেরিয়ে যাওয়া?
হা মঁসিয়ে, বাইরে থেকে এখানে যারা আসে তারা দরজা দিয়ে আসে। কিন্তু আপনি সেভাবে আসেননি। আমি আপনাকে চিনি তাই। কিন্তু আমারই তো মনে হচ্ছিল আপনি আকাশ থেকে পড়েছেন।
আবার একটা জোর ঘণ্টাধ্বনি হল।
ফশেলেভেন্তু বলল, এই ঘণ্টাধ্বনির দ্বারা মাদারদের প্রার্থনায় যোগদান করার জন্য ডাকা হচ্ছে। কেউ মারা গেলে তারা দিনরাত প্রার্থনা করে। কিন্তু আপনি চলে যাচ্ছেন না কেন এখান থেকে? আমি অবশ্য প্রশ্ন করছি না। শুধু জানতে চাইছি আপনি কী করে ভেতরে ঢুকলেন?
জাঁ ভলজাঁ’র মুখখানা মলিন হয়ে গেল। পুলিশপরিবৃত সেই ভয়ঙ্কর রাস্তায় ফিরে যাওয়ার কল্পনাটা সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে তুলঁল তার। এ যেন ব্যাঘ্ৰাকীর্ণ কোনও জঙ্গল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার সেই জঙ্গলে ফিরে যাওয়া। মনে মনে কল্পনা করতে লাগল সে, গোটা রাস্তাটা ভরে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ আর প্রহরী। সবাই তার কলার ধরার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে আর জেভার্ত তাদের নেতা।
ভলজাঁ বলল, অসম্ভব। পিয়ের ফশেলেভেন্ত এই কথাই মনে করে যাক যে আমি আকাশ থেকে পড়েছি।
ফশেলেভেন্ত বলল, হ্যাঁ, আমি তাই বিশ্বাস করতে রাজি আছি। আমাকে আর কিছু বলার দরকার নেই। ঈশ্বর হয়তো আমি যাতে একবার আপনাকে দেখতে পাই তার জন্য এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার একটা ঘন্টাধ্বনি হল। এ ঘণ্টার অর্থ হল মিউনিসিপ্যালিটিতে মৃত্যুর খবর দিয়ে পাঠানোর। খবর পেয়ে সেখান থেকে একজন ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে দেখবে মৃত্যুর খবর ঠিক কি না। বাইরে থেকে ডাক্তার আসার ব্যাপারটা এখানকার কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু এবার খুব তাড়াতাড়ি লোক পাঠাচ্ছে কেন? কিছু একটা নিশ্চয় ঘটেছে। আপনার এই বাচ্চা মেয়েটা এখনও ঘুমোচ্ছে। ওর নাম কী?
কসেত্তে।
এ কি আপনার মেয়ে? অবশ্য এ আপনার নাতনিও হতে পারে।
হ্যাঁ তাই।
মেয়েটাকে এখান থেকে বার করে নিয়ে যেতে কোনও কষ্ট হবে না। উঠোনের দিকে বাইরে যাবার একটা দরজা আছে। আমি তাতে করাঘাত করলেই দারোয়ান সেটা খুলে দেয়। আমি বাগানের মালী, কুঁড়ি কাঁধে বেরিয়ে যাব আর ও ঝুড়ির মধ্যে চুপ করে বসে। থাকবে। আমি ওকে আমার এক পুরনো বান্ধবীর কাছে রেখে আসব। র্যু দু শেমিন ভার্তে সেই বুড়িটার একটা ফলের দোকান আছে। বুড়িটা অবশ্য কানে কালা এবং আমাকে চিৎকার করে বলতে হবে মেয়েটি আমার ভাইঝি। কাল পর্যন্ত ওকে এখানে রাখতে হবে তোমার কাছে। তার পর ও না হয় তো আপনার সঙ্গে আবার কাল এখানে আসবে। আপনার এখানে আসার কোনও একটা উপায় আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে। কিন্তু এখান থেকে বার হবেন কী করে?
