দারুণ চিন্তায় ফশেলেভেন্তের মাথাটা পীড়িত হচ্ছিল। তার তখন শুধু এই কথাই মনে হচ্ছিল যে সমস্ত ব্যাপারটাই তার বুদ্ধির অতীত। সে কোনওমতেই বুঝে উঠতে পারছিল না মঁসিয়ে ম্যাদলেন কী করে এত বড় বিরাট উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে একটা বাচ্চা মেয়েকে সঙ্গে করে এখানে এল? এই মেয়েটাই-বা কে? কোথা থেকে এল তারা? এই কনভেন্টে কাজ নিয়ে আসার পর থেকে ফশেলেভেন্ত মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর কোনও খবরই পায়নি। এবং এর মধ্যে কী ঘটেছে না ঘটেছে তারা কিছুই জানে না। বর্তমানে পিয়ের ম্যালেনের যা অবস্থা তাতে তাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করা যায় না। সেন্টকে কেউ কখনও কোনও প্রশ্ন করে না। কিন্তু তার মনে ম্যাদলেনের মহত্ত্ব ম্লান হল না বিন্দুমাত্র। ম্যালেনের এই শোচনীয় অবস্থা দেখে তার শুধু এই কথাই মনে হল যে ম্যাদলেন হয়তো হঠাৎ ব্যবসায় বিশেষভাবে ক্ষগ্রিস্ত হয়ে পড়ে পাওনাদারদের জ্বালায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে অথবা হয়তো কোনও রাজনৈতিক কারণে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কারণটা যদি রাজনৈতিক হয় তা হলে তাতে অবশ্যই খুশি ফশেলেভেন্ত, কারণ উত্তরাঞ্চলের চাষিদের মতো সে-ও মনেপ্রাণে বোনাপার্টপন্থী। এই কনভেন্টটাকে এক নিরাপদ আশ্রয় ভেবে ম্যাদলেন যদি এখানে লুকিয়ে থাকতে চায় তা হলে সে সেটা বুঝতে পারে। কিন্তু এই শিশুটি কোথা হতে এল এবং কেনই-বা সে এখানে থাকবে তা সে কোনওক্রমেই বুঝতে পারল না। শিশুটার। ব্যাপার রহস্যময় রয়ে গেল তার কাছে, মনে মনে এই দুর্বোধ্য রহস্যের সন্ধান করতে করতে তার মধ্যে ডুবে গেল সে। বিভিন্ন অনুমান আর কল্পনার কাঁটাজালে জড়িয়ে পড়ল। তবে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে একা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হল সে। আজ না-ই হোক, মেয়র মঁসিয়ে ম্যাদলেন একদিন তার জীবন রক্ষা করেছে, মৃত্যুর কবল থেকে বাঁচিয়েছে। সেদিন তিনি বৃথা সময় নষ্ট না করে সেই গাড়িটার তলায় ঢুকে পড়ে আমাকে উদ্ধার করেন। আজ তিনি যে কারণেই হোক আমার সাহায্যপ্রার্থী। আজ তিনি যদি চোর বা খুনিও হন তা হলেও তাকে আমি বাঁচাব। কারণ তিনি সাধু প্রকৃতির লোক।
কিন্তু কী করে তিনি কনভেন্টে থাকবেন? এখানে তো কোনও পুরুষ আসতে বা থাকতে পারে না। কিন্তু সমস্যা যত অলঙ্ঘনীয়ই হোক না কেন, একেবারে দমে গেল না ফশেলেভেন্ত। পিকার্দি অঞ্চলের সে একজন সামান্য চাষি। ভক্তি, সরলতা, শুভেচ্ছা আর কৃষকসুলভ এক চাতুর্য ছাড়া আর কোনও সম্বল নেই তার। সেই চাতুর্য প্রয়োগ করে। কনভেন্টের কড়া নিয়ম-কানুনের সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তার জীবনদাতাকে সাহায্য করার উদার প্রবৃত্তিটিকে রক্ষা করে চলার এক দৃঢ় সংকল্প করে বসল সে মনে মনে। ফশেলেভেস্ত তার সারা জীবন ধরে আপন স্বার্থের সেবা করে এসেছে। সে ছিল পুরোপুরি আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু আজ সে বার্ধক্যে উপনীত, সে দুর্বল, পঙ্গু। জীবনে আজ আর আগের মতো আগ্রহ নেই। আজ তার কৃতজ্ঞতাবোধকে পরিতৃপ্ত করতে পারার এক। বিরল আনন্দ অনুভব করছে সে। জীবনে আজ প্রথম একটা ভালো কাজ করতে পারার সে সুযোগ পেয়েছে, সে সুযোগকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় সে। কোনও মুমূর্ষ ব্যক্তি অনাস্বাদিতপূর্ব একপাত্র ভালো মদ পেয়ে যেমন পুলকের এক রোমাঞ্চ অনুভব করে, ফশেলেভেন্তেরও আজ সেই অবস্থা হল। তাছাড়া কয়েক বছর কনভেন্টের এই ধর্মীয় আবহাওয়ায় কাটানোর ফলে তার চরিত্রটা বদলে যায়। কোনও না কোনও একটা পুণ্যের কাজ করার আগ্রহ ক্রমশ প্রবল এবং অদম্য হয়ে ওঠে তার মনে।
ফশেলেভেন্ত তাই ম্যাদলেনকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ়সংকল্প হয়ে উঠল। তাকে আমরা পিকার্দি অঞ্চলের এক সামান্য চাষি বলে অভিহিত করেছি। কিন্তু এটা তার আংশিক পরিচয়, সম্পূর্ণ নয়। আমরা যদি পিয়ের ফশেলেভেন্তের জীবনটাকে আরও ভালো করে পর্যালোচনা করে দেখি তা হলে দেখতে পাব সে চাষি হলেও মুহুরিগিরি এবং দলিল নকলের কাজ করত। এই কাজ করতে গিয়ে তার চাতুর্য এবং আইনের জ্ঞান বেড়ে যায়। তার স্বভাবসিদ্ধ সরলতার মাঝে এক দৃঢ়তা আসে। বিভিন্ন কারণে তার মুহুরিগিরি কাজ ভালো না চলায় সে গাড়িচালকের কাজে নামে। গাড়িভাড়া খাটার কাজ ছাড়াও মাঝে মাঝে দিনমজুরের কাজ করত। গাড়িচালনা এবং ঘোড়াচালনার কাজ সে করলেও তার মনে সেই মুহুরিগিরির দক্ষতা এবং চাতুর্যের কিছুটা রয়ে গিয়েছিল। তার বুদ্ধিবৃত্তি বেশ উন্নত ছিল এবং তার কথাবার্তা অন্য চাষিদের মতো অমার্জিত ছিল না। সে অনেক সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করত যা সাধারণত গ্রামবাসীরা করে না। গাঁয়ের লোকেরা তাই তার সম্বন্ধে বলত, ও ভদ্রলোকের মতো কথা বলে। মোট কথা, ফশেলেভেন্ত ছিল একাধারে গ্রাম্য ও শহুরে। সমাজের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার না পেলেও গ্রাম্য এবং নাগরিকতার মিশ্র উপাদানে গড়া ফশেলেভেন্তের চরিত্রের মধ্যে এমন কতকগুলি গুণ ছিল যা তাকে খারাপ হতে বা নিচে নেমে যেতে দেয়নি কোনও দিন। তার মধ্যে দোষ-ত্রুটি কিছু থাকলেও সেগুলো ছিল তার চরিত্রের বহিরঙ্গের ব্যাপার, তার গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। তার কপালে কুঞ্চিত রেখার মধ্যে কোনও হিংসা বা নির্বুদ্ধিতার ছাপ ছিল না।
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সকাল হতেই চোখ খুলে দেখল পিয়ের ফশেলেভেন্ত, মঁসিয়ে ম্যাদলেন তার খড়ের বিছানার উপর বসে ঘুমন্ত কসেত্তে’র পানে তাকিয়ে আছে।
