পেতিত পিকপাসের বার্নাদিনে সম্প্রদায় থেকে বেনেডিক্টে সম্প্রদায় ছিল একেবারে পৃথক। ১৬৫৭ সালে পোপ আলেকজান্ডার সপ্তম এক বিশেষ হুকুমনামা জারি করে পেতিত পিকপাসের বার্নাদিনে সম্প্রদায়কে চিরস্থায়ী ভক্তিসংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী উপাসনা করে যাবার অনুমতি দান করেন। তবু তাদের সঙ্গে হলি সেক্ৰামেন্টের বেনেডিক্টেনে সম্প্রদায় অন্য সবদিক থেকে একটা পার্থক্য রয়ে যায়।
.
১১.
পেতিত পিকপাসের কনভেন্টের অবক্ষয় বা পতন শুরু হয় রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে পতন শুরু হয় পেতিত পিকপাস কনভেন্টের পতন সেই পতনেরই এক অঙ্গবিশেষ। আসলে বিপ্লব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথাগত ভিত্তিগুলোর উপর চরম আঘাত হানে। ফরাসি বিপ্লব ধর্মের উচ্ছেদ সাধন না করলেও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে খাপ খাইয়ে নিতে বলে।
পেতিত পিকপাস ধর্মসম্প্রদায়ের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৮৪০ সালের মধ্যে তার অন্তর্গত লিটল কনভেন্ট ও স্কুলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। বয়োপ্রবীণ সিস্টারদের মৃত্যু ঘটে এক একে এবং ছাত্রীরা সব একে একে চলে যায়।
চিরস্থায়ী ভক্তিপ্রচার সংস্থার নিয়মকানুন এমনই কঠোর যে যারা এখানে একবার প্রবেশ করে তারা কিছুকালের মধ্যে বিরক্ত হয়ে ওঠে এবং নতুন আর কেউ আসতে চায় না। ১৮৪৫ সালে কিছু সিস্টার ছিল স্কুলে পড়াবার জন্য, কিন্তু ধর্মে উৎসর্গীকৃতপ্রাণ কোনও সন্ন্যাসিনী ছিল না। চল্লিশ বছর আগে এই সন্ন্যাসিনীর সংখ্যা ছিল একশো এবং পঞ্চাশ বছর আগে ছিল আটাশ। ১৮৪৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাচিত করা হয় চল্লিশের নিচের এক নারীকে। অথচ আগে সাধারণত এ পদে আরও বয়স্কা নারী ছাড়া বসতে পারত না। এর থেকে বোঝা যায় যোগ্য প্রার্থিনী না থাকায় বাদ্য হয়ে এই নির্বাচন করতে হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে। সিস্টারদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের কাজের চাপ বেড়ে গিয়েছিল। প্রত্যেককে কঠোর পরিশ্রম করতে হত। সিস্টারদের সংখ্যা কমে গেলেও নিয়মকানুনের কঠোরতা কমেনি কিছুমাত্র। মনে হয় সে সংখ্যা কমে গিয়ে ডজনে নেমে এলেও তাদের নিয়মকানুনের কঠোরতা ঠিকই মেনে চলতে হবে। এত কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে অবশিষ্ট সিস্টারদের মৃত্যু ঘটে। এই গ্রন্থের লেখক যখন প্যারিসে অবস্থান করছিলেন তখন পঁচিশ ও তেইশ বছরের দু জন সিস্টারের মৃত্যু ঘটে। এইভাবে সিস্টারদের একে একে মৃত্যু ঘটায় স্কুল তুলে দিতে হয়।
আমরা একমাত্র জাঁ ভলজাঁকে অনুসরণ করতে গিয়েই এই লুপ্তপ্রায় কনভেন্টের বাগানবাড়িতে প্রবেশ করি। আমরা এই প্রতিষ্ঠানের সুকঠোর নিয়মকানুন ও অদ্ভুত প্রথাগুলোকে বর্ণনা করেছি। কিন্তু তার অর্থ ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। তবে বুঝতে না পারলেও কোনও কিছুকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিইনি। আমরা জোসেফ মেস্তারের হোসানা সম্প্রদায়ের কথাবার্তাও বুঝতে পারিনি, তারা যিশুর ঘাতককে সমর্থন করে, যেমন ভলতেয়ারের মতো জ্ঞানী লোক ক্রসকে উপহাস করেন। অতিমানবিক শক্তিসম্পন্ন যিশুকে যারা অস্বীকার করেন তাঁদের কাছে এদের কি দাম আছে?
আজকের এই উনিশ শতকে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের এক জোর সংকট চলছে। অনেক জ্ঞানের বস্তু মানুষ এ যুগে মন থেকে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু অন্য জ্ঞানের বস্তুকে গ্রহণ করতে পারেনি তারা। কিন্তু মানুষের অন্তরে এই ধরনের শূন্যতা থাকা উচিত নয়।
যেসব জিনিস চলে গেছে আমাদের সামনে থেকে সেগুলোকে খুঁটিয়ে বিচার করে ফেলতে হবে আমাদের। অনেক সময় অতীতের অনেক পুরনো জিনিস নাম পাল্টে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। সেসব জিনিসকে ভবিষ্যৎ বলে ভুল করা উচিত নয়। অতীতের প্রেতাত্মারা অনেক সময় ভবিষ্যতের মুখোশ পরে এসে বিভ্রান্ত করে আমাদের। সেই মৃত অতীতের মুখখানা হল কুসংস্কারের মূর্ত প্রতীক আর ভণ্ডামিই হল তার মুখোশ। সে মুখ আর মুখোশটাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত আমাদের।
সাধারণভাবে সব কনভেন্ট সভ্যতা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক জটিল সমস্যা সৃষ্টি করে। সভ্যতা তাদের ধিক্কার দেয় আর স্বাধীনতা তাদের রক্ষা করে চলে।
২.৭ পেতিত পিকপাসের কনভেন্টে
সপ্তম পরিচ্ছেদ
১.
পেতিত পিকপাসের এই কনভেন্টেই ঘটনাক্রমে এসে পড়ে জাঁ ভলজাঁ। ফশেলেভেন্ত তাকে বলে, সে যেন আকাশ থেকে পড়েছে সহসা।
কসেত্তেকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভলজাঁ ফশেলেভেন্তের সঙ্গে জ্বলন্ত আগুনের ধারে বসে তার খাওয়া সেরে নেয়। ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় কোনও বিছানা না থাকায় মেঝের উপর খড় বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়ে ভলজাঁ। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে বলে, আমাকে এখানেই থাকতে হবে। কথাগুলো ফশেলেভেন্তের মনটাকে দারুণ ভাবিয়ে তোলে সে-রাতে।
সে-রাতে তাদের দুজনের কেউই ঘুমোতে পারেনি। ভলজাঁ বুঝতে পারে জেতার্ত তাকে খুঁজছে তখনও, ফলে শহরের কোথাও কোনওখানে সে কসেত্তেকে নিয়ে নিরাপদে লুকিয়ে থাকতে পারবে না। সে বুঝতে পারে এই বাগানবাড়িটা একই সঙ্গে খুবই বিপজ্জনক এবং খুবই নিরাপদ। বিপজ্জনক এইজন্য যে এখানে কেউ আসে না, এবং এখানে কেউ যদি এসে দেখে ফেলে তাকে তা হলে সে ধরা পড়ে যাবে এবং তাতে জেলে যেতেই হবে। আর নিরাপদ এইজন্য যে এখানে কে তাকে খুঁজতে আসবে?
