এই বৃদ্ধা যখন ছোট ছোট মেয়েদের সঙ্গে কথা বলত, বা গল্প বলত মেয়েরা তা মন। দিয়ে শুনত। তার কথা বলার ধরন দেখে মুগ্ধ হত তারা। সে যাজকের কাছে শপথবাক্য পাঠ করার সময় বলত, এই শপথবাক্য প্রথমঁ সেন্ট ফ্রান্সিস সেন্ট জুলিয়েনকে দিয়ে যান, তার পর সেন্ট জুলিয়েন আবার সেন্ট ইউসেবিয়াসকে দিয়ে যান, সেন্ট ইউসেবিয়াস আবার দিয়ে যান সেন্ট প্রবোপিয়াসকে এইভাবে হে ধর্মপিতা, আমিও আপনাকে এ শপথ দিয়ে যাচ্ছি।
তার কথা শুনে মেয়েরা যখন খিলখিল করে হাসত তখন মাদাররা রেগে গিয়ে ভ্র কুঞ্চন করে তাকাত তাদের পানে।
বৃদ্ধা আরও অনেক গল্প শোনাত। সে বলত সে যখন বয়সে যুবতী ছিল তখন গির্জার যাজকরা সৈন্যদের মতোই ছিল ব্যভিচারী। এমনি করে একটা শতাব্দী যেন তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠত। যে শতাব্দী হল অষ্টাদশ শতাব্দী। সে চার ধরনের মদের কথা বলত। বিপ্লবের আগে যখন ফ্রান্সের মতো উঁচুদরের এক লর্ড শহরে একজন সম্মানিত অতিথি হিসেবে আসতেন তখন শহরের কাউন্সিল চারটে পানপাত্রে চার রকমের মদ দিত। চার রকমের মদে চার রকমের ফল পাওয়া যেত–আনন্দ, ঝগড়া-বিবাদ, হতবুদ্ধিভাব আর ঝিমুনিভাব।
বৃদ্ধা একটা ঘরের মধ্যে থাকার অনুমতি পেয়েছিল। একটা আলমারিতে তালাচাবি দিয়ে কী একটা জিনিস সে ভরে রাখত। সে জিনিসের কথা কেউ জানত না। যখনই কোনও লোক তার ঘরের কাছে আসত সে তাড়াতাড়ি আলমারিটা তালাচাবি বন্ধ করে দিত। কেউ যদি তাকে সেই জিনিসের কথা বলত তা হলে সে চুপ করে থাকত। এমনিতে সে বেশি কথা বললেও এ বিষয়ে কোনও কথা বলত না। তার ফলে একটা বিরাট কৌতূহল সকলের মনে দানা বেঁধে উঠত।
এ নিয়ে কনভেন্টের অনেকে বলাবলি করত নিজেদের মধ্যে। ওই একশো বছরের বৃদ্ধা কী এমন ধন লুকিয়ে রেখেছে আলমারির মধ্যে? কোনও ধর্মগ্রন্থ নিশ্চয়। অথবা কোনও প্রাচীন বস্তু। বৃদ্ধা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলমারি খুলে সেই রহস্যময় বস্তুটা বার করা হয় তাড়াতাড়ি। দেখা গেল একটা লিনেনের কাপড় দিয়ে একটা ছবি বেঁধে রাখা হয়েছে। ছবিটা পুরনো কোনও দোকান থেকে কেনা। সে ছবিতে ছিল এক প্রেমিক আর এক প্রেমিকার ছবি। প্রেমিকের মুখে ছিল শয়তানের হাসি আর প্রেমিকার মুখ যন্ত্রণায় কাতর এবং বিকৃত। এই ছবি থেকে একটা নীতিশিক্ষাই পাওয়া যায়। যন্ত্রণার কাছে প্রেম পরাভূত।
বৃদ্ধা বাইরের কোনও অতিথির সঙ্গে দেখা করত না। কারণ সে বলত বসার ঘরটা খুবই অন্ধকার।
.
১০.
কনভেন্টের যে বৈঠকখানা ঘরের কথা আগেই বলা হয় সে ঘরটা ছিল সমাধিগহ্বরের মতোই অন্ধকার। সে ঘরের জানালা ও দরজায় ছিল কালো পর্দা। অন্যান্য কনভেন্টের বসার ঘরটা চমৎকারভাবে সাজানো থাকত। সে ঘরের জানালায় থাকত সিল্কের বাদামি রঙের পর্দা, আর দেয়ালগুলোতে নানারকমের ছবি আঁকা। অন্যান্য কনভেন্টের নিয়ম-কানুন পেতিত পিকপাসের মতো এত কঠোর ছিল না। র্যু দু তেম্পল ছিল এই ধরনের এক কনভেন্ট। যে কনভেন্ট চালিত হত বেনেডিক্ট সম্প্রদায়ের দ্বারা।
র্যু দু তেম্পল কনভেন্টের বাগানে এমন একটা বিরাট বাদামগাছ ছিল, যা সারা ফ্রান্সের মধ্যে ছিল সবচেয়ে পুরনো আর সবচেয়ে সুন্দর। অষ্টাদশ শতকের লোকেরা বলত, এই বাদামগাছটা ও রাজ্যের সব বাদামগাছের পিতা।
আমরা আগেই বলেছি র্যু দু তেম্পল কনভেন্টটি চিরস্থায়ী ভক্তিপ্রচার সংস্থার বেনেডিক্টেনে সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসিনীদের দ্বারা পরিচালিত হত। এরা ছিল সিটো সম্প্রদায়ের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ভক্তিপ্রচার সংস্থাটি আজ হতে দুশো বছর আগে স্থাপিত হয়। প্রচার সংস্থা স্থাপনের পেছনে এক ইতিহাস আছে। ১৬৪৯ সালে সেন্ট। সালপিস আর সেন্ট জাঁ এনগ্রেডে নামে দুটি চার্চে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পর পর দু বার অধর্মাচরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে নাকি মার্কুই দ্য বুস আর কাউন্টেস দ্য শ্যাতোভো নামে দু জন মহিলার শালীনতাহানি করা হয়। এই অমার্জনীয় অধর্মাচরণ ও ধর্মস্থানের পবিত্রতাহানিরূপ পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ সেন্ট জার্মেন দে প্রেসের প্রধান ভিকার সমস্ত যাজকদের নিয়ে এক গুরুগম্ভীর ধর্মীয় শোভাযাত্রার ব্যবস্থা করেন। এই ধরনের অধর্মাচরণের অপরাধ এর পরে আর অনুষ্ঠিত না হলেও এই পাপের কথাটা দেশের ধর্মজগতের কর্তৃপক্ষের মনে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ওই দু জন ক্ষুব্ধ মহিলা কর্তৃপক্ষের দ্বারা অবলম্বিত ব্যবস্থায় তৃপ্ত হতে পারেননি। তাঁরা ভাবছিলেন আরও চরম প্রায়শ্চিত্তের কথা। তারা সকলে তখন ঠিক করল এই অধর্মাচরণের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এক চিরস্থায়ী ভক্তি সংস্থা গড়ে তুলঁতে হবে। ঠিক হল সেটা হবে এমনই এক প্রতিষ্ঠান যেখানে হলি সেক্ৰামেন্টের সন্ন্যাসিনীরা নিরন্তর উপাসনা আর প্রার্থনার দ্বারা চিরকাল ধরে এক প্রায়শ্চিত্ত করে যাবে। তখন ওই দু জন মহিলা মোটা টাকা দিয়ে র্যু কসেত্তে নামে এক জায়গায় মেয়েদের জন্য এক কনভেন্ট স্থাপন করে। বেনেডিক্টে সম্প্রদায়ের অধীনস্থ সিস্টার ও মাদারদের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে এই কনভেন্ট এবং এর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সেন্ট জার্মেনের অধ্যক্ষ মঁসিয়ে দ্য মেৎস অনুমতি দান করেন।
এই হল বেনেডিক্টে সম্প্রদায়ের চিরস্থায়ী ভক্তিপ্রচার সংস্থার উদ্ভবের ইতিহাস। সিস্টার অফ চ্যারিটি সম্প্রদায় যেমন প্রতিষ্ঠিত হয় সেন্ট লাজারাসের অধ্যক্ষের দ্বারা, অর্ডার অফ সেক্রেড হার্ট-সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয় যেমন জেসুটদের দ্বারা, তেমনি বেনেডিক্টে সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে সেন্ট জার্মেনের অধ্যক্ষের দ্বারা।
