উপাসনা পরিচালনার ভার ছিল মেরে সেন্ত মেশতিনদের ওপর। উপাসনার সময় সেই সিস্টার ছাড়া সাত থেকে দশজনের মতো ষোলো বছরের ছাত্রীকে নিত। মাথার উচ্চতা অনুসারে তাদের সার দিয়ে সাজানো হত। তাদের দাঁড়িয়ে গান করতে হত। দেখেশুনে মনে হত যেন দেবদূতরা বাঁশি বাজাচ্ছে। সিস্টার সুর সেন্ত মার্থে ও সুর সেন্ত মাইকেলকে মেয়েরা সবচেয়ে ভালোবাসত। সেন্ত মাইকেলের লম্বা নাকটা দেখে ছাত্রীরা হাসত।
সিস্টাররা কঠোর সন্ন্যাস জীবনযাপন করলেও তাদের শাসনপাশ ছাত্রীদের প্রতি একটু শিথিল ছিল। সিস্টাররা তাদের ঘরে আগুন জ্বালাতে পারত না। কিন্তু ছাত্রীদের বোর্ডিংয়ে আগুন জ্বালানো হত। তারা সবাই ছাত্রীদের স্নেহের চোখে দেখত। তবে কোনও মেয়ে যখন কোনও সিস্টারের পাশ দিয়ে যাবার সময় কোনও কথা বলত তখন সিস্টার উত্তর দিত না।
নীরবতার এই ব্যাপক অনুশাসনের মাঝে মানুষের কাছ থেকে সব বাকশক্তি কেড়ে নিয়ে যেন কয়েকটি নির্জীব বস্তুকে সে বাকশক্তি দান করা হয়। কখনও গির্জার ঘণ্টা, কখনও বাগানের মালীর ঘণ্টার ধ্বনিগুলো যেন বারবার কথা বলে যেত। প্রহর ঘোষণা ছাড়াও দারোয়ানের ঘণ্টার ধ্বনিগুলো সকলকে তাদের আপন আপন কর্তব্যের কথা। স্মরণ করিয়ে দিত। আবার যদি কাউকে অফিসঘরে বা বসার ঘরে ডাকা হত কোনও কারণে তা হলেও ঘণ্টা বাজানো হত। যেমন প্রধানাকী ও শিক্ষয়িত্রী কাউকে ডাকলে পরপর দু বার ঘণ্টাধ্বনি করা হত আর তার সহকারিণী ডাকলে একবার আর পরে দুবার ঘণ্টাধ্বনি করা হত। ছ’টা পাঁচের ঘণ্টাধ্বনি ক্লাসে যোগদান করার জন্য ছাত্রীদের ‘ডাকত। আবার চারটে চার মিনিটের ঘণ্টাধ্বনি ছিল প্রার্থনার জন্য মাদাম জেলিসের ডাক। এ ঘণ্টাধ্বনি প্রায়ই শোনা যেত। অনেক ছাত্রী বিরক্ত হয়ে মাদাম জেলিসকে বলত চারশিংওয়ালী এক শয়তান।
উনিশটি ঘণ্টাধ্বনি এক বড় রকমের ঘটনাকে সূচিত করত। তখন খুব ভারী ধাতু দিয়ে তৈরি সদর দরজাটা খুলে যেত। কিন্তু একমাত্র আর্কবিশপের আগমন ছাড়া সে দরজা খুলত না।
আর্কবিশপ আর বাগানের মালী ছাড়া আর কোনও পুরুষ ঢুকতে পেত না কনভেন্টে। তবে স্কুলের ছাত্রীরা আর দু জন পুরুষকে দেখতে পেত। তারা হল আব্বে বানে যার ওপর ভার ছিল ভিখারিদের ভিক্ষা দান করার আর একজন হল অঙ্কন শিক্ষক মঁসিয়ে আলসিয়, যাকে অনেকে এক বুড়ো কুঁজো বলে বর্ণনা করত।
.
৮.
কনভেন্টের নৈতিক দিকটার একটা চিত্র তুলে ধরার পর তার বাস্তব বহিরঙ্গ সম্বন্ধে কিছু বলা উচিত। অবশ্য পাঠকবর্গ আগেই এ বিষয়ে কিছু কিছু জেনেছেন।
পেতিত পিকপাসে ও সেন্ট আঁতোনের কনভেন্টটা ছিল আয়তক্ষেত্রাকার এবং চতুর্ভুজবিশিষ্ট। তার চারদিকে ছিল চারটি রাস্তা। এই রাস্তা চারটি হল র্যু পলোনসো, র্যু দ্রয়েত মুর, পেতিত র্যু পিকপাস এবং অধুনালুপ্ত এক কানাগলি। আগের যুগের মানচিত্রে এই গলিটাকে র্যু অমারাই নামে উল্লিখিত আছে। চারদিকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে। ঘেরা ছিল গোটা কনভেন্টের সীমানাটা। তার মধ্যে অনেকগুলো বাড়ি আর একটা বাগান ছিল।
কনভেন্টের প্রধান বাড়ির আশপাশে অনেকগুলো ছোটখাটো বাড়ি ছিল। এ বাড়ির মধ্যে থাকত সিস্টাররা, মাদাররা আর শিক্ষানবিশরা। স্কুলের ছাত্রীরা থাকত তাদের বোর্ডিং হাউসে। এই বোর্ডিং বাড়িটা পেতিত র্যু পিকপাস আর র্যু অমারাই-এর মাঝখানে বাইরে থেকে দেখা যেত। বাগানের মধ্যে একটা ছিল প্রধান পথ আর আটটা ছোট পথ তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পথগুলোর দৈর্ঘ্যের মধ্যে কোনও সমতা ছিল না। পথগুলোর দু পাশে ছিল অনেক ফলের গাছ। প্রধান পথটার ধারে ফাঁকা জায়গায় ছিল একটা লম্বা পাইনগাছ। পপলার গাছে ঘেরা আজ যেখানে লিটল কনভেন্ট নামে মেয়েদের স্কুলটা আছে সেখানেই ছিল আগেকার পুরনো কনভেন্টের ধ্বংসাবশেষ। আজ হতে পঁয়তাল্লিশ বছর আগেও এখানে এই পেতিত পিকপাসে বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের এক কনভেন্ট ছিল।
কনভেন্টের চারদিকের যে রাস্তাগুলোর নাম বলা হল, এ রাস্তাগুলো প্যারিসের সবচেয়ে পুরনো রাস্তা। র্যু দ্ৰয়েত মুর ছিল আবার সবচেয়ে পুরনো আর দু পাশে ছিল ফুলের গাছ। মনে হয় মানুষ পাথর দিয়ে পথগুলোকে গাঁথার অনেক আগেই ঈশ্বর ফুল তৈরি করেন।
.
৯.
প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ এই কনভেন্টের রুদ্ধ দরজা পাঠকদের সামনে খুলে দিয়ে আমরা তার জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অনেক কথা বললাম। এবার আমরা আরও এমন একটা ঘটনার কথা বলার জন্য অনুমতি চাইছি পাঠকদের কাছে, যে কথার সঙ্গে আমাদের মূল কাহিনীর কোনও সম্পর্ক নেই। তবে এই ঘটনা থেকে জানা যাবে আগে কনভেন্টে কী ধরনের চরিত্রের মহিলারা থাকত।
লিটল কনভেন্টে যেসব আবাসিক অতিথি থাকত তাদের মধ্যে প্রায় একশো বছরের এক বৃদ্ধা মহিলা থাকত। তার বাড়ি ছিল আব্বায়ে দ্র ফঁতেলতে। বিপ্লবের আগে এই মহিলা খুব শৌখিন রুচিসম্পন্না ছিল। কথায় কথায় সে প্রায়ই মঁসিয়ে দ্য মিরোমেলনিল আর কোনও এক মাদাম দুপ্লাতের কথা বলত। মঁসিয়ে মিরোমেলনিল ছিল ষোড়শ লুই-এর সিলমোহরের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী আর মাদাম দুপ্লাত ছিল এক বিচারপতির স্ত্রী। কথা প্রসঙ্গে সুযোগ পেলেই এই নামগুলোর সে উল্লেখ করত আর। প্রায়ই বলত তেল শহরের কথা, প্রাচীরঘেরা যে শহরটার মধ্যে ছিল অনেক। ভালো ভালো রাস্তা।
