.
৬.
পেতিত পিকপাসের মাটিতে তিনটে পৃথক বাড়ি ছিল। একটাতে ছিল মূল কনভেন্ট, একটা বাড়িতে থাকত সন্ন্যাসিনীরা আর একটা বাড়ি ছিল বোর্ডিং-হাউস বা ছাত্রীদের আবাস। সেটাকে লিটল কনভেন্ট বলা হত। এই বোর্ডিংয়ের সামনে একটা বাগান ছিল। এ বাড়িতে অন্যান্য সম্প্রদায়ের অনেক প্রবীণা সন্ন্যাসিনীও থাকত। বিপ্লবের সময় যেসব কনভেন্ট ধ্বংস হয়ে যায় তারা আগে থাকত সেই সব কনভেন্টে। তারা কালো, ধূসর, সাদা প্রভৃতি নানারকমের পোশাক পরত।
সম্রাট এই সব বিধ্বস্ত কনভেন্টগুলোর সিস্টার ও সন্ন্যাসিনীদের বেনেডিক্টিনে বার্নাদিনে সম্প্রদায়ের দ্বারা যৌথভাবে চালিত কনভেন্টে আশ্রয় নেবার অনুমতি দান করেন। সরকার। তাদের জন্য কিছু করে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন এবং পেতিত পিকপাসের কর্তৃপক্ষ তাদের সাদরে গ্রহণ করে। তারা আপন আপন মতে চলত। তারা মাঝে মাঝে স্কুলের মেয়েদের তাদের কাছে যেতে দিত। তাদের মধ্যে যাদের কথা ছাত্রীদের মনে রেখাপাত করে তারা হল মেরে সেন্ত বেসিল, মেরে সেন্ত স্কুলেশটিক আর মেরে জ্যাকব।
তাদের মধ্যে সে অয়ে সম্প্রদায়ের একজন প্রবীণা সিস্টার অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পেতিত পিকপাসের একটা ঘরে এসে বাস করতে থাকে। এই সম্প্রদায়ের এই একজন মাত্র সিস্টারই বেঁচে থাকে। সে খুব গরিব ছিল এবং তার সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট জমকালো পোশাক পরার তার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। সে তাই একটা পুতুলকে সে পোশাক পরিয়ে রাখত। তার মৃত্যুকালে সে পুতুলটা কনভেন্টকে দিয়ে যায়। ১৮২৪ সাল পর্যন্ত সেই সিস্টার তার সম্প্রদায়ের একমাত্র প্রতিভূ হিসেবে বেঁচে ছিল। আজ শুধু তার পুতুলটা পড়ে আছে।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই সব ভক্ত মাদার উপাধিধারিণী সিস্টারদের সঙ্গে মাদাম আলবার্তিনের মতো কিছু বয়স্ক মহিলা লিটল কনভেন্টের বোর্ডিংয়ে থাকার অনুমতি লাভ করে। এ ছাড়া আর যে তিনজন এই অনুমতি পায় তারা হল মাদাম দ্য বোফোর্ত, মাদাম দ্য হতপোল আর মাদাম লা মাই দুফ্রেসনে। আর একজন মহিলা থাকত যে মাঝে মাঝে নাকি সুরে দারুণ গোলমাল আর হট্টগোল করত। স্কুলের মেয়েরা তার নাম দিয়েছিল ডাকারমিনি বা বজ্রপাত।
১৮২০ সালের কাছাকাছি মাদাম দ্য জেনলিস নামে একজন বাইরের মহিলা কনভেন্টে একদিন আবাসিক অতিথি হিসেবে থাকার অনুমতি চায়। সে লা ইসজেপিদে নামে একটি সাময়িক পত্রিকা সম্পাদনা করত এবং রাজার ভাই দিউক দ্য অলিয়ান্স তাকে এখানে থাকতে দেবার জন্য সুপারিশ করেন। তাতে বিরক্তির এক গুঞ্জন জাগে কনভেন্টের মধ্যে এবং অজানা আশঙ্কার এক ছায়া নেমে আসে। এই মাদাম জেলিস নাকি কয়েকটা উপন্যাস লেখে আগে। কিন্তু পরে উপন্যাস লেখা ছেড়ে পুরোপুরি ধর্মীয় জীবনযাপন করতে থাকে। কিন্তু কয়েক মাস বাস করার পরই কনভেন্ট ছেড়ে চলে যায় মাদাম জেলিস। সে নাকি যাবার সময় বলে যায় এখানকার বাগানে যথেষ্ট ছায়া নেই। সে চলে গেলে সন্ন্যাসিনীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। অবশ্য মাদাম জেলিস মানুষ হিসেবে খারাপ ছিল না এবং বয়সে বৃদ্ধ হলেও সে বীণা বাজাতে পারত।
কনভেন্ট চ্যাপেল বা ছোট গির্জাটা ছিল প্রধান কনভেন্ট এবং স্কুলবোর্ডিংয়ের মাঝখানে। বড় রাস্তার দিকে এই চ্যাপেলের একটা দরজা ছিল এবং সেদিক দিয়ে বাইরের কিছু লোক আসত। কিন্তু কনভেন্টের সন্ন্যাসিনী বা সিস্টারেরা তাদের মুখ দেখতে পেত না। সাত ফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছায়া-ছায়া বিষাদের অন্ধকারে ভরা কনভেন্ট চ্যাপেলে সমবেত প্রার্থনার সময় কনভেন্টের সিস্টাররা বাঁ দিকে সার দিয়ে দাঁড়াত, ডান দিকে দাঁড়াত স্কুলের মেয়েরা আর আবাসিক অতিথিরা পেছনের দিকে থাকত শিক্ষানবিশ সন্ন্যাসিনীরা। চ্যাপেলের জানালাগুলো ছিল বাগানের দিকে এবং সেই দিক থেকেই যা কিছু আলো আসত।
.
৭.
১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত পেতিত পিকপাসের প্রধানা কত্রী ছিলেন ম্যাদময়জেল দ্য ব্লেমুর যার সন্ন্যাসজীবনের নাম ছিল মেরে ইনোসেন্তে। যে মার্গারিতে দ্য ব্লেমুর গত শতাব্দীতে বেনেডিক্ট সম্প্রদায়ের সেন্টদের জীবনকাহিনী লেখেন সেই ব্লেমুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ম্যাদময়জেল ব্লেমুরের বয়স ছিল প্রায় ষাট। তার চেহারাটা ছিল বেঁটে-খাটো আর মোটাসোটা। তার গলার স্বর মোটেই ভালো ছিল না। যখন গান করতেন তখন তার গলাটা ফাটা পাত্রের মতো কর্কশ শোনাত। তবু মানুষ হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তাদের দলের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে হাসিখুশিসম্পন্না মহিলা এবং তাঁকে সবাই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। তাঁর পূর্বপুরুষদের অনেক গুণই আয়ত্ত করেন তিনি। অনেক পড়াশোনা করে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন তিনি। ইতিহাসে গভীর জ্ঞান ছিল তাঁর। এ ছাড়া লাতিন, গ্রিক এবং হিব্রু ভাষাতেও পাণ্ডিত্য ছিল তাঁর।
ম্যাদময়জেল ব্লেমুরের সহকারিণী ছিল স্পেনদেশীয় এক সন্ন্যাসিনী যার নাম ছিল মেরে সিনে রেস। তার অনেক বয়স হয়েছিল এবং চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। অন্যান্য সম্প্রদায় থেকেও কয়েকজন সিস্টার এসে যোগদান করে পেতিত পিকপাসের কনভেন্টে। কিন্তু তাদের কাছে এখানকার নিয়মকানুনের কঠোরতা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। তাদের দু-একজন পাগল হয়ে যায়। তাদের মধ্যে শেভালিয়ের রোজের বংশধর তেইশ বছরের এক সুন্দরী যুবতী ছিল, যার সন্ন্যাসীজীবনের নাম ছিল মের অ্যাজামশান।
