মাদাম আলবার্তিনেকে ঘিরে অনেকে অনেক গল্প করত। সে ছিল সবার কাছে অনন্ত কৌতূহলের এক অফুরন্ত উৎস। চ্যাপেলের মধ্যে একটা স্টলের মতো খোলা জায়গা ছিল। সেখান থেকে সে প্রার্থনায় যোগদান করত এবং যাজকদের নীতি-উপদেশ শোনাত।
একদিন উচ্চপদস্থ একজন যুবক যাজক নীতি-উপদেশ দান করতে আসেন। তাঁর নাম ছিল রোহ। ফ্রান্সের এক জমিদারবাড়ির সন্তান। পরে তিনি প্রিন্স দ্য লিয় উপাধিতে ভূষিত হয়ে সেনাবাহিনীর এক অফিসার নিযুক্ত হন এবং ১৮৩৩ সালে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি বেসাকনের কার্ডিনাল ও আর্কবিশপ হন।
বোহ এবার এই প্রথম এই কনভেন্টে নীতি-উপদেশ প্রচারের কাজে আসেন। মাদাম আলবার্তিনে সাধারণত প্রার্থনার পর প্রচারিত নীতি-উপদেশ ও ধর্মকথা শান্ত ও স্তব্ধ হয়ে শুনত। সেদিন কিন্তু সে মঁসিয়ে দ্য রোহাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আসন থেকে কিছুটা উঠে ‘সেকি আগান্তে। বিস্ময়ের সঙ্গে এই কথা দুটো বলে ওঠে। চ্যাপেলের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত নীরবতার মাঝে তার এই বিস্ময়সূচক কণ্ঠস্বর শুনে ধর্মসভার সকলেই চমকে ওঠে এবং নীতিপ্রচারক রোহও মুখ তুলে তাকায় মাদাম আলবার্তিনের দিকে। কিন্তু মাদাম আলবার্তিনের কথাটা বলেই ততক্ষণে আবার তার আসনে স্থির হয়ে বসে পড়েছে। প্রাণচাঞ্চল্যের একটা দমকা হাওয়া, যৌবন জীবনের এক উদ্দাম আলোকরশ্মি অকস্মাৎ যেন বাইরে থেকে এসে মাদাম আলবার্তিনের মৃত্যুর মতো হিমশীতল মুখখানাকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সে আলো, সে হাওয়া চলে যেতেই এক সাক্ষাৎ মৃত্যুর প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে সেই মুখখানা।
কিন্তু মাদাম আলবার্তিনের এই সামান্য কথা দুটো প্রচুর জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি করল কনভেন্টের মধ্যে। সেকি অগাস্তে! এই কথা দুটোর মধ্যে যেন এক রহস্যময় অজানিত কাহিনী লুকিয়ে আছে। মঁসিয়ে দ্য রোহ’র শৈশবের নাম অগাস্তে একথা ঠিক। আর এটাও সত্য কথা যে মাদাম আলবার্তিনে নিজে অভিজাত বংশের মেয়ে এবং উচ্চ অভিজাত সমাজে ঘোরাফেরা করত। তা না হলে রোহ’র মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে এমন ঘরোয়া নাম ধরে ডাকতে পারত না। নিশ্চয় তা হলে রোহ’র সঙ্গে তার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। সেটা রক্তগত সম্পর্কও হতে পারে। তা না হলে তার ছেলেবেলায় ঘরোয়া নামটা জানা সম্ভব হত না তার পক্ষে।
মেসদেম দ্য ক্লয়সিউল আর দ্য সেরেন্ত নামে দু জন ডিউকপত্নী তাদের সামাজিক মর্যাদার জোরে কনভেন্টে প্রায়ই বেড়াতে আসত। কিন্তু তারা আসার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত কনভেন্টের সকলে। এই দু জন মহিলা যখন ছাত্রীদের পাশ দিয়ে চলে যেত তখন তারা তাদের চোখ নামিয়ে ভয়ে কাঁপত।
কনভেন্টের ছাত্রীদের প্রতি মঁসিয়ে দ্য রোহ’র আগ্রহটাও ক্রমশ বেড়ে ওঠে। অথচ তাঁর এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথাটাকে তিনি নিজেই তাঁর সচেতন মনের মধ্যে ধরতে পারতেন না। সম্প্রতি তিনি প্যারিসের আর্কবিশপের সহকারী হিসেবে গ্র্যান্ড ভিকার পদ লাভ করেন এবং পদোন্নতির পরবর্তী ধাপ বিশপের পদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। সম্প্রতি পেতিত পিকপাসের চ্যাপেলে আসাটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে রোহার। পর্দানশীন যুবতী সন্ন্যাসিনীরা চোখে দেখতে পেত না তাকে। কিন্তু তার নরম অথচ কিছুটা মোটা কণ্ঠস্বর তারা সবাই চিনত। আগে তিনি একজন সামরিক অফিসার ছিলেন। পোশাক-আশাকের ব্যাপারে তার একটা খুঁতখুঁতে ভাব ছিল। তাঁর মাথার বাদামি চুলগুলো সুন্দরভাবে আঁচড়ানো থাকত সব সময়। তার আলখাল্লাটা খুব সুন্দর ছিল এবং সিল্কের একটা কাপড়ে কোমরটা বাঁধা থাকত। ষোড়শী তরুণীদের কাছে তাঁর চেহারাটা সত্যিই খুব প্রিয় ছিল।
বাইরের জগৎ থেকে কোনও শব্দের ঢেউ এসে কখনও ঢুকত না কনভেন্টের প্রাচীরঘেরা সীমানার মধ্যে। কিন্তু গত এক বছর হল একটা বাঁশির সুরলহরী কনভেন্টের মধ্যে ভেসে আসে। সে সুর প্রায়ই শোনা যায় কনভেন্টের মধ্যে। সেদিন যারা এ কনভেন্টের ছাত্রী ছিল তারা সবাই আজও মনে রেখেছে সে কথা। যে গানটা বাঁশির সুরে ফুটে উঠত সে গানের প্রথম লাইন হল, জেতালবে, এস, তুমি এসে রাজত্ব করো আমার অন্তরে। এই গানের সুর সে বাঁশিতে দিনে বেশ কয়েকবার ধ্বনিত হত। সে সুর শুনে স্কুলের মেয়েরা মোহিত হয়ে যেত, সন্ন্যাসিনী মাদাররা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠত, ছাত্রীদের মনোযোগ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ত। ফলে শাস্তির বিধান করতে হত বারবার। এই ব্যাপারটা চলে কয়েক মাস ধরে এবং মেয়েরা সেই অদৃশ্য অজ্ঞাত বংশীবাদকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। প্রতিটি মেয়েই নিজেকে জেতাবে ভাবে।
বাঁশির সুরটা আসত র্যু দ্ৰয়েত মুরের দিক থেকে। এ সুর শুনতে শুনতে কনভেন্টের। মেয়েরা এমনই মুগ্ধ হয়ে উঠেছিল যে, যে অচেনা-অদেখা যুবক এ বাঁশি বাজায় তাকে শুধু একবার চোখের দেখা দেখার জন্য তারা তাদের জীবনের সবকিছু দিয়ে দিতে পারত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবসর সময়ে তিনতলার একটা ঘরে ঢুকে জানালা দিয়ে র্যু দ্ৰয়েত মুরের দিকে তাকিয়ে সেই বাঁশির বাদককে দেখার এক ব্যর্থ চেষ্টায় ফেটে পড়ত। কেউ কেউ জানালার ভেতর দিয়ে হাত বার করে একটা রুমাল ওড়াত। দু জন মেয়ের সাহস সবচেয়ে বেশি ছিল। তারা বিপদের ঝুঁকি নিয়ে সব ভয় ঝেড়ে ফেলে একদিন ছাদের উপর উঠে সেই বাঁশি যে বাজায় তাকে দেখে। কিন্তু তারা যা ভেবেছিল তা নয়, সে বয়সে যুবক নয়, সে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। সে এখন অন্ধ এবং নিরাশ্রয়। হাতে কোনও কাজ না থাকায় সময় কাটাবার জন্য বাঁশি বাজায়।
